kalerkantho


সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে ধাপে ধাপে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে ধাপে ধাপে

ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের কনফারেন্স রুমে গতকাল ‘গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে নির্ভুল তথ্যচিত্র উপস্থাপনের মাধ্যমে ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞ চালালে একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন বিশিষ্টজন, গবেষক ও শহীদ পরিবারের সন্তানরা। তাঁরা বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কূটনৈতিক কৌশলে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সাহায্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করতে হবে। দেশের ভেতরেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে হবে ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে। দেশে-বিদেশে এভাবে ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞ চালালে বিশ্ববাসীর নজরে পড়া সম্ভব। শুধু গর্বের জন্য নয়, মানবতার পক্ষে বাঙালির অবস্থান উন্নত করতে এ স্বীকৃতি কাজ করবে। আর ৩০ লাখ শহীদও হয়ে উঠবেন বিশ্বজনীন ইতিহাসের অংশ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে গণহত্যার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি বলেও মনে করেন তাঁরা। গতকাল শনিবার দুপুরে কালের কণ্ঠ আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় এসব অভিমত তুলে ধরা হয়। ‘একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় গণহত্যা দিবসের জাতীয় স্বীকৃতি এবং গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য সরকারের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ার কনফারেন্স রুমে এ আলোচনার সঞ্চালক ছিলেন কালের কণ্ঠ সম্পাদক কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। সূচনা বক্তব্য দেন কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল। আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ করুণাময় গোস্বামী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারোয়ার আলী, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের মহাসচিব হারুণ হাবীব, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব এ কে এম আতিকুর রহমান, ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটির আহ্বায়ক ডা. এম এ হাসান, শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তান ও দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক শাহীন রেজা নূর, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সহসভাপতি ডা. ফৌজিয়া মোসলেম, শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তান ডা. নুজহাত চৌধুরী ও আসিফ মুনীর।  

সূচনা বক্তব্যে মোস্তফা কামাল বলেন, “গণহত্যা নিয়ে কালের কণ্ঠে আমরা শুরু থেকেই বিশেষভাবে কলাম, প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছি। আমরা চেয়েছি দিবসটি জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পাক। এ বছরের শুরু থেকেই আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি বিষয়টির। যেদিন জাতীয় সংসদে দিবসটি জাতীয় দিবসের স্বীকৃতির জন্য প্রস্তাব তোলা হয়েছিল, সেদিনও কালের কণ্ঠ’র ‘মতামত’ পুরো এক পৃষ্ঠায় সাধারণ মানুষের একই দাবি উঠে আসে। একাত্তরে যে গণহত্যা হয়েছিল তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছিল, এমনকি টাইম ম্যাগাজিনেও ‘জেনোসাইড’ নামে মূল রচনা ছাপা হয়েছে। আমরা যদি গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাই তাহলে পাকিস্তানি ঘাতকরা আন্তর্জাতিক মহলে গণহত্যাকে অস্বীকার করে যে দাবি জানিয়ে আসছে সেটি প্রতিষ্ঠিত হবে। ”

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ করুণাময় গোস্বামী বলেন, ‘গণহত্যার ওপর কয়েক খণ্ডে প্রামাণ্য পাঠ প্রণয়ন করা যায়। যাবতীয় তথ্য ও চিত্র ছাড়াও তার সঙ্গে অডিও-ভিডিও থাকবে। সরকার রচয়িতা ও গবেষকদের এ জন্য সম্মানী ও ভাতা দিতে পারে। বাইরে গণহত্যার দাবি তোলার আগে আমাদের দেশের ভেতরে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ দিবস পালন বাধ্যতামূলক করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় এ জন্য তথ্যপত্র দেবে। বাংলাদেশ স্টাডিজে গণহত্যা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায়। জাতীয় গণহত্যা দিবসে বধ্যভূমিতে, শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষ মোমবাতি প্রজ্বালন বা আলোর মিছিল করতে পারে। ’

ডা. সারোয়ার আলী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর ৪৬ বছরে গোটা পৃথিবী বদলে গেছে, বাংলাদেশও বদলেছে। কোনো বিষয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র যদি পিছিয়ে থাকে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। শুধু কূটনৈতিক উদ্যোগ দিয়ে বাংলাদেশের এই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করা সম্ভব নয়। এটি করতে হলে, এটি নিয়ে আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট আবস্থান তৈরি করতে হবে। গণহত্যার স্বীকৃতি শুধু বিদেশ নয়, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য। গণহত্যার চিহ্নস্বরূপ বধ্যভূমিগুলোকে চিহ্নিত ও সংরক্ষণ করতে হবে। কোথায় কী ধরনের গণহত্যা ঘটেছিল তার বিবরণ তুলে ধরতে হবে এবং গণহত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে আন্তর্জাতিক মহলে। তাহলে এই স্বীকৃতি আদায়ের পথ তৈরি হবে। ’

হারুন হাবীব বলেন, গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। তা করতে হবে রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে। দীর্ঘ প্রস্তুতি নিতে হবে পরিকল্পনাসূচির ওপর ভিত্তি করে। কূটনৈতিক মিশনগুলোকে এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশ দিতে হবে। গণহত্যা আর্কাইভ তৈরি করতে হবে।

শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাই একাত্তরের গণহত্যার। এই স্বীকৃতি চাওয়ার আগে আমাদের ঠিক করতে হবে, আমরা কেন এই স্বীকৃতি চাচ্ছি, কিভাবে এই স্বীকৃতি আদায় করা যায়। বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টে আগে এই স্বীকৃতি আদায় করতে হবে। ’ তিনি বলেন, ২০০৫ সালে ইউএস কংগ্রেসে এই স্বীকৃতির জন্য চেষ্টা করা হয়েছিল। আর্মেনিয়াকে তাদের দেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করতে হয়েছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছিল। তারা তাদের দেশের পার্লামেন্টে বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি উপস্থাপন করেছিল।

