kalerkantho


কানাডায় ইসলাম ও মুসলমান

মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিশ্বের অন্যতম ধনী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ কানাডা। আয়তনের দিক থেকে কানাডা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও শীতলতম রাষ্ট্র। এটি উত্তর আমেরিকা মহাদেশের প্রায় ৪১ শতাংশ নিয়ে গঠিত। কানাডা পৃথিবীর বহু সাম্প্রদায়িকতার শান্তিপূর্ণ উন্নত দেশও বটে। এখানে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব ও বৈরিতা নেই। নেই ধর্মভিত্তিক সংঘাত। সেখানে ভিন্ন ধর্মকে বিরূপ দৃষ্টিতে দেখা হয় না। নিজ ধর্ম পালনে কানাডায় রয়েছে সাংবিধানিক অধিকার।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো কানাডায়ও মুসলমান ও ইসলামের বর্ণাঢ্য ইতিহাস রয়েছে। রয়েছে বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি-কালচার ও ঐতিহ্য-সভ্যতা। কানাডার মুসলমানরা নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সভ্যতাকেন্দ্রিক তাৎপর্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলে তারা নিজেদের ধর্ম-কর্ম ও সভ্যতা-সংস্কৃতির ওপর অত্যধিক জোর দেয়। কিছুদিন আগে কানাডায় অহেতুক ইসলামফোবিয়া ছড়ানো ও ইসলামের বিপক্ষে কথা বলার বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস করেছে কানাডিয়ান হাউস অব কমন্স।

দেড় শতকেরও বেশি পুরনো ও দ্রুত বিকাশমান কানাডার মুসলিমরা দক্ষ, শিক্ষিত ও দেশের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ জাতিতে পরিণত হয়েছে। ছোটখাটো প্রতিকূলতা ও সাময়িক ইসলামফোবিয়া সত্ত্বেও পুরোপুরি ধর্মীয় আবহে অনেকটা নির্বিঘ্নে বসবাস করছেন মুসলমানরা।

কানাডার ৯৭ শতাংশ মুসলমান কানাডার মৌলিক নাগরিক বা অধিবাসী। মুসলমান হওয়ার কারণে তাঁরা গর্ববোধ করেন। দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া মুসলমানরা কানাডার অন্যান্য মূল অধিবাসীর তুলনায় বেশি হারে নিজেদের কানাডীয় বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন।

কানাডায় মসজিদের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ১০০। দিন দিন এ সংখ্যা বেড়েই চলছে। ৭০ শতাংশের বেশি মুসলমান নিয়মিত মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করেন। প্রতিটি মসজিদে জুমায় একাধিকবার জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদগুলোতে দৈনন্দিন উপচেপড়া ভিড় লক্ষণীয়। প্রায় সব মসজিদে এক হাজার মুসল্লি একসঙ্গে অনায়াসে নামাজ আদায় করতে পারেন।

রাজধানী টরন্টোর সর্ববৃহৎ ইসলামী ইনস্টিটিউট কমপ্লেক্সের অধীনে প্রায় পাঁচ হাজার মুসল্লি একত্রে জুমার নামাজ আদায় করতে পারেন—এমন সুবিশাল একটি মসজিদ রয়েছে। বিশাল এলাকা নিয়ে পার্কিং লট, ফুটবল ও বাস্কেটবল খেলার মাঠ এবং ইসলামী স্কুলও রয়েছে। প্রায় ৫০ বিঘার ওপর পাঁচ শতাধিক গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে।

বর্তমানে কানাডার প্রায় প্রতিটি শহরে বিভিন্ন কমিউনিটিকেন্দ্রিক ইসলামিক সেন্টার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শুধু টরন্টো নগরীতে এ ধরনের প্রায় ১৬টি প্রতিষ্ঠান ও বড় কয়েকটি মাদরাসাও রয়েছে।

