kalerkantho


বিকৃত করলে ইতিহাস প্রতিশোধ নেয়

৭ই মার্চের গৌরবের উৎসবে শেখ হাসিনা

পার্থ সারথি দাস   

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বিকৃত করলে ইতিহাস প্রতিশোধ নেয়

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে ইউনেসকো বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। এ উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নাগরিক সমাবেশে আগতদের একাংশ। ছবি : বাসস

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যারা বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃত করেছিল তারা যেন কখনোই আর দেশের ক্ষমতায় ফিরতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। আর যেন কখনো ওই পাকিস্তানের প্রেতাত্মা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পদলেহনকারী, চাটুকারের দল বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃত করার সুযোগ না পায়।

আজকে আমরা সারা বিশ্বে গর্বিত জাতি। এই উন্নত শির যেন আর অবনত না হয়। ’

শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না; কেউ মুছতে পারেনি। ইতিহাস বিকৃত করতে চাইলে ইতিহাস প্রতিশোধ নেয়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের বিশ্বস্বীকৃতিতে গতকাল শনিবার দুপুরে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। প্রায় আধাঘণ্টার বক্তব্যে তিনি ৭ই মার্চের ভাষণের তাৎপর্য ও পরবর্তীকালের ইতিহাসবিকৃতির ঘটনাবলি তুলে ধরেন এবং ওই ভাষণদানের দিনে তাঁর মায়ের কথা বারবার মনে করেন।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে গত ৩০ অক্টোবর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। ইউনেসকোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ ভাষণটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের এই বিরল স্বীকৃতিতে আওয়ামী লীগ সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করে।

এরই ধারাবাহিকতায় নাগরিক কমিটি গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করে। এই উদ্যান ১৯৭১ সালে ছিল ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান। সেখানেই বঙ্গবন্ধু ওই বছর জাতির মুক্তির লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়ে প্রায় ১৮ মিনিটের অলিখিত ভাষণটি দিয়েছিলেন।

৪৬ বছরের ব্যবধানে নাম বদল হওয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সেই ভাষণের বিশ্বসম্মানের উৎসবে সমবেত হয়েছিল অগুনতি মানুষ। মঞ্চ বানানো হয়েছিল নৌকার আদলে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য ছিল আলাদা মঞ্চ। কণ্ঠে কণ্ঠে ছিল জয় বাংলা ধ্বনি। উদ্যানের বাইরে ট্রাকে ট্রাকে বেজে চলছিল ৭ই মার্চের ভাষণ। অনেকেরই পরনে ছিল লাল-সবুজ পোশাক। উদ্যানে, আশপাশের সড়কগুলোয় শোভিত ছিল ৭ই মার্চের ভাষণের শিহরণ জাগানো পঙিক্তমালা। ব্যানারে ফেস্টুনে শোভা পাচ্ছিল জাতির পিতার মুখাবয়ব। সকাল ১০টা থেকেই সমাবেশস্থলের আশপাশে ভিড় শুরু হয়। ঢাকার আশপাশের শুধু নয়, বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকেও সমাবেশে অংশ নিতে ছুটে আসে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। ভেতরে ঢুকতে না পেরে সড়ক বিভাজকের ওপর বসে অনেকে শুনছিল বক্তাদের বক্তব্য। শাহবাগ মোড় থেকে টিএসসিমুখী সড়কে দাঁড়িয়েই বক্তব্য শুনছিলেন বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম। আলাপকালে তিনি জানান, সমাবেশের জন্য রাস্তায় গণপরিবহন নেই। তিন কিলোমিটার হেঁটে এখানে এসেছেন।

দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড়ও ছিল উদ্যানের বাইরে। বাস না পেয়ে তেজগাঁও থেকে ১২টি ট্রাকে করে নেতাকর্মীরা যায় সমাবেশে। সমাবেশস্থলে যেতে না পেরে বসে বক্তব্য শুনতে থাকা মমতাজ মিয়া বলেন, ‘ট্রাকে কইরাই আইতে হইল। ’

ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। কবিতা ও গানের ফাঁকে ফাঁকে বক্তব্য দেন শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, বিশিষ্ট সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত হলে বিকেল পৌনে ৩টার দিকে সমাবেশ শুরু হয়। শুরুতেই ছিল জাতীয় সংগীত।

উদ্যানের সমাবেশস্থল সাজানো হয় ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের সেই ভাষণ উপস্থাপনের আবহ ফুটিয়ে। কবি নির্মলেন্দু গুণ ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে লিখেছিলেন, ‘স্বাধীনতা—এ শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতাটি। কবি নির্মলেন্দু গুণ সাত মিনিটে সেই কবিতাটি পাঠ করে শোনান গতকাল। সমাবেশে কবি গুণ তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আজকের এ উৎসব আনন্দের। আমি যেন ফিরে পেয়েছি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের বিকেলের রেসকোর্স ময়দান। ’

সমাবেশে সমবেতদের অনেকের হাতে ছিল ছোট ছোট নৌকা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লেকে পাটবোঝাই ও পালতোলা নৌকাও ছিল চোখে পড়ার মতো। সেখানেও ছিল ৭ই মার্চের ভাষণের পঙিক্ত—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

