kalerkantho


স্মৃতিচারণা

বঙ্গবন্ধু ধমক দিয়ে বললেন ‘লিভ ইট টু মি’

মো. মহিউদ্দিন

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বঙ্গবন্ধু ধমক দিয়ে বললেন ‘লিভ ইট টু মি’

ওই সময়টায় আমি একটু দূরে ছিলাম। কজন ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে কী যেন বলছেন, পীড়াপীড়ি করছেন। কাছে এগোলাম। বঙ্গবন্ধু ওদের ধমক দিয়ে বললেন, ‘লিভ ইট টু মি।’ বলেই রুমের ভেতরে চলে গেলেন। বুঝলাম, জনসভায় কিছু একটা বলার জন্য তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করছিলেন। হয়তো সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করার কথা। সেদিন এটাই ছিল সবার আলোচনার বিষয়।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমি যুক্ত হই তিনি আগরতলা মামলা থেকে বেরোনোর পর। তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেখার দায়িত্ব ছিল আমার। ওই সময় আমি ছাত্রলীগ করতাম। থাকতাম ইকবাল হলে। তিনিই আমাকে বেছে নিয়েছিলেন। সেই উনসত্তর থেকে মহান এই মানুষটির সঙ্গে ছিলাম পঁচাত্তর সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত।

৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নম্বরের বাড়িতে পৌঁছি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। একটু আগেই গিয়েছিলাম। কারণ, কৌতূহল তো আমার মধ্যেও ছিল। কী হতে যাচ্ছে ৭ই মার্চ? বঙ্গবন্ধু কী বলবেন? তিনি কি সরাসরি রেসকোর্স থেকে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন? এমন নানা চিন্তা ছিল। এই চিন্তা কেবল আমার একার চিন্তা ছিল না। যেদিন আওয়ামী লীগ ৭ই মার্চের জনসভার ডাক দেয়, সেদিন থেকে সবার মধ্যে এ ধরনের চিন্তা কাজ করতে থাকে। খুব টেনশন হচ্ছিল। 

কিন্তু বত্রিশ নম্বরে পৌঁছে খুব অবাক হয়ে গেলাম। একটা সাদা চেক লুঙ্গির সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবি, ঘাড়ে একটা তোয়ালে; নাশতার টেবিলে বঙ্গবন্ধুকে দেখলাম একেবারে স্বাভাবিক। টেনশনের বিন্দুমাত্র নেই। স্বভাবসুলভ হাসি-খুশি। নাশতা করছেন। দেখেই বললেন, ‘আসছো? বসো।’ 

ধীরে ধীরে বত্রিশ নম্বরের ভেতরে-বাইরে লোক জড়ো হতে থাকল। ছাত্রনেতারাই বেশি। সাড়ে ১০টা কি ১১টার দিকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও ড. কামাল হোসেন এলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁদের নিয়ে একটি কক্ষে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করলেন প্রায় ঘণ্টা দেড়েক। এরপর তাঁরা চলে গেলেন। এরপর এলেন সিরাজুল আলম খান। বঙ্গবন্ধু তাঁর সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বললেন। যাওয়ার সময় সিরাজুল আলম খানকে বেশ খুশি দেখলাম। এর পরই বেশ কিছু সময় বেগম মুজিবের সঙ্গে গভীর মনোযোগ নিয়ে কথা বললেন। কথা শেষ করে বঙ্গবন্ধু গেলেন গোসলে। মনে পড়ে, সেদিন বঙ্গবন্ধুর শরীরটা ভালো ছিল না। জ্বর জ্বর ভাব ছিল শরীরে।

একপর্যায়ে বত্রিশ নম্বরের ওপরে-নিচে—দোতলায়, ওপরতলায় গিজ গিজ করতে থাকেন ছাত্রলীগের বিভিন্ন স্তরের নেতারা। সেখানকার নানা ধরনের আলোচনা কানে এলো। কেউ বলছেন, আজ সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে ছাত্ররা বিদ্রোহ করতে পারে। কেউ বলছেন, যুদ্ধ ঘোষণা করা উচিত, আর দেরি করা ঠিক হবে না। বঙ্গবন্ধু রুমের বাইরে আসতেই কজন তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে এ ধরনের দাবি জানাচ্ছিলেন। দেখলাম, বঙ্গবন্ধু ধমক দিয়ে তাঁদের বললেন,‘লিভ ইট টুম মি।’ তাঁরা চুপ হয়ে গেলেন।