কানাডায় ইসলামের আগমন : কানাডায় মুসলমানদের আগমন শতাধিক বছর আগে। ১৮৭১ সালের কানাডিয়ান আদমশুমারিতে প্রথম মুসলমানদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। ওই শুমারিতে সংখ্যায় মাত্র ১৩ জন মুসলমানের উল্লেখ পাওয়া যায়। জানা যায়, কানাডিয়ান প্যাসিফিক রেলওয়ে স্থাপনের সময় অনেক মুসলমান এ দেশে আগমন করেন। এ ছাড়া আলবার্টায় কৃষিকাজে এবং অন্যান্য প্রদেশে শিল্প-কারখানায় কাজের সন্ধানে উপমহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকে এসেছেন। পরবর্তী সময়ে তাঁরা দেশের বিভিন্ন উচ্চপদে আসীন হতে থাকেন।

১৯৩৮ সালে আলবার্টার রাজধানী এডমন্টনে প্রথম মসজিদ ‘আল রাশিদ’ স্থাপিত হয়। ১৯৫২ সালে মনট্রিয়ালের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পাঠ্যক্রমে ইসলামিক স্টাডিজ অন্তর্ভুক্ত করলে অনেক মুসলমান শিক্ষার্থী কানাডায় আসেন। ১০ বছর পর টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ও একই বিষয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করলে সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পায়। ফলে ক্রমান্বয়ে মুসলিম শিক্ষার্থী, দক্ষ শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৬০ সালের পর থেকে মুসলমান ইমিগ্রেটদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৮১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, কানাডায় মুসলমানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮ হাজার ৮৭০ জন। ১৯৯১ সালে সে সংখ্যা বেড়ে হয় দুই লাখ ৫৩ হাজার। এর এক দশক পরে, অর্থাৎ ২০০১ সালে তা বেড়ে হয় দ্বিগুণের বেশি।

সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, মুসলমানের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে ২০১০ সালের আগে। মোট জনসংখ্যার ৬.৬ শতাংশ মুসলমান। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ কানাডায় মুসলমান জনসংখ্যা তিন মিলিয়ন ছাড়িয়ে যেতে পারে।

পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকার কারণে বর্তমানে প্রচুর আরব ও উপমহাদেশীয় বিত্তবান মুসলমান ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে কানাডায় পাড়ি জমাচ্ছেন। তাঁদের মাধ্যমেও উত্তরোত্তর মুসলমানদের সংখ্যা বেড়ে চলছে।

যেসব শহরে কানাডিয়ান মুসলমানরা বাস করে : প্রায় ৬০ শতাংশ মুসলমান বাস করে ওন্টারিও প্রদেশে। বিশেষ করে টরন্টো ও অটোয়ায়। ২০ শতাংশের বেশি বাস করে কুইবেক প্রদেশে, যার বেশির ভাগই মন্ট্রিয়লে। স্থানীয় মুসলমান জনগোষ্ঠীর তিন-চতুর্থাংশই ইমিগ্র্যান্ট। তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এসেছে গত এক দশকে। আরব দেশ ছাড়াও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলমান এসেছে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে। ফরাসি ভাষাভাষী আরবীয়রা, বিশেষ করে আলজেরিয়া, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো ইত্যাদি এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে আগত মুসলমানরা সাধারণত ভাষাগত কারণে মন্ট্রিয়লে বসবাস করে।

ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কানাডার মুসলমান : মুসলমানরা কানাডার ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন অঙ্গনে স্থান করে নিয়েছে। কানাডার রাজনীতিতেও রয়েছে মুসলমানদের বেশ প্রভাবশীল অবস্থান। মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কারণে বেশ কয়েকজন মুসলিম এমপি ও অনেক কাউন্সিলর নির্বাচিত হন প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে। কানাডায় মুসলমানদের পক্ষে কথা বলার জন্য অমুসলমানরাও এগিয়ে আসেন নিজ ইচ্ছায়। জাতীয় দৈনিক ও মিডিয়ায় বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলে মুসলমানদের উপস্থিতি খুব সরব না হলেও একেবারে নীরবও নয়।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরে মুসলমান উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় বহু মুসলমান রয়েছেন। শিল্প-বাণিজ্যে ও কানাডার অর্থনৈতিক উন্নয়নে মুসলমানদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য হিসেবে প্রমাণিত। ১৯৯৩ সালে একজন নারীসহ ১০ জন মুসলমান ব্যবসায়ী কানাডিয়ান বিজনেস অ্যাওয়ার্ড লাভ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