পঁচাত্তর-পরবর্তী ২৩ বছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারে বাধা দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ওই ভাষণ প্রচারে যত বাধা এসেছে, তত তা জাগ্রত হয়েছে। যারা জাতির পিতার নাম মুছতে চেষ্টা করেছে, জানি না তাদের লজ্জা হয় কি না। ইউনেসকো বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর তাদের কি এখন লজ্জা হয় না? দ্বিধা হয় না? এরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রেতাত্মা। স্বাধীন বাংলাদেশে থাকলেও তারা পাকিস্তানের তোষামোদকারী দল। তাই তারা ইতিহাস বিকৃত করতে চেয়েছিল। ’

প্রধানমন্ত্রী ইউনেসকোসহ যে দেশগুলো ভোট দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ দেন। তিনি বলেন, এর আগে বিশ্বস্বীকৃতি পাওয়া ভাষণগুলো ছিল লিখিত। তবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ লিখিত ছিল না। এই ভাষণের জন্য বঙ্গবন্ধুর হাতে কোনো ‘নোটস’ ছিল না।

৭ই মার্চ ভাষণ দেওয়ার আগে স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বঙ্গবন্ধুকে ডেকে নিয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি থেকে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “মায়ের কথা বারবার মনে পড়ে। ওই দিন বাবাকে ডেকে নিয়েছিলেন মা। প্রতিটি ভাষণ বা সভার আগে মা, বাবাকে একটু চিন্তা করার সময় দিতে ঘুমাবার সুযোগ করে দিতেন। সেদিনও তিনি বাবাকে ডেকে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিতে বলেন। তারপর তিনি বললেন, ‘অনেকে অনেক কথাই বলবে। এই মানুষদের জন্য তুমি সারা জীবন কষ্ট করেছ, তুমি জানো কী বলতে হবে। তোমার মানুষদের যে কথাটা বলতে ইচ্ছা করবে সেই কথাটাই তুমি বলবে। সামনে বাঁশের লাঠি, পেছনে অস্ত্র, ঐ পাকিস্তানিরা অস্ত্র উঁচিয়ে আছে। বাংলার মানুষের ভাগ্য তোমার হাতে। ’” 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিহাস তার সত্য স্থানটা অবশ্যই করে নেবে। আজকে সেই স্বীকৃতি বাংলাদেশ পেয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি, মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ, সব মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তি সম্মানিত হয়েছে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানো নিষিদ্ধ ছিল রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে। টানা ২৩ বছর এ অবস্থা ছিল। শেখ হাসিনা বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘যতই তারা বঙ্গবন্ধুর নাম মুছতে চেয়েছে, যতই তাঁর ভাষণ বন্ধ করতে চেয়েছে; তারা স্বাধীনতার চেতনা মুছে ফেলতে পারেনি। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই বাংলাদেশে তারাই জাতির পিতাকে হত্যা করল, তারাই এই ঐতিহাসিক ভাষণ মুছে ফেলার চেষ্টা করল। এই ভাষণ নিষিদ্ধ করল। পঁচাত্তর-পরবর্তীতে যারা ক্ষমতা নিয়েছিল তারা কেউই জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নয়। পঁচাত্তরের পর অবৈধভাবে যারা ক্ষমতা দখলের পালা শুরু করেছিল, যারা এই মাটিতে জন্মগ্রহণ করেনি, এই মাটি ও দেশের প্রতি কোনো টান যাদের ছিল না, তারাই জাতির পিতার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। ’

৭ই মার্চের ভাষণের এ স্বীকৃতিতে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান ঢাকায় নিযুক্ত ইউনেসকোর কান্ট্রি ডিরেক্টর বিয়েট্রিস খলদুন। সমাবেশে তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণের এ স্বীকৃতি দিয়ে ইউনেসকোও গর্বিত। এটিকে ঐতিহাসিক নথি ও প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একটি ভাষণের মাধ্যমে একটি জাতিকে একত্র করার দলিল এটি।

সমাবেশে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ইউনেসকোকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য দেন। ওবায়দুল কাদের শুরুতেই বলেন, এই সেই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণ যেখানে জোড়া জোড়া চোখ একটি আঙুলের দিকে নিবদ্ধ ছিল। ভেঙেছিল ঘুম অজস্র বছরের। একটি কণ্ঠ থেকে এই সেই মাঠ যেখান থেকে আলোর ফোয়ারা জেগে উঠেছিল।

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ৭ই মার্চের ভাষণ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নিগৃহীত নিপীড়িত জাতির অধিকার আদায়ের অনুপ্রেরণা ও শক্তি জোগাবে এটি।

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘আজকের এ সমাবেশে এসে আমি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের মতো শিহরণ অনুভব করছি। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ পেতাম না। বঙ্গবন্ধুকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। আমাদের নতুন শত্রু আছে। তাদেরকে আমাদের সব কিছু দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে। ’

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেই দিনের অভিজ্ঞতা অক্ষয়। ’

শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী বলেন, ৭ই মার্চের ভাষণ বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যে পূর্ণ। তার প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠেছে অধিকারের কথা। ছিল আর্তনাদের কথা। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর আবৃত্তি করেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার ও শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী। সমাবেশে বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে গান গেয়ে শোনান শাহীন সামাদ, মমতাজ ও সাজেদ আকবর।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে জাসদ সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর-উত্তম, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, নেতৃস্থানীয় শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ নাগরিক সমাবেশে অংশ নেন।


মন্তব্য