kalerkantho


ইতিহাসের ফেরার দিনে ভারতকে পাকিস্তানের ক্রিকেটশিক্ষা

১৯ জুন, ২০১৭ ০০:০০



ইতিহাসের ফেরার দিনে ভারতকে পাকিস্তানের ক্রিকেটশিক্ষা

আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ী পাকিস্তান দলের উচ্ছ্বাস। ছবি : এএফপি

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেন না। সত্যি।

আর তাই আজহারউদ্দিনের উদাহরণ সামনে রেখে সৌরভ গাঙ্গুলি ভুল করেন। গাঙ্গুলির পুনরাবৃত্তি করেন বিরাট কোহলির মতো বিন্যস্ত মানসিকতার মানুষও।

১৯৯৬ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে আগে ব্যাটিং দিয়ে স্পিনের ফাঁদে পড়ে কেঁদেছিল আজহারের ভারত। তবু ২০০৩ বিশ্বকাপ ফাইনালে গাঙ্গুলি টস জিতে অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাট এবং সঙ্গে কাপটাও দিয়ে দিলেন। এর ১৪ বছর পর আবার কোহলি টস জিতে দিয়ে দিলেন সেই সুযোগটা, যেটা কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানে এই ওঁরা এখন ইমরানদের প্রায় সুযোগ্য উত্তরাধিকার।

মানুষ ইতিহাস ভুলে যায় বলেই যেন ইতিহাস মাঝেমধ্যে ফিরে এসে তার শক্তি দেখায়। আর সেই ফিরে আসা কখনো যেমন বেদনার, কখনো আবার আনন্দে ভেসে যাওয়ার। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পরেরটি যেমন। ১৯৯২ সালে ইমরানের সেই দলও এবারের মতো যা-তা ভাবে শুরু করেছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ১০ উইকেটে হার দিয়ে শুরু টুর্নামেন্টে ভারতের সঙ্গে হেরেও ছিল সহজেই। এবারও প্রায় অবিকল সেই স্ক্রিপ্টই যেন।

ভারতের সঙ্গে হার, প্রায় বিদায় নিয়ে নেওয়া, সবার হিসাবের বাইরে চলে যাওয়া এবং তারপর সবাইকে পায়ে মাড়িয়ে শ্রেষ্ঠত্বের পথে চলা।

ম্যাচ শেষে আজহার আলীদের উল্লাস দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল ক্রিকেট অথবা সামগ্রিক অর্থে খেলারই কী শক্তি! মাত্র পাঁচটি ম্যাচে কী করে বদলে যায় কয়েক বছরের জমে থাকা বিশ্বাস। যে সরফরাজের দল বা এই প্রজন্মকে মনে হচ্ছিল পাকিস্তানের ঐতিহ্যের কলঙ্ক, এখন তাদের মাথাতেই শ্রেষ্ঠত্বের অলংকার। মাঝখানে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতলেও ওয়ানডেতে ইমরানের দলের পর এটাই পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অর্জন। না, আকরাম বা ইনজামামের দুরন্ত দলও ওটা পারেনি। মাত্র পাঁচটি ম্যাচ, তাতেই হারানো রাস্তার পথিকরা সোজা রাজসিংহাসনে।

নবাব সিরাজউদ্দৌলা, ভগৎ সিং কিংবা নেতাজী সুভাষ বসুরা যদি বেঁচে থেকে কাল ম্যাচ শুরুর আগের লন্ডনের ছবিটা দেখতেন, তাহলে তৃপ্তি নিয়ে মরতেন। ফাইনালে পুরো লন্ডন এমন ভারত-পাকিস্তান আর উপমহাদেশময় হয়ে গেল যে একেকবার মনে হচ্ছিল লন্ডন বোধ হয় দখলই হয়ে গেছে। ওদেরই দেশে ওদেরই মাঠে তাদের উপনিবেশগুলোর এমন উৎসবে যেন রক্তাক্ত ইতিহাসের কিছু দায়শোধও হয়। সেই রক্তের ইতিহাসের পিঠে আছে ক্রিকেটের যে ইতিহাস তাকে অনিশ্চয়তার গৌরবে সবচেয়ে বেশি যারা ভাসিয়েছে—তাদের নাম পাকিস্তান। সেই অনিশ্চয়তা তারা হারিয়েছে গত কয়েক বছর। যুদ্ধ-বিগ্রহের কুপ্রভাবে আরো অনেক কিছুর মতো ভেসে গেছে ক্রিকেটটা। সেটাই মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু এই যদি হয় দেখার একটা চোখ, তাহলে অন্য চোখও আছে। বিশ্ব ক্রিকেট থেকে একঘরে হয়ে থাকাটা নিজেদের মধ্যে একটা জেদ তৈরি করেছিল। সেই জেদেরই যেন প্রকাশ ঘটল এখানে। ক্রিকেটীয় শক্তির সঙ্গে জেদ বা বাড়তি কিছু না মিললে কী করে এই অচেনা-অজানাদের দল শিরোপা জিতে যায়! দুই ম্যাচেই ম্যাচের আগে সবাই ভাবল পাকিস্তান উড়ে যাবে। তা যাদের এ রকম আন্ডারডগ ধরা হয়, তারাও কখনো সখনো জিতে যায়। কিন্তু তারা কখনো এভাবে জেতে না যেভাবে জিতল পাকিস্তান। আন্ডারডগরা ফেভারিটদের হারায় কষ্টে-সৃষ্টে, তুমুল লড়াই করে। এখানে উল্টা ঘটনা। কেউ যদি ক্রিকেট না জেনে কালকের খেলাটা দেখে এবং তারপর আগের দিনের বিশেষজ্ঞদের মত দেখে তাহলে বলবে এই বিশেষজ্ঞরা আসলে বিশেষ রকমের মূর্খ। পাকিস্তানের এই দল পুরো দুনিয়ার ক্রিকেটবোধকেই  লুটোপুটি খাইয়ে গেল!

