kalerkantho


এখনো জ্বলছে রাখাইন, চলছে অপপ্রচার

► গণকবর থেকে ৪৫ জনের লাশ উদ্ধার
► মিয়ানমারের লোক দেখানো আশ্বাস!
► জাতিসংঘ ও মুসলিম বিশ্বকে দুষলেন এরদোয়ান

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



এখনো জ্বলছে রাখাইন, চলছে অপপ্রচার

বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা স্রোত এখনো থামেনি। গতকাল লম্বারবিল এলাকা থেকে তোলা ছবি। ছবি : কালের কণ্ঠ

এখনো জ্বলছে রাখাইন। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসার আশ্বাস, আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন কমিটির সঙ্গে বৈঠকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে অং সান সু চির নির্দেশ—সবই যেন লোক দেখানো।

‘মংডুর দিলপাড়া গ্রামের অক্ষত পাঁচটি বাড়িও ভস্মীভূত’—খোদ মিয়ানমার সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় এই শিরোনামে গতকাল সোমবার খবর দিয়েছে। এর মধ্য দিয়েই রাখাইন রাজ্যে ধ্বংসযজ্ঞ চলার চিত্র যেমন পাওয়া যায়, প্রমাণিত হয় দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির মিথ্যাচারও। গত সপ্তাহেই জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সু চি দাবি করেছিলেন, গত ৫ সেপ্টেম্বরের পর রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি চলছে প্রপাগান্ডা লড়াইও। মিয়ানমারে গণকবর থেকে দুই দিনে ৪৫ লাশ উদ্ধারের কথা জানিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দাবি করছে, এ হত্যাকাণ্ড আরাকানের রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি তথা আরসার জঙ্গিরাই চালিয়েছে। অভিযোগটি স্থানীয় গণমাধ্যমও সন্দেহের চোখে দেখছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী স্রোতে ভাটা পড়লেও তা একেবারে বন্ধ হয়নি। এখন যারা আসছে, তাদের কাছেও পাওয়া যাচ্ছে ধ্বংসলীলার তথ্য।

এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান গতকাল বলেছেন, রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের প্রতিবাদে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ আরো সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল।

তিনি জাতিসংঘের পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোরও নীরব ভূমিকার সমালোচনা করেন। এরদোয়ান গতকাল রাজধানী ইস্তাম্বুলে ইন্টারন্যাশনাল অমবুডসম্যান সম্মেলনে রাখা বক্তব্যে বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সেশনে মুসলিমবিশ্বের মধ্যে প্রেসিডেন্ট পর্যায়ে ইরান, প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এবং উপপ্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধিত্ব দেখতে পেয়েছেন। অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো শুধু পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি রাখে। জাতিসংঘকে একটি তালাবদ্ধ ব্যবস্থা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, মিয়ানমারকে নিন্দা করায় সন্তুষ্ট থাকলেই হবে না, অবরোধ আরোপ করতে হবে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট জানান, তাঁর সরকারের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম এবং পরিবেশ ও নগরায়ণমন্ত্রীসহ কয়েকজনের একটি প্রতিনিধিদল শিগগিরই বাংলাদেশ সফরে আসবে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চাপে মিয়ানমার সরকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করে। স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি গত শুক্রবার আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন কমিটির সঙ্গে বৈঠকেও নির্দেশ দেন সমস্যার দ্রুত সমাধান খুঁজতে। তবে মিয়ানমার সরকারের এসব উদ্যোগ লোক দেখানো বলেই মনে করছে টেকনাফে অবস্থানরত অনেক রোহিঙ্গা। তার বাস্তব প্রমাণও মিলছে টেকনাফ সীমান্তে। গতকাল সোমবার দুপুরে টেকনাফের হ্নীলা সীমান্তে কালের কণ্ঠ’র প্রতিবেদকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা মিয়ানমারের রাখাইনে বুরা সিকদারপাড়া আগুনে ছাই হওয়ার দৃশ্য দেখেন।

