kalerkantho


প্রতিবাদের নজির প্রাণ দিয়ে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রতিবাদের নজির প্রাণ দিয়ে

রাস্তায় কোনো অন্যায় দেখলে প্রতিবাদে পিছপা হতেন না রাজধানীর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খন্দকার তালহা। একদিন বাসার সামনে দেখেন এক স্কুলশিক্ষিকাকে ছিনতাইকারীরা ঘিরে ধরেছে। নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবেই এগিয়ে গেলেন তালহা। বরিশালের গৌরনদী পলারদি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র সাকির আহমেদ গোমস্তাও স্বভাবে ছিলেন প্রতিবাদী। শিক্ষক লাঞ্ছনার একটি ঘটনা যখন সবাই নীরবে মেনে নিয়েছিল ঘৃণায় সাকির চিৎকার করে ওঠেন, প্রতিবাদ জানান। দশম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র সাইদুর রহমান হৃদয়ের সহ্য হতো না বখাটেপনা এবং একাই সে রুখে দাঁড়িয়েছে। অন্যায় করা ও অন্যায় সহ্য করার অসহ্য এই সময়ে হাতে গোনা যেসব মানুষ ব্যতিক্রম এই তিনজন ছিলেন তাঁদের দলে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে গত বছর এই তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন অকালে, তবে তাঁরা রেখে গেছেন প্রতিবাদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তালহার ঘটনা তিনটিতে কালের কণ্ঠ গত বছর একাধিক প্রতিবেদন ছেপেছে।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তালহা অন্যায় সহ্য করতে পারতেন না। বুক চিতিয়ে প্রতিবাদ জানাতেন। গত ৮ অক্টোবর রাজধানীর টিকাটুলী এলাকার আরকে মিশন রোডে ছিনতাইয়ে বাধা দিতে গিয়ে নিজে প্রাণ দিয়ে আজ এলাকায় প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে আছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তালহা খুন হওয়ার আগে টিকাটুলীর এই এলাকাটিতে প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটত। বাধা দিলে ঘটত ছুরিকাঘাতের ঘটনাও। তালহার মৃত্যুর পর সেখানে পুলিশ টহল বাড়িয়েছে। ব্যবস্থা নিয়েছে ছিনতাই রোধের। জীবন দিয়ে তালহা ছিনতাই রোধের ব্যবস্থা করে গেলেন—কালের কণ্ঠকে এমনই বললেন এলাকার একজন বাসিন্দা।

তালহা লাভ করেছেন ফারাজ হোসেন সাহসিকতা পুরস্কারও। গত ২ ডিসেম্বর পদক তুলে দেওয়া হয় তালহার বাবা ও বোনদের হাতে। কয়েক দিন আগে তালহার বাবা খন্দকার নুরুদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় কালের কণ্ঠর। তিনি জানান, ছেলের কথা মনে হলে কিছু ভালো লাগে না, চেষ্টা করেন ভুলে থাকতে, পারেন না। বাড়ির বাইরে বের হতেই বাম দিকের যে রাস্তাটা চলে গেছে সেদিকে চোখ পড়লেই মনে পড়ে যায় প্রিয় সন্তান তালহার কথা।

ওয়ারী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ওই এলাকায় টহল বাড়ানো হয়েছে। আমরা ছিনতাই রোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ তিনি জানান, ধরা পড়া দুই ছিনতাইকারী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে, আরেকজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

বরিশালে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত সাকিরের বাবা আয়ুব আলী গোমস্তা এখনো শোকগ্রস্ত, তবে গর্বও তাঁর কম নেই। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছেলে হারানোর কান্না যেমন থাকবে, তেমনি প্রতিবাদী সন্তানের বাবা হিসেবে গর্বিত হয়েও থাকব। সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার দূর করতে প্রতিটি ঘরেই প্রতিবাদী ছেলেমেয়ে জন্ম হওয়া দরকার।’ তবে সাকিবের মা আলেয়া বেগম খুনিদের এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার ঘটনাটি মানতে পারছেন না। ‘ঘটনার দুই মাস অতিবাহিত হতে চলেছে, চিহ্নিত হত্যাকারীদের একজনকেও গ্রেপ্তার করেনি। এমনকি এ বিষয়ে পুুলিশ আমাদের কাছে জানতেও চায়নি।’ আলেয়া বেগম বলছিলেন কালের কণ্ঠকে। তিনি বলেন, ‘সমাজে নানা অন্যায়-ব্যভিচার হয়। সাহস নিয়ে কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না। শিক্ষককে বখাটেরা লাঞ্ছিত করেছিল, তার প্রতিবাদ করেছিল সাকির। এর পরিণতি নিয়ে ভাবেনি।’

গৌরনদীর অশোককাঠি পালরদি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তপন কুমার রায় বলেন, ‘বখাটেরা যখন আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করছিল, তা দেখে সাকির প্রতিবাদ করে। তখন বুঝতে পারিনি এটুকু প্রতিবাদের এত বড় মূল্য দিতে হবে। তার মতো প্রতিবাদী ছাত্রকে নিয়ে কলেজ কতৃপক্ষ গর্ববোধ করে। আমরাও পুলিশ প্রশাসনের কাছে সাকির হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানাই।’ 

সাকিরের মায়ের অভিযোগ, ঘটনার পরদিন ২২ নভেম্বর সকালে অশোককাঠি পেট্রল পাম্প এলাকা থেকে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ফাহিমকে এলাকাবাসী আটক করে পুলিশে দিয়েছিল। পুলিশ উল্টো মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে ওই দিনই দুপুরে ফাহিমকে থানা থেকে ছেড়ে দেয়। পুলিশ সুপার ওসির বিরুদ্ধে তিন সদস্যর তদন্ত কমিটি গঠন করলেও কিছু হয়নি বলে অভিযোগ করেন আলেয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে আমাদের কাছে কেউ আসেনি এবং ডাকেওনি।’ এমনকি থানায় দায়ের করা মামলার বিষয়েও তদন্ত কর্মকর্তা কোনো প্রকার যোগাযোগ করেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গৌরনদী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আফজাল হোসেন বলেন, ‘আসামিরা আত্মগোপনে রয়েছে। গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’ অর্থের বিনিময়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার বিষয় জানতে চাইলে তদন্তকারী এই কর্মকর্তা বলেন, এ অভিযোগটি সাকিরের পরিবারের পক্ষ থেকে ওসির বিরুদ্ধে করা হয়েছে, যা  ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। ফলে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।

বরিশালেই গত বছর ২৮ জানুয়ারি খুন হয় নগরীর শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির ছাত্র সাইদুর রহমান হৃদয়। পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার চিংগুড়িয়া গ্রামের ব্যবসায়ী শাহীন গাজীর একমাত্র ছেলে ছিল হৃদয়। নৈতিক স্খলনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল যে কিশোর, বখাটের ছুরিতে তার নিহত হওয়ার ঘটনার আজও বিচার পায়নি পরিবার। ‘আমার মেধাবী ছেলেটি বখাটেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিল। এখনো এক আসামি ধরা পড়েনি। কবে পাব ছেলে হত্যার বিচার! এ নির্মমতার যদি ন্যায়বিচার না পাই তাহলে তো কোনো মানুষ আর বখাটেপনা বা অন্য কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে না।’ বলছিলেন হৃদয়ের ক্ষুব্ধ বাবা।

ভাণ্ডারিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের গ্রাম চিংগুড়িয়ায় সুপারি বাগানের ভেতর কবর দেওয়া হয়েছে হৃদয়ের। পাশেই গ্রামের পাকা রাস্তা। গ্রামের অটোচালক মো. রিয়াজ মীর (৩০) বলেন, ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে মানুষের জীবন দিতে হয় তার প্রমাণ আমাদের হৃদয়। এর কঠোর বিচার না হলে কেউ কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না।’

দক্ষিণ ভিটাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আইউব আলী সিকদার বলেন, ‘হৃদয় আমার স্কুলের ছাত্র ছিল। আমরা চিংগুড়িয়া গ্রামবাসী এ নির্মম হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি। না হলে কেউ আর অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না। বখাটেরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে।’

চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক মো. মহিউদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, হৃদয় হত্যাকাণ্ডের ২৬ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান আসামিসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা কারাগারে আছে। তদন্ত শেষে  আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। শুধু ৭ নম্বর আসামি পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার আবুল হোসেন গাজীর ছেলে মো. গোলাম রাব্বি এখনো পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

(আমাদের প্রতিবেদক ওমর ফারুক (ঢাকা), মঈনুল ইসলাম সবুজ (বরিশাল) ও দেবদাস মজুমদারের (পিরোজপুর) দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা)


মন্তব্য