দুপুরে শুনলাম আইসিসিও নাকি চাইছে পাকিস্তান জিতুক। কেন? ধারণাটা এ রকম। পাকিস্তানের ক্রিকেট সমস্যায়। একটা-দুটো বড় টুর্নামেন্ট না জিতলে শক্তি হিসেবে ওরা হারিয়ে যাবে। জিম্বাবুয়ে হারিয়ে গেছে। বর্ণগত বিভেদ আর কোটা প্রথায় দক্ষিণ আফ্রিকাও কোথায় গিয়ে থামবে বলা মুশকিল। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ায়ও জনপ্রিয়তা তলানির দিকে। তখন আসলে পাকিস্তানকে পৃষ্ঠপোষকতা হয়তো ক্রিকেটের স্বার্থেই দরকার। ভারত-পাকিস্তানের লড়াইয়ের হারানো উত্তাপও ফিরে আসা জরুরি। এ রকম নানা হিসাব আইসিসিকে কষতে হয়। তা পাকিস্তানের শিরোপা জেতায় কিছু কাজ হয়তো হতে পারে, কিন্তু বৃহত্তর অর্থে ক্রিকেটের জন্য এই টুর্নামেন্ট কতটা লাভের হলো প্রশ্নটা থাকলই। টুর্নামেন্টের প্রায় বেশির ভাগ ম্যাচই একতরফা। সেমিফাইনাল-ফাইনাল তিন ম্যাচই ম্যাচের অর্ধেকের একটু বেশি গড়ানোর আগেই শেষ। ক্রিকেটের জন্য মোটেও ভালো বিজ্ঞাপন নয়। ওয়ানডের জন্য তো খুবই খারাপ। কে যেন রসিকতা করে বলছিল, আইসিসিও আর চায় না ওয়ানডে থেকে থেকে টি-টোয়েন্টিকে ডিস্টার্ব করুক, তাই...। এসবই ধারণা কিংবা রসিকতা কিন্তু কাজের কথা হচ্ছে ওয়ানডে ক্রিকেটের বা ফাইনালের এই অপমৃত্যুর দায় তো আসলে অধুনা ক্রিকেটের ‘শাসক’ এবং টি-টোয়েন্টির প্রচারক ভারতকেই নিতে হবে। প্রথমত এ রকম ম্যাচে টসে জিতে আগে প্রতিপক্ষকে ব্যাটিং দিতে হবে কেন? ওরা রান তাড়া করায় স্বচ্ছন্দ, ঠিক আছে—কিন্তু ফাইনাল ম্যাচের একটা চাপ আছে না! তা ছাড়া বাংলাদেশের বিপক্ষে তবু সকালে মেঘলা হাওয়ার সুবিধা নেওয়ার একটা ব্যাপার ছিল, এখানে কিচ্ছু নেই। সকাল থেকেই ঝলমলে রোদ। বিরাট ব্যাটিং শক্তি দিয়ে বড় স্কোর করে পাকিস্তানকে চাপে ফেলার বদলে নিজেরাই চাপ নিল। এমন চাপ যে বোলাররা নো-ওয়াইড করতে থাকলেন যথেচ্ছ। তেমনি একটা ‘নো বলে’ই আসলে বদলেছে ম্যাচের গতিপথ। ভুবনেশ্বর-বুমরারা শুরু করেছিলেন দারুণ, পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানরা অস্বস্তিতে। চতুর্থ ওভারে ৮ রানের মাথাতেই ফখর জামান আউট! তিনি ফিরে যাচ্ছেন এবং ভারতীয়রা উৎসব করছে, দেখে মনে হচ্ছিল এটাই হবে সারা দিনের ছবি। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডে ছবিটা বদলাল যখন দেখা গেল বুমরা নো বল করেছেন। ফখর জামান ফিরলেন। আচ্ছা ফখর জামানই তো! কারণ তারপরই দেখা গেল অন্য চেহারায়। এখন বল তাঁর ব্যাটে লাগে, আলগা বল উড়িয়ে মারেন। যে জুটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ৮ রানে সেটা গিয়ে পৌঁছায় ১২৮ রানে। যে ব্যাটসম্যান আউট হওয়ার কথা ছিল ৩ রানে, তিনি করেন ১১৪। ১২৮ রানের উদ্বোধনী জুটির পরও পাকিস্তান ভেঙে পড়তে পারত, কিন্তু পাকিস্তান তো জানত তাদের যে বোলিং তাতে খুব বেশি রান দরকার নেই। সেই রানটা নিশ্চিত করে দেন বুমরা এবং নো বল। পরের অংশটুকুতে ওদের ব্যাটিং ছিল বিন্যস্ত। ৩৩৮ রান তবু যে মরিয়া হয়ে চালিয়ে, এমন নয়। মাঝবিরতির সময় আরো ২০-২৫ রান করা সম্ভব বা উচিত ছিল বলেই মত দিচ্ছিলেন বিশেষজ্ঞরা, ম্যাচ শেষে যাকে মনে হচ্ছে হাস্যকর রকমের বিশ্লেষণ।

