kalerkantho


‘বীরত্ব’ দেখাতেই কিশোর তরুণরা গ্যাং ভায়োলেন্সে

সরোয়ার আলম ও রেজোয়ান বিশ্বাস   

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘বীরত্ব’ দেখাতেই কিশোর তরুণরা গ্যাং ভায়োলেন্সে

২০০১ সালে উত্তরায় কাঁকড়া গ্রুপের মাধ্যমে দলবদ্ধ সন্ত্রাসের সঙ্গে পরিচয় ঘটে রাজধানীবাসীর। এরপর গড়ে উঠেছে আরো নানা সংগঠন, যারা নিজ নিজ এলাকায় যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন অপকর্মে। ক্ষমতা, সমীহ আদায়, খারাপ কাজ করা এবং এক ধরনের সুরক্ষার আকাঙ্ক্ষা থেকেই কিশোর-তরুণদের গ্যাং তৈরি হচ্ছে। তাদের বেশির ভাগই উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। অনেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া। এরা নিজেদের ‘কমান্ড এরিয়া’য় দাপটের সঙ্গে চলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও খুব সক্রিয়। গ্রুপের নামে ফেসবুক পেজ খুলে নিজেদের তত্পরতার খবর ও ছবি পোস্ট করে।

রাজধানীতে পর পর কয়েকটি সন্ত্রাসী ঘটনায় এসব গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়ায় তত্পর হয়েছে পুলিশ ও র‌্যাব। সমাজবিদ ও অপরাধবিজ্ঞানীদের অভিমত, শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতায়  কিশোর-তরুণদের অপরাধপ্রবণতা কমানো যাবে না। এ জন্য পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও দায়িত্ব নিতে হবে।

সন্তান কোথায় যায়, কী করে, কার সঙ্গে মেশে, অভিভাবকদের অনেকেই তা খবর রাখেন  না। শিক্ষার্থীরা অনিয়মিত হয়ে পড়ছে কি না সেই খবর রাখে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।

৬ জানুয়ারি উত্তরায় নিহত কিশোর আদনান কবিরের বাবা কবির হোসেনও বললেন সামাজিক প্রতিরোধের কথা। আদনান ভালো ছাত্র ছিল, জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেয়েছিল। সেদিনের বর্ণনা দিয়ে কবির হোসেন বলেন, বন্ধুদের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলতে মাঠে গিয়েছিল আদনান। তার সঙ্গে আরো কয়েকজন ছিল। তারা পালাতে পারল, সে পারেনি। শারীরিকভাবে দুর্বল ছিল আদনান।

আদনানকে কেন হত্যা করা হয়েছে তা তখন বুঝতে পারেননি বাবা। বলেন, ‘পরে জেনেছি, গ্যাং গ্রুপ তাকে মেরেছে। ওরা পশ্চিমাদের আদলেই গ্যাং তৈরি করেছে। তাদের বিচার হতে হবে। সামাজিকভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। ’

সারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৫ হাজার গ্যাং সক্রিয়, যাদের প্রতি চারজনের একজনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ডেনভারে কিশোরদের ১৪ শতাংশই গ্যাং ভায়োলেন্সে জড়িত এবং সেখানকার সহিংস ঘটনার ৮৯ শতাংশের জন্য এরা দায়ী—এমন তথ্য রয়েছে সরকারি নথিতে। অথচ ঢাকার কিশোর সন্ত্রাসীদের কোনো তালিকা নেই পুলিশের কাছে।    

স্কুল ড্রেসে বাইরে ঘোরাঘুরি করলে তাদের আটকের নির্দেশ দেওয়া হয় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। এরপর গত এক মাসে প্রায় ৭৫০ কিশোরকে আটক করা হয়। পরে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয় বলে জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, হস্তান্তরের সময় অভিভাবকদের মুচলেকা নেওয়া হয়েছে, স্কুল কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘স্কুল চলাকালীন বাইরে ঘোরাফেরা, সন্ধ্যার পর মোটরবাইকে মহড়া এবং দলগতভাবে আড্ডা দিলেই আটক করা হচ্ছে। তবে কোনো শিশু-কিশোরকে প্রথম অবস্থায় অপরাধী হিসেবে নয়, সতর্ক করার জন্যই ধরা হচ্ছে। উত্তরায় আদনান হত্যার পর এ ধরনের গ্যাং সম্পর্কে আমরা প্রথম জানতে পারি। ’

পুলিশের উত্তরা ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার বিধান ত্রিপুরা কালের কণ্ঠকে বলেন, উত্তরায় পুলিশের পক্ষ থেকে গত ৩০ জানুয়ারি কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ ও মাদকবিরোধী সমাবেশ করা হয়। সেখানে সবাই স্বীকার করে, কিