kalerkantho


পবিত্র কোরআনে ভাষা প্রসঙ্গ

ড. মুহাম্মদ আবদুল হাননান   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পবিত্র কোরআনেও ভাষা প্রসঙ্গে নানা আয়াত রয়েছে। প্রথমে আমরা দেখব ৩০ নম্বর সুরা রুমের ২২ নম্বর আয়াত।

এতে বলা হচ্ছে, ‘তাঁর (আল্লাহর) নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে, আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের (মানুষের) ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানী লোকদের জন্য অবশ্যই দৃষ্টান্ত রয়েছে। ’

অন্যত্র সুরা ইবরাহিমের আয়াত : ‘আমি (আল্লাহ) প্রত্যেক রাসুলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, তারা (রাসুলরা) যাতে আমার কথা খোলামেলাভাবে তাদের (লোকদের) কাছে ব্যাখ্যা করতে পারে। আল্লাহই শক্তিমান ও তত্ত্বজ্ঞানী। ’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত নম্বর ৪)

নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জমানার কোরআনের তাফসিরকার আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) প্রথমে উদ্ধৃত সুরা রুমের আয়াতটির ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে ‘...এবং তাঁর একত্ববাদ ও কুদরতের নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা যেমন আরবি, ফারসি ইত্যাদি ও বর্ণের বৈচিত্র্য, যেমন লাল, কালো ইত্যাদি। ’ (তাফসিরে ইবনে আব্বাস, তৃতীয় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০০৭, পৃষ্ঠা ২৪-২৫)

বর্তমান জমানার কোরআনের তাফসিরকার মুফতি শফি (রহ.) এ আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, খোদায়ি কুদরতের তৃতীয় নিদর্শন হচ্ছে, আকাশ ও পৃথিবী সৃজন, বিভিন্ন স্তরের মানুষের বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি এবং বিভিন্ন স্তরের বর্ণবৈষম্য; যেমন কোনো স্তর শ্বেতকায়, কেউ কৃষ্ণকায়, কেউ লালচে এবং কেউ হলদেটে। এখানে আকাশ ও পৃথিবী সৃজন তো শক্তির মহানিদর্শন বটেই, মানুষের ভাষার বিভিন্নতাও কুদরতের এক বিস্ময়কর লীলা। ভাষার বিভিন্নতার মধ্যে অভিধানের বিভিন্নতাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরবি, ফারসি, হিন্দি, তুর্কি, ইংরেজি ইত্যাদি কত বিভিন্ন ভাষা আছে।

এগুলো বিভিন্ন ভূখণ্ডে প্রচলিত। তার মধ্যে কোনো কোনো ভাষা পরস্পর এত ভিন্নরূপ যে এদের মধ্যে পারস্পরিক কোনো সম্পর্ক আছে বলেই মনে হয় না।

স্বর ও উচ্চারণভঙ্গির বিভিন্নতাও ভাষার বিভিন্নতার মধ্যে শামিল। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক পুরুষ, নারী, বালক ও বৃদ্ধের কণ্ঠস্বরে এমন স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করেছেন যে একজনের কণ্ঠস্বর অন্যজনের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। কিছু না কিছু পার্থক্য অবশ্যই থাকে। ...

এমনিভাবে বর্ণবৈষম্যের কথা বলা যায়। একই মা-বাবা থেকে একই ধরনের অবস্থায় দুই সন্তান ভিন্ন বর্ণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এ হচ্ছে সৃষ্টি ও কারিগরির নৈপুণ্য। এরপর ভাষা ও স্বর বিভিন্ন হয়। [মুফতি শফি (রহ.)-এর তাফসিরকৃত পবিত্র কোরআনুল কারিম, মদিনা মুনাওয়ারা, ১৪১৩ হিজরি, পৃষ্ঠা ১০৪১-১০৪২]।

ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁর তাফসিরে শেষোক্ত সুরা ইবরাহিমের দুটি ব্যাখ্যা করেছেন। বলেছেন, এক. আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, তাঁর আপন সম্প্রদায়ের ভাষাসহ পাঠিয়েছি, তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য তাদের ভাষায়, যা তাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং নিষেধ করা হয়েছে। দুই. অন্য ব্যাখ্যায় এমন ভাষাসহ রাসুল প্রেরণ করেছি, যে ভাষায় তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি বুঝে নিতে সক্ষম হয়। [তাফসিরে ইবনে আব্বাস (রহ.), দ্বিতীয় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০০৪, পৃষ্ঠা ২৫৬]

আধুনিক জমানার কোরআন তাফসিরকার মুফতি শফি (রহ.) তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেন : বিশ্বের জাতিগুলোর মধ্যে শত শত ভাষা প্রচলিত রয়েছে। এমতাবস্থায় সবাইকে হেদায়েত করার দুটি মাত্র উপায় সম্ভবপর ছিল। এক. প্রত্যেক জাতির ভাষায় পৃথক পৃথক কোরআন অবতীর্ণ হওয়া এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষাও তদ্রূপ প্রত্যেক জাতির ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন হওয়া। আল্লাহর আপন শক্তির সামনে এরূপ ব্যবস্থাপনা মোটেই কঠিন ছিল না; কিন্তু বিশ্ববাসীর জন্য এক রাসুল, এক গ্রন্থ, এক শরিয়ত প্রেরণ করার মধ্য দিয়ে তাদের মাধ্যমে হাজারো মতবিরোধ সত্ত্বেও ধর্মীয়, চারিত্রিক ও সামাজিক ঐক্য ও সংহতি স্থাপনের যে মহান লক্ষ্য অর্জন করা উদ্দেশ্য ছিল, এমতাবস্থায় তা অর্জিত হতো না। ...

তাই দ্বিতীয় পন্থাটিই অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তা এই যে, কোরআন একই ভাষায় অবতীর্ণ হবে এবং রাসুলের ভাষাও কোরআনের ভাষা হবে। এরপর অন্যান্য দেশীয় ও আঞ্চলিক ভাষায় এর অনুবাদ প্রচার করা হবে। [পবিত্র কোরআনুল কারিম, মুফতি শফি (রহ.)-এর তাফসির, মদিনা মোনাওয়ারা, ১৪১৩ হিজরি, পৃষ্ঠা ৭১১-৭১২]

মানুষকে আল্লাহ তাআলা ভাব প্রকাশ করতে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন—এ কথা কোরআনের আরো বিভিন্ন সুরায় প্রকাশিত হয়েছে। সুরা আর-রাহমানের শুরুর দিকে আল্লাহ তাআলার বর্ণনা : ‘পরম করুণাময় আল্লাহ। তিনিই কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তিনি তাকে ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন। ’ (অনুবাদ, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : কোরআন শরিফ সরল বঙ্গানুবাদ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০২ সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৪০৩)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এ আয়াতের তাফসির করেছেন, ‘তিনিই (আল্লাহ), তাকে (মানুষকে) শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে। আল্লাহ মানুষকে সব কিছু বর্ণনা করতে শিখিয়েছেন এবং পৃথিবীর সব জীবজন্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছেন। (তাফসিরে ইবনে আব্বাস, তৃতীয় খণ্ড, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৪১৬)

মুফতি শফি (রহ.) এ আয়াতের তাফসির করেছেন আরো ব্যাপকভাবে। তিনি উল্লেখ করেছেন :  ‘মানব সৃষ্টির পর অসংখ্য অবদান মানবকে দান করা হয়েছে। তার মধ্যে এখানে বিশেষভাবে বর্ণনায় শিক্ষাদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ...প্রথমে কোরআন শিক্ষা ও পরে বর্ণনা শিক্ষার উল্লেখ করা হয়েছে। ...এখানে বর্ণনার অর্থ ব্যাপক। মৌখিক বর্ণনা, লেখা ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে বর্ণনা এবং অপরকে বোঝানোর যত উপায় আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন, সবই এর অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন ভূখণ্ড ও বিভিন্ন জাতির বিভিন্ন বাকপদ্ধতি—সবই এই বর্ণনা শিক্ষার বিভিন্ন অঙ্গ...। ’ [মুফতি শফী (রহ.)-এর তাফসির, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৩১৬-১৩১৭]

ধর্মগ্রন্থে ভাষা প্রসঙ্গের আয়াতগুলো ও এর তাফসির চমকপ্রদ। এতে ভাষা প্রশ্নে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মহত্ত্ব ও বিজ্ঞানমনস্কতা উপলব্ধি করা সম্ভব হয়। গোটা দুনিয়ায় একটিমাত্র ভাষা না হয়ে, জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভিন্ন ভাষার জন্মের রহস্যটিও মানবজাতির ইতিহাসের সঙ্গেই সংযুক্ত। ধর্মগ্রন্থই পৃথিবীর মধ্যে বিভিন্ন ভাষার বাস্তবতা মানুষের সামনে তুলে ধরেছে, যা মানবজাতির জন্য কল্যাণকর হয়েছে।

 

লেখক : বিশিষ্ট গবেষক

drhannapp@yahoo.com


মন্তব্য