গোলাম কুদ্দুছ বলেন, বধ্যভূমিগুলোকে কেন্দ্র করে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করা যায়। এ জন্য তরুণদের দিয়ে কমিটি করতে হবে। তাহলে স্থানীয়ভাবে চেতনা বিকাশ হবে। ২৫ মার্চ রাতে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল। ৯ মাসে ব্যাপকতা আরো ভয়াবহ ছিল।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এ কে এম আতিকুর রহমান বলেন, ‘একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দরকার। একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। এটা হয়েছে ব্যক্তিগত উদ্যোগের মাধ্যমে। গণহত্যার ক্ষেত্রেও সকলে এ জন্য উদ্যোগী হতে পারেন। ’

কালের কণ্ঠ’র আলোচনা আয়োজনটি সময়োচিত উল্লেখ করে ডা. এম এ হাসান বলেন, এ গণহত্যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি রাখে। জাতির জনক ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে লন্ডনে নেমেই প্রথম ৩০ লাখ শহীদের ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং গণহত্যার জন্য ১৫ হাজার পাকিস্তানি সেনা ও কর্মকর্তার বিচারের কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু দেশীয় দালালদের বিচারের জন্য দালাল আইনে বিচারকাজ শুরু করিয়েছিলেন। পর্দার অন্তরালে একাত্তরের মুখ্য অপরাধী, পরিকল্পনাকারীরা ভিন্ন নষ্ট আত্মপরিচয় নির্মাণ করে। তিনি বলেন, ‘১৯৭২ সালে আমি দেখেছি, শহীদের হাড়গোড় স্তূপীকৃত ছিল। বলা হয়ে থাকে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী। কিন্তু তার বাইরেও রাও ফরমান আলী, ইয়াহিয়া ও রাজাকার কমান্ডার আবদুর রহিমসহ আরো যুদ্ধাপরাধী রয়েছে। মুখ্য অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ায় এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ কমে যায়। পাঁচ হাজার বধ্যভূমি শনাক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে এক হাজারের বেশি বধ্যভূমি শনাক্ত করা আছে। ২০০৪ সালে জেনোসাইড ম্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছিল। ’ তিনি আরো বলেন, জেনোসাইড কোনো হালকা বিষয় নয়। এটি যে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল তা প্রমাণ করতে হবে। কারা করেছিল সেটিও চিহ্নিত করতে হবে।

শাহীন রেজা নূর বলেন, ‘১৯১৫ সালের আরমেনিয়া গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে দীর্ঘ বছর পর। আমাদের গণহত্যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি না পেতে নানা ষড়যন্ত্র হচ্ছে অনেক উচ্চ মহল থেকে। একাত্তরের গণহত্যা এমন একটি গণহত্যা ছিল, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে, এমনকি জাতিসংঘের ভাষ্যেও উঠে এসেছে। একাত্তরের এ হত্যাকাণ্ড যে একটি গণহত্যা, তা নিয়ে কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু এ গণহত্যাকে আমরা আন্তর্জাতিক মহলে সেভাবে উপস্থাপিত করতে পারিনি। অভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে এ স্বীকৃতি আদায়ের কাজ পরিচালনা করতে হবে। এ জন্য কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় এগোতে হবে। এর জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হবে যৌথভাবে। ’

ডা. ফৌজিয়া মোসলেম বলেন, একাত্তরে প্রায় সাড়ে চার লাখ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের এই ইতিহাস বাদ দিয়ে গণহত্যার পুরো ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়।

ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, ‘আমার বাবার হত্যাকারী মাওলানা আবদুল মান্নান মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, এমনকি আমার চাচার কাছেও স্বীকার করেছিল সে আমার বাবার হত্যাকারী। পরে সে বলেছিল তার হাতে রক্তের দাগ নেই। সেই মুক্তিযোদ্ধারা এখনো বেঁচে আছেন। কিন্তু আত্মস্বীকৃত খুনিরা অস্বীকার করছে সেই স্বীকৃত ইতিহাস। প্রমাণিত সত্যকে অস্বীকার করা আন্তর্জাতিক যড়যন্ত্রের অংশ। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টার মাধ্যমে এ গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক যড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়ানো যাবে। ’

আসিফ মুনীর বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এ স্বীকৃতির জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করতে হবে। একটি শক্তিশালী ক্যাম্পেইন চালু করতে হবে আন্তর্জাতিক মহলে। এসবের জন্য দরকার সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য। এ বছর ২৫ মার্চকে বাংলাদেশ জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করেছে। পালনের বিভিন্ন তথ্য আন্তর্জাতিক মহলে উপস্থাপন করতে হবে। আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আমাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। ’

আলোচনার শুরুতে কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, হৃদয়ের রক্তক্ষরণের একটি দিন হলো একাত্তরের ২৫ মার্চ। সেই রাতে কিভাবে ঢাকায় মানুষ রাত কাটিয়েছিল, কিভাবে হত্যাযজ্ঞ চলেছিল, তা ওই সময়ের প্রত্যক্ষদর্শীরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারেন। কোন প্রক্রিয়ায় কিভাবে এগোলে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে তা নিয়ে আলোচনা হবে। তিনি বলেন, কালের কণ্ঠ তৃণমূলের মানুষকে গণহত্যার বিষয়টি জানাচ্ছে। এ ছাড়া বীরাঙ্গনা, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কালের কণ্ঠ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়তে কাজ করে যাচ্ছে।


মন্তব্য