kalerkantho


রাজধানীর রাজপথে ভাসল নৌকা-ভেলা

জনজীবনে অবর্ণনীয় ভোগান্তি

পার্থ সারথি দাস   

২২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



রাজধানীর রাজপথে ভাসল নৌকা-ভেলা

সড়কে নৌকা। মিরপুরের কাজীপাড়া এলাকার দৃশ্য। ছবি : শেখ হাসান

ঘুম থেকে উঠেই দেখা গেল, পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোড ‘নেই’। হারিয়ে গেছে থইথই পানিতে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির গভীরতা এতই বাড়ল—কেউ কেউ ছোট নৌকাই নামিয়ে নিল পারাপারের জন্য। অদূরে বকশীবাজার থেকে জয়নাগ রোড হয়ে চকবাজারে যাওয়ার পথটিতেও সড়কের চিহ্ন মেলেনি। কোথাও কোমর, কোথাও গলা সমান পানি! যেন পুকুর; শুধু কচুরিপানা নেই, আছে ময়লা-আবর্জনা। এসব এলাকায়ও জরুরি প্রয়োজন যাদের, নারী-পুরুষ, শিশু—নৌকাই ছিল তাদের পারাপারের ভরসা। নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারের কারারক্ষী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান এমন দৃশ্য আগে দেখেননি। বললেন, ‘কোমর সমান পানি পার হতে হচ্ছে। কোথাও তার বেশিও। মানুষ কী করবে!’

গতকাল শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে পানিতে সড়ক ভাসার দৃশ্য। এ যেন কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি নদী কিংবা কাজীপাড়া নদী! ধানমণ্ডির ২৭ নম্বরের মোড়ের অবস্থা ছিল ভয়াবহ।

ব্যক্তিগত গাড়ির হেডলাইট পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছিল। এ নিয়ে ফেসবুকে লেখা হয় মজা করে, ‘সাতাশ একটি নদীর নাম’। দু-এক জায়গায় চলাচলের জন্য এমনকি কলাগাছের ভেলা নামানো হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নামান তাঁদের নৌকা (বোট)। সড়ক উধাও পানিতে। তাই গণপরিবহনও কম ছিল। বাস, অটোসহ বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে যাঁরা নেমেছেন তাঁদের অনেকেই পানিতে ঢাকা গর্তে আটকে পড়েন। অনেক গাড়ি অচল হয়ে পড়ে।

কাকরাইল থেকে ফকিরাপুলের দিকে যেতে যেতেও সড়কের দেখা মিলল না। পানির নিচে ডুবে থাকা সড়কের ওপর দিয়ে আটকে থেকে থেকে চলছিল কয়েকটি বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা। তবে চলতে চলতে পানির তোড়ে একের পর এক আটটি অটোরিকশা সড়কদ্বীপের পাশে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেল।   

ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে সামনে চলতে গিয়ে বড় বিপদ ছিল ডুবে থাকা সড়কের গর্ত, খানাখন্দ। কাকরাইল থেকে ফকিরাপুলের দিকে যেতে দেখা গেল, পল্টন থানা প্রাঙ্গণেও পানি ঢুকেছে; ভাসানী ভবনের সামনে পানির তোড়ে যাওয়াই যাচ্ছিল না। নয়া পল্টনের বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়ক দিয়ে বইছিল জলধারা। ফকিরাপুল মোড় পার হয়ে সোজা সামনের দিকে এগোলে বিপদ আরো বেড়ে যায় পানির উচ্চতা দেখে। পানির তোড়ের মধ্য দিয়ে মোটরসাইকেলে এগিয়ে যাওয়া কষ্টকর ছিল। ভয় ছিল পানিতে পুরো মোটরসাইকেল ডুবে যাওয়ার। বাঁয়ে কোনো রকমে ঢুকে একটু কম উচ্চতার পানির সঙ্গে লড়ার সুযোগ পাওয়া গেল। কমলাপুর রেলস্টেশনের দিকে যাওয়ার পথে দেখা গেল সারি সারি বাসের চাকা বন্ধ হয়ে আছে পানিতে। অচল হয়ে স্থানে স্থানে বন্ধ হয়ে পড়েছে অটোরিকশা। কমলাপুর রেলস্টেশনে দুপুর ২টায় গিয়ে দেখা গেল, স্টেশন প্রাঙ্গষে হাঁটু সমান পানি জমে আছে। টিকিট কেনার জন্য বিভিন্ন কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানো লোকজনের জামাকাপড় ছিল ভেজা। ভেজা কাপড় নিয়ে কোনো রকমে আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম যাওয়ার টিকিট কিনছিলেন আবদুর রহীম। জানালেন, গুলিস্তানে কোমর সমান পানি ঠেলে আসতে হয়েছে। পানি থইথই করছিল মতিঝিল, নটর ডেম কলেজের সামনের অংশ। দুপুরে তাই বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ সড়কে চলাচলের জন্য নৌকা (বোট) নামায়। এসব নৌকায় মানুষজনকে চলাচলে সহায়তা করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

