kalerkantho


মিয়ানমারে গণহত্যা,বলল জাতিসংঘও

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



মিয়ানমারে গণহত্যা,বলল জাতিসংঘও

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানকে এত দিন জাতিসংঘ ‘আক্ষরিক অর্থেই (টেক্সটবুক) জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ হিসেবে উল্লেখ করলেও এবার সেখানে ‘গণহত্যা’, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ ও ‘যুদ্ধাপরাধ’ সংঘটিত হওয়ার ইঙ্গিত করছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রথমবারের মতো গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ উপদেষ্টা আদামা ডিয়েং ও সুরক্ষার দায়িত্ববিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা ইভান সিমোনোভিত্চ যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।

তাঁরা মিয়ানমারকে ‘ভয়াবহ নৃশংস অপরাধ’ থামানোর আহ্বান জানিয়ে বিবৃতির একেবারে শেষে বিশেষ দ্রষ্টব্য হিসেবে লিখেছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ—এই তিন ধরনের অপরাধ বোঝাতেই তাঁরা ‘ভয়াবহ নৃশংস’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছেন।

গত মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জায়িদ রাদ আল হুসেইন রাখাইনে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানকে ‘আক্ষরিক অর্থেই (টেক্সটবুক) জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও বলেছিলেন, যখন একটি দেশের লাখ লাখ লোককে বাস্তুচ্যুত করে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় তখন একে আক্ষরিক অর্থেই (টেক্সটবুক) জাতিগত নিধনযজ্ঞ ছাড়া আর কী বা বলার আছে?

তবে বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই দাবি করে আসছে যে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চলছে।

জাতিসংঘের বিশেষ উপদেষ্টা আদামা ডিয়েং ও ইভান সিমোনোভিত্চ তাঁদের বিবৃতিতে স্পষ্টই বলেছেন, রাখাইন রাজ্যে ভয়াবহ নৃশংস অপরাধ সংঘটিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাঁরা বেশ কয়েক বছর ধরেই রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। সেখানে ভয়াবহ নৃশংস অপরাধ হতে পারে বলে তাঁরা সতর্ক করেছিলেন।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই উপদেষ্টা রোহিঙ্গাদের ভয়াবহ নৃশংস অপরাধের শিকার হওয়ার ঝুঁকি হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে অনুসৃত বহু পুরনো ও বৈষম্যমূলক নীতি, তাদের ওপর অপরাধ সংঘটন ঠেকাতে ব্যর্থতা এবং রাখাইন রাজ্যে দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না করাকে চিহ্নিত করেছেন। উপদেষ্টারা বলেন, ‘আমরাসহ আরো অনেক কর্মকর্তা ভয়াবহ নৃশংস অপরাধের শিকার হওয়া থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় প্রাথমিক দায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনুযায়ী বাধ্যবাধকতা পূরণের ব্যাপারে সতর্ক করলেও মিয়ানমার সরকার তাতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে সমানভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

রাখাইন রাজ্য ছেড়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া এবং রাখাইন রাজ্যে কয়েক হাজার বৌদ্ধ ও হিন্দু বেসামরিক ব্যক্তির বাস্তুচ্যুতির বিষয়টি উল্লেখ করে জাতিসংঘের ওই দুই উপদেষ্টা বলেন, “আরো একবার, ভয়াবহ নৃশংস অপরাধ ঠেকাতে ব্যর্থতা আমাদের বিভ্রান্ত করে। ‘নেভার এগেইন’ (আর কখনো এমন অপরাধ হবে না) বলে আমরা যে অসংখ্যবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সেটি কবে বাস্তবায়ন করব?’”

উপদেষ্টারা জোর দিয়ে বলেন, যারা ভয়াবহ নৃশংস অপরাধ ঘটিয়েছে তাদের পরিচয় যা-ই হোক না কেন, তাদের অবশ্যই বিচার হতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আনান কমিশনের সুপারিশগুলো মিয়ানমার সরকারের অঙ্গীকার আমলে নিয়ে উপদেষ্টারা বলেছেন, ‘প্রকৃত অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটে তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে। নাগরিকত্ব ইস্যুসহ আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে আরো দেরির অর্থ এ অঞ্চলে আরো সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা। ’

প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশে ঢুকছে ১২ হাজার রোহিঙ্গা শিশু : জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেছে, মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১২ হাজার রোহিঙ্গা শিশু বাংলাদেশে ঢুকছে। আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা কলেরা ও অপুষ্টির বড় ঝুঁকিতে আছে। ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি লেক বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের অনেকেই মিয়ানমারে এমন নৃশংসতা দেখেছে, যা কোনো শিশুরই দেখা উচিত নয়। তারা এই পৃথিবীতেই নরক দেখছে। প্রত্যেকেই বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে। ’ তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ওই রোহিঙ্গা শিশুদের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, রোগ থেকে সুরক্ষার টিকা, চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং প্রয়োজন। তাদের মধ্যে আশা সৃষ্টি করা দরকার।

ডি-৮ সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যুর প্রাধান্য : তুরস্কের ইস্তাম্বুলে গতকাল অনুষ্ঠিত নবম ডি-৮ সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যু প্রাধান্য পেয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন চালানোর কথা উল্লেখ করে এ সংকটের টেকসই সমাধানে রাজনৈতিক ও মানবিক সহায়তার আশ্বাস দেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করেন এবং রোহিঙ্গার বোঝা সবাইকে বহন করার আহ্বান জানান।

মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আহমাদ জাহিদ হামিদিও সংকট মোকাবিলায় আরো আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় জোর দেন। সম্মেলনে অন্য নেতারাও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত খোলা রাখার নীতি তুলে ধরেন এবং মিয়ানমারের নাগরিকত্ব, সব ধরনের অধিকার নিয়ে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে আসছেন জর্দানের রানি : জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, জর্দানের রানি রানিয়া আল আবদুল্লাহ আগামী সোমবার কক্সবাজারে গিয়ে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন করবেন। তিনি ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও জাতিসংঘের মানবিক সংস্থাগুলোর কাজের সমর্থক হিসেবে বাংলাদেশ সফরে আসছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবেন।


মন্তব্য