কিন্তু তখন মনে হয়নি। মনে না হওয়ার প্রথম কারণ উইকেট। দ্বিতীয় কারণ বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটা। সেখানে ভারত ২৬৪ রানকে যেভাবে খেলনা বানায়, তাতে কালও প্রথম ইনিংস শেষে কেউ খুব বেশি নিশ্চিত হয় না। রোহিত আর ধাওয়ান যে মেজাজে, কোহলি যেভাবে ব্যাটের জায়গায় একইসঙ্গে ছবির তুলি এবং যুদ্ধের তলোয়ার নিয়ে নামছেন তাতে ব্যাটিংয়ে ওরা যেন সব সম্ভবের দল। কিন্তু পাকিস্তানের বোলিং? ইমরান-ওয়াকারদের তুলনায় ওরা দুগ্ধপোষ্য হতে পারে, তবু ঐতিহ্যের জোর তো একটা কাজ করেই। সঙ্গে জমানো জেদ। একঘরে হওয়ার বঞ্চনায় তৈরি হওয়া প্রত্যয়। মিলে-মিশে আমিরের হাত থেকে বলের বদলে যেন বেরোয় গোলা। আর তাতে শুরুতেই রোহিতের বিদায়। আরো অনেকে আছেন দলে কিন্তু ওয়ানডেতে বড় ইনিংস খেলার ক্ষমতায় সম্ভবত রোহিতই সবার আগে। কালকে তারই দরকার ছিল সবচেয়ে বেশি। তবু কোহলি আছেন। ব্যাটিং শিল্পের আধুনিক জাদুকর তিনি কিন্তু কাল যেন কোহলির জার্সি গায়ে অন্য কেউ নামলেন। বড় ম্যাচ তাঁকে বাড়তি শক্তিতে আরো ধারালো করে তোলে অথচ সেই তিনি কি না এমন গুরুত্বপূর্ণ দিনে একটা সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারলেন না। আজহার আলীর সৌজন্যে বেঁচে যাওয়ার পরের বলেই চালিয়ে যখন ক্যাচ দিলেন তখন স্কোরকার্ড দেখাচ্ছে মাত্র দ্বিতীয় উইকেট পড়েছে। কিন্তু সবাই জানছে ভারতের ম্যাচ জেতার সম্ভাবনা প্রায় নাই হয়ে গেল। তা নিয়ে তবু যদি কোনো সন্দেহ থেকে থাকে তবে সেটা দূর হয়ে যায় ধোনি-যুবরাজসহ সবাই ফিরে গিয়ে ৫৪ রানে ৫ উইকেট হয়ে যাওয়ার পর। এরপর পান্ডিয়া যা করেছেন সেটা রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার আসার মতোই। ৪৩ বলে ৭৬ রানের সেই ঝড়টা আবার শেষ রান আউটে। কালকের ভারতের ভাগ্য বিড়ম্বনার ছবিটা ষোলো আনা পূর্ণ করতেই যেন তাঁর এমন বিদায়। নইলে যে জাদেজা কিছুই করতে পারছেন না অন্য প্রান্তে দিব্যি দাঁড়িয়ে তিনি যেন পান্ডিয়ার আউট হওয়া নিশ্চিত করলেন। নিশ্চিত হলো ভারতের ১৮০ রানের হার। ঠিক যেভাবে দুই দলের প্রথম ম্যাচে পাকিস্তান বিধ্বস্ত হয়েছিল তাঁর উল্টা ছবি।

আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে বিরাট কোহলিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এ রকম একতরফাভাবে পাকিস্তান যে উড়ে গিয়েছিলেন সেটা এই ম্যাচে কাজ করবে কি না?

বিরাট অধিনায়কসুলভ সৌজন্যে বললেন, ‘একটুও না’, ‘এটা নতুন ম্যাচ’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

ঠিক। সবই নতুন ম্যাচ। তবু ঠিক ইতিহাস ফিরে আসে কোনো কোনো ম্যাচে। আর দেখায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেন না।

আবার দেখায়, ইতিহাস কী করে প্রায় একইরকমভাবে পুনরাভিনীতও হয়!

 


মন্তব্য