মিরপুর-১০ নম্বর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত সড়কটিতে যান চলাচল বলতে গেলে বন্ধই ছিল। আগের দিন রাত থেকেই পানি জমেছিল স্থানে স্থানে। তার ওপর মেট্রো রেল, সিটি করপোরেশনের উন্নয়নকাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি ও সড়কের অংশ বন্ধ থাকায় চলাচলে বিপদের মুখে পড়তে হয়।

উড়োজাহাজ মোড় থেকে বিজয় সরণি হয়ে ফার্মগেট পর্যন্ত দুপুর ১২টায় গিয়ে চোখে পড়েছে ঢেউ আর ঢেউ। সেই চোটে থেমে পড়ছিল বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, অটোরিকশা, রিকশা, মোটরসাইকেল, রিকশার মতো যানবাহনগুলো।

দুপুর ১টায় ফার্মগেট পুলিশ বক্স থেকে বিজয় সরণি পর্যন্ত সড়কের অর্ধেক প্রায় বন্ধ ছিল। যানবাহন চলাচল করতে পারেনি পানি জমে থাকায়। ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজারের দিকে যেতে যেতে দেখা যায়, তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে বাসের অপেক্ষা করছে। বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নীরা জানায়, মগবাজারে তার বাসা। সকালে বাস না পেয়ে হেঁটে ও রিকশায় বিদ্যালয়ে এসেছিল। ঘণ্টাখানেক ধরে বাসের অপেক্ষা করছে। তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে অচল হয়ে পড়েছিল অটোরিকশা (নম্বর-ঢাকা মেট্টো-থ-১২-৮৫৬০)। অটোর চালক মো. তোফাজ্জল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, কাজীপাড়ার গ্যারেজ থেকে বের হওয়ার পর থেকেই পানি ভেঙে আসতে হয়েছে; এখন প্লাগে পানি ঢুকেছে বলে অটো চলছে না। তিনি জানান, আবহাওয়া ও জলাবদ্ধতার কারণে অর্ধেক অটোই রাস্তায় বের হয়নি।

দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে যেতে যেতে বনানী রেলস্টেশনের টিকিট ঘরের সামনে থেকে বনানী ওভারপাস পর্যন্ত সড়কে ছিল হাঁটু সমান পানি। গাড়ি চলাচল কম থাকলেও এ অংশটুকু পার হতেই ১৫-২০ মিনিট লেগে যায়। পানি জমে থাকায় সড়কে যান চলাচলের অংশ সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল বিভিন্ন সড়কে।  

গ্রিন রোড-পান্থ পথ মোড় থেকে কাঁঠাল বাগানের দিকে কোথাও ছিল হাঁটু সমান পানি, কোথাও কোমর সমান পানি। কাঁঠাল বাগান থেকে গ্রিন রোড পান্থপথ মোড়ে সড়কের ওপরে কোমরপানি দুই দিন ধরেই। গ্রিন সুপার মার্কেট পার হয়ে ফার্মগেটমুখী সড়ক পুরোটাই সকাল ও দুপুরে ছিল জলমগ্ন। ফলে ফার্মগেটের দিকে গেলে গাড়ির বেশির ভাগ অংশ ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় গাড়ি ঘুরিয়ে নিচ্ছিলেন চালকরা। সকাল ৯টা থেকে সেখানে যানজট চোখে পড়ে।

কমলাপুর থেকে দক্ষিণ শাহজাহানপুর হয়ে খিলগাঁও উড়াল সেতুর ওপর দিয়ে চলতে চলতে জলাবদ্ধতা চোখে পড়েনি। উড়াল সেতু থেকে নেমে রামপুরার দিকে যেতে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার অলিগলিতে ঢুকতেই দেখা গেল, ভেলায় চড়ছে কিশোররা। মাঝেমধ্যে রিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করছে কোমর সমান পানি ঠেলে। তবে গর্তে আটকে পড়ছিল এগুলো। গর্ত থেকে রিকশা ও মোটরসাইকেল টেনে তুলতে সহায়তা করছিল এলাকাবাসী।   

আরমানিটোলা থেকে সদরঘাট যেতে মূল সড়কে ছিল শুধু পানি আর পানি। অলিগলিতে কোথাও রিকশার চলাচল ছিল না দুপুরে। কোথাও হাঁটু কোথাও কোমর সমান পানি ভেঙে লোকজনকে চলতে হয়েছে। দুপুরে বকশি বাজার উর্দু রোড, চকবাজার, জয়নাগ রোড, খাজে দেওয়ান, হরনাথ রায় রোড, সাত রওজা, জেলখানার ঢাল, নিমতলি, নবাব কাটরা, চানখাঁর পুল, নাজিরা বাজার, বংশাল, ছোট কাটরাসহ আশপাশের সব এলাকায় দুর্ভোগ নেমেছিল জলাবদ্ধতার জন্য।