দেশীয় গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্বের ক্ষেত্রে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চেয়ে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে এগিয়ে রয়েছেন কানাডার মুসলমানরা। অন্যদিকে দেখা গেছে, শিক্ষাঙ্গনে ৩১ শতাংশ স্নাতকধারী হচ্ছে মুসলমান, যেখানে কানাডার মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৭ শতাংশ স্নাতকধারী।

কানাডার মুসলমানদের কর্মতৎপরতা : টরন্টোকে দেখতে মসজিদের শহরের মতো মনে হয়। সুন্দর-গোছালো ও স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দৃষ্টিনন্দন বেশ কিছু মসজিদ রয়েছে। প্রতিটি মসজিদে রয়েছে ইসলামী স্কুল, মাদরাসা, ছেলে-মেয়েদের নামাজ পড়ার পৃথক ব্যবস্থা। টরন্টোর বিখ্যাত আবুবকর মসজিদের ওপর রয়েছে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের সিলেবাস অনুযায়ী একটি কওমি মাদরাসা। মাদরাসাটিতে প্রায় হাজারের ওপর ছাত্র পড়াশোনা করে। পুরো সিটিতে এ ধরনের আরো কয়েকটি মাদরাসা রয়েছে। এ সব কিছু পাকিস্তান ও ভারত, বিশেষত গুজরাটের মুসলমানদের দাওয়াত-তাবলিগের মেহনত ও আন্তরিক প্রচেষ্টার সামান্য প্রতিফলন।

প্রতি রমজানে টরন্টো সিটির মসজিদগুলোতে তারাবির নামাজ পড়ানোর জন্য ন্যূনতম পাঁচ-ছয়জন কোরআনে হাফেজ উপস্থিত থাকেন। তাঁরা পালাবদল করে ২০ রাকাত নামাজ আদায় করেন। অন্যান্য শহরেও প্রায় একই ব্যবস্থা থাকে রমজান মাসে।

কানাডার মুসলিম নারী, কিশোরী-যুবতীরা হিজাব পরে চলাচল করে অবাধে ও নিঃসংকোচে। বিভিন্ন শহরে ভারতের গুজরাটি মুসলমানরা বেশ কিছু মসজিদ-মাদরাসা, ইসলামী স্কুল ও ইসলামী গবেষণাকেন্দ্র চালু করেছেন।

টরন্টোয় তাবলিগ জামাতের প্রধান মারকাজ হলো আল-হেদায়েত মসজিদ। এই মারকাজ বিশাল এলাকা নিয়ে সুবিশাল পার্কসমৃদ্ধ। প্রায় চার মিলিয়ন ডলার দিয়ে ওয়্যারহাউস খরিদ করে নির্মাণ করা হয়। মারকাজের মুরব্বিদের মধ্যে সোমালিয়ান, গুজরাটি ও পাকিস্তানিদের আধিপত্য বেশি। তারপর রয়েছে বাংলাদেশিদের অবস্থান। প্রতিবছরের ডিসেম্বরে তাদের বার্ষিক ইজতেমা হয়। বেইসমেন্টে প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক মুসল্লির একসঙ্গে বসে ইজতেমার বয়ান শোনার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে জামাত আসে এবং আবার এখান থেকে জামাতবন্দি হয়ে বিভিন্ন শহরে ছুটে চলে।

বস্তুত পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে ইসলাম ও মুসলমানদের অভিযাত্রা চলছে ব্যাপক হারে। বিভিন্ন গবেষকের তথ্যানুযায়ী, পশ্চিমা বিশ্বে ২০৭০ সালের আগে ইসলাম হবে প্রধান ধর্ম। তাঁদের তথ্য ও গবেষণার কিছু চিত্র এখন থেকেই স্পষ্ট হতে চলেছে। এগিয়ে চলছে ইসলামের প্রচার-প্রসার ও আন্তর্জাতিকতা।

তথ্যসূত্র :

1. Muslims and Islam in Canada-Ali Ketani and M. M'Bows

2. Muslims and Islam in the American Continent Vol. I of the Encyclopedia of Muslim Minorities in the World

3. Overview of Canadian Govt. Website

4. CBC's Website

5. ‘আল-ইসলাম ফি কানাদা’  

6. ‘তারিখু হিজরতিল মুসলিমিন ফি কানাদা’

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক আল-হেরা



মন্তব্য