গত রবিবার বুরা সিকদারপাড়া থেকে পালিয়ে আসা যুবক আলী জোহার বলেন, সেনাবাহিনী তাঁদের গ্রামের বেশির ভাগ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তাঁদের ওপর অমানবিক নির্যাতনও করেছে। বেশির ভাগ রোহিঙ্গা প্রথমদিকে বাংলাদেশে চলে এলেও, যারা থেকে যেতে চেয়েছিল তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে গ্রামছাড়া করে। এখন তারা রোহিঙ্গাদের শূন্য ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে গ্রামগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করছে। আলী জোহার আরো বলেন, সু চি রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বকে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করছে। মিয়ানমার সরকার কিংবা সু চির প্রতি আমাদের আস্থা নেই। সু চির দেওয়া জাতির উদ্দেশে ভাষণের পরও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চলেছে এবং বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। এখন প্রতিদিনই মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরের পাশাপাশি মসজিদ, মাদরাসা ও রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এসব ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন মুছে দিতে তারা সেখানে নিজেদের ক্যান্টনমেন্টসহ সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণেরও উদ্যোগ নিচ্ছে।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে আছে তুলাতুলি গ্রাম। সেনারা গ্রামের প্রায় সাত শতাধিক বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তুলাতুলি গ্রামের প্রখ্যাত আলেম শতবর্ষী মৌলভী আহমদ হোসেনকেও তারা নৃশংসভাবে জবাই করে হত্যা করে। মাওলানা আহমদ হোসেনের ছেলে জাকারিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, সর্বজন শ্রদ্ধেয় তাঁর বাবাকেও সেনাবাহিনী বাঁচতে দেয়নি।

নিরপেক্ষ বিভিন্ন সূত্র মতে, ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা শুরুর পর সেখানে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায় দুই পক্ষই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়, বাড়িঘরে আগুন দেয়। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারাও গণমাধ্যমকে এমন তথ্য দিচ্ছে। রবিবার ২৮ এবং গতকাল আরো ১৭ মরদেহ গণকবর থেকে তোলার কথা দাবি করে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বলছে, মরদেহগুলো হিন্দু সম্প্রদায়ের নিখোঁজ সদস্যদের। তবে কাজটি আরসার’ই দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী এমন দাবির প্রমাণযোগ্য কোনো ভিত্তি দিতে পারেনি। ঘটনাস্থলে কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের যাতায়াতের অধিকার নেই বলে কর্তৃপক্ষের দাবির সত্যতা নিশ্চিত করাও কঠিন।

সহিংসতাবিষয়ক অন্যান্য খবর স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বিনা প্রশ্নে প্রচার করলেও এই খবরটিকে তারা নির্জলা সত্য হিসেবে নিচ্ছে না। ইরাবতি ডটকমের খবরের হেডলাইন করা হয় ‘মুসলিম মিলিট্যান্টস এলেজডলি কিল হিন্দুস’। অর্থাৎ হত্যাযজ্ঞটি আরসা জঙ্গিরাই চালিয়েছে এই দাবিটি ইরাবতিও সন্দেহের চোখে দেখছে।

এর আগে থেকেই খবর পাওয়া যাচ্ছিল মংডু এলাকার ইয়ে বাও কিয়াও এবং তাউং ইওয়ার গ্রামের ১০২ জন সদস্য নিখোঁজ রয়েছে। দুই গ্রামের মাঝখানে পাহাড়ি এলাকায় মরদেহগুলো পাওয়া যায়। সেনাবাহিনী এখনো এলাকায় সন্ধানকাজ চালাচ্ছে বলে বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন নেতা নি মাউল। তিনি বলেন, রবিবার উদ্ধারকৃত ২৮টি লাশের পরিচয়ের ব্যাপারে এখনো নিশিচত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

এদিকে গতকাল ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যৌথ বাহিনী মংডুতে যখন নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে রত ছিল এরই মধ্যে দীলপাড়া গ্রামের পাঁচটি বাড়িতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এ জন্য দায়ী দুষ্কৃতকারীদের ধরার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করা হয়। গ্রামে কী পরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে তার বিবরণ না দিলেও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বলেছে, এই পাঁচটি বাড়িই সেখানে অক্ষত ছিল। জ্বলন্ত বাড়ির আগুনের ছবিও তথ্য মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজে দেওয়া হয়।

অং সান সু চির দপ্তরের পেজেও মিলছে রাখাইনে এখনো ‘জ্বালাও-পোড়াও’ সহিংসতা চালানোর তথ্য। শনিবার সু চির পেজের এক পোসেট দেখা যায়, একটি গ্রামের কিছু বাড়ি জ্বলছে। নাশকতার বেশ কিছু ছবির মধ্যে একাধিক আলোকচিত্রে দেখা যায়, দেশি বিস্ফোরক। তবে এগুলো যে কিভাবে উদ্ধার করা হয়েছে, কারা করেছে সে দৃশ্যের কোনো ছবি নেই। সহিংসতা শুরুর পর থেকেই দেখা যাচ্ছে, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সব সহিংসতার জন্য এককভাবে আরসাকেই দায়ী করে আসছে, যদিও নিরপেক্ষ গণমাধ্যম আঙুল তুলছে রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর লোকজনের দিকে। মনে করা হচ্ছে, মিয়ানমার প্রকৃত তথ্য আড়াল করতেই এই প্রোপাগান্ডার কৌশল বেছে নিয়েছে।


মন্তব্য