বঙ্গভবন  প্রাঙ্গণ, তার পাশের সড়কে পানি জমেছিল। বঙ্গভবনের দক্ষিণ ও পশ্চিমপাশের সড়ক ডুবে গিয়েছিল। বঙ্গভবন থেকে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর মো. নাসির কমলাপুর রেলস্টেশনে টিকিট কিনতে গিয়েছিলেন দুপুরে। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, টানা বৃষ্টির কারণে মেয়র হানিফ উড়াল সড়কে ওঠার পথ বন্ধ রয়েছে। মানুষ ও গাড়ি চলতে পারছে না। বহু কষ্টে পানি ভেঙে তবেই টিকিট কিনতে এসেছেন।

সরেজমিন ঘুরে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে, পল্টন, নয়াপল্টন, মালিবাগ, মৌচাক, মগবাজার, রাজারবাগ, ইন্দিরা রোড, ধানমণ্ডি, শুক্রাবাদ, বাড্ডা, রামপুরা, শান্তিবাগ, গুলবাগ, মোমিনবাগসহ বিভিন্ন স্থানে। মিরপুরের ৬০ ফুট সড়কে আগে কখনো পানি ওঠেনি। গতকাল জমল। খিলগাঁও, সবুজবাগ, বাসাবো, মীরহাজিরবাগসহ বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল পানিতে। জলাবদ্ধতার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ডিএসসিসির ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’ মাঠে নামায়। বিভিন্ন স্থানে বন্ধ হয়ে পড়া ড্রেন থেকে ময়লা সরানোর কাজ শুরু করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে সড়ক জলমুক্ত হয়নি।  

গতকাল পল্টন থেকে রামপুরা যেতে কোনো বাহন না পেয়ে পায়ে হেঁটে চলছিলেন নাশরাত বেগম। রিকশায় রওনা দিয়ে একটু পরই তা গর্তে পড়ে যায়। শেষে রিকশা ছেড়ে পায়ে হেঁটে তিনি রওনা করেন। মালিবাগে যানজটে গাড়ি আটকে থাকে পানি জমে থাকায়। বিকেলে রামপুরার দিকে হেঁটে যেতে যেতে বলছিলেন—এ অবস্থা থেকে রাজধানীবাসী কবে মুক্তি পাবে? প্রগতি সরণির দিকে যেতে যেতে দেখা গেল, নর্দার আগে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে পুলিশের গাড়ি আড়াআড়ি রেখে। তখন সেখানে যানজটে পড়ে নাকাল হয় যাত্রীরা।

বেশি পানি জমে থাকায় গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল কর্তৃপক্ষ সকাল ৭টার মধ্যে মুঠোফোনের মাধ্যমে খুদে বার্তায় শিক্ষার্থীদের স্কুল বন্ধের কথা জানায়। কর্তৃপক্ষ জানায়, বৃষ্টির পানিতে মাঠ তলিয়ে যাওয়ায় স্কুল গতকাল বন্ধ রেখেছে তারা। ফলে প্রস্তুতি নিয়েও স্কুলে যায়নি এ রকম বহু স্কুলের শিক্ষার্থী। ধানমণ্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। দোকানপাটে পানি উঠেছিল। ছিল না ক্রেতাদের আনাগোনা। নিউ মার্কেটের এক নম্বর গেট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ নেওয়াজ হোটেল পর্যন্ত ছিল জলাবদ্ধতা। মার্কেটের ভেতরে জমেছিল হাঁটু সমান পানি। মার্কেটের দক্ষিণ ভবনের নিচতলায় জমেছিল পানি। জলাবদ্ধতার কারণে নিউ মার্কেট ছাড়াও রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যবসায়ীরা মালামাল অন্যত্র সরাতে ব্যস্ত ছিল। গত শুক্রবার রাত থেকেই নিউ মার্কেটের ভেতরে পানি জমতে থাকে। জলাবদ্ধতার কারণে ক্রেতারাও নিউ মার্কেটের দিকে পা রাখেনি। বৃষ্টির পানি খালে যেতে না পারায় মার্কেটের ভেতর আটকে থাকে। গতকাল তা মেশিন দিয়ে টেনে তোলার চেষ্টাও ছিল। ঢাকা নিউ সুপারমার্কেট (দক্ষিণ) বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম সাগরের মতে, সামান্য বৃষ্টি হলেই মার্কেট ডুবে যায়। রাজধানীর মৌচাক-মালিবাগ সড়কসহ বিভিন্ন সড়কের পাশের ফুটপাত ডুবে যাওয়ায় পোশাক ও সবজি ব্যবসায়ীরা দোকানে পসরা সাজিয়ে বসতে পারেনি।


মন্তব্য