দুপুরে খাবারের পর বঙ্গবন্ধু কিছু সময় বিশ্রাম নিলেন। এর মধ্যে ওপরতলায় দেখলাম আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে। নেতা তাঁর প্রিয় পোশাক সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবির ওপর কালো কোট পরে রুম থেকে বেরোলেন। দরজা পর্যন্ত তাঁকে এগিয়ে দিলেন বেগম মুজিব।

রুম থেকে বেরোনোর পর এগিয়ে এলেন আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ।

বাসার নিচে বঙ্গবন্ধু যখন গাড়িতে ওঠেন, তখন দুপুর ২টা। গাড়ি চালাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী গোলাম মোর্শেদ। আমি সামনের সিটে বসলাম। আবদুর রাজ্জাক-তোফায়েল আহমেদ নেতার সঙ্গে থাকলেন।

গাড়িতে উঠেই বঙ্গবন্ধু তাঁর বহুদিনের পুরনো ব্যবহৃত পথ এড়িয়ে চালককে অন্য পথে যেতে বললেন। সাধারণত আমরা বত্রিশ নম্বরের পূর্ব পাশ, বর্তমানে যেটা রাসেল স্কয়ার, এ পথ দিয়ে বাসা থেকে বেরোতাম। ওই দিন বঙ্গবন্ধু চালককে বললেন পশ্চিমে সাত মসজিদ রোড দিয়ে জিগাতলা হয়ে রেসকোর্সে যেতে। সে পথেই আমরা রেসকোর্সে পৌঁছলাম।

মাইকে ঘোষণা হলো, মুজিব ভাই এসে গেছেন। এই খবরে গোটা রেসকোর্স (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কেঁপে উঠল স্লোগানে স্লোগানে। উত্থিত হলো লাখ লাখ বাঁশের লাঠি। মুহুর্মুহু স্লোগান—‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ বঙ্গবন্ধুর একটু আগে মঞ্চে উঠলেন গাজী গোলাম মোস্তফা। বঙ্গবন্ধুর পেছনে পেছনে আমি। নেতা মঞ্চে উঠে পুরো জনসভার দিকে একবার তাকালেন। হাত নাড়লেন। চশমাটা খুলে ডায়াসে রেখে বত্তৃদ্ধতা শুরু করলেন। আমি পেছনে দাঁড়ানো। জাতীয় নেতারাও ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বত্তৃদ্ধতা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে উত্তাল জনসমুদ্র নীরব-নিথর হয়ে গেল। সবার  মুখ বন্ধ, কান খোলা।

বঙ্গবন্ধু যখন বললেন—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ নিজের অজান্তেই হাত দুটি ওপরে উঠে গেল। আমি সর্বশক্তি দিয়ে করতালি দিতে থাকলাম। বিশাল জনসমুদ্র যেন মুহূর্তের মধ্যে গর্জে উঠল বিশাল ঢেউয়ের মতো। আর কি থামানো যায়! জয় বাংলা বলে বত্তৃদ্ধতা শেষ করে এক মুহূর্তও  মঞ্চে অপেক্ষা করলেন না বঙ্গবন্ধু। আমি তাঁর পেছনে পেছনে। গাড়িতে উঠে এবার বত্রিশ নম্বরের পূর্ব পাশ দিয়ে বাসায় পৌঁছলেন নেতা।

আজও মনে পড়ে, বাসায় ফিরে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবাইকে বললেন, ‘আমার যা বলার ছিল আজ বলে দিয়েছি। এখন থেকে প্রতিদিন রাতে তোমরা আমার সঙ্গে এক টেবিলে রাতের খাবার গ্রহণ করবা।’ নেতা এটা কেন বললেন জানি না। রাত ১টা কি দেড়টার দিকে আমি বাসায় ফিরে আসি।

ইউনেসকো ৭ই মার্চের ভাষণের যে ছবিটি প্রকাশ করেছে তাদের মনোগ্রামসহ, সে ছবিতে বঙ্গবন্ধুর পেছনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইতিহাসে আমিও স্থান পেলাম। আমি মুন্সীগঞ্জের মহিউদ্দিন। কে চিনত আমাকে! বঙ্গবন্ধুর মতো মহামানবের স্পর্শ পেয়েছি বলেই আমার কপালে এ তিলক জুটেছে।

লেখক : একসময়ে ছিলেন ছাত্রলীগের কর্মী। থাকতেন ইকবাল (বর্তমান জহুরুল হক) হলে। বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে ছিলেন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি পর্যন্ত। বর্তমানে তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

অনুলিখন : লায়েকুজ্জামান 


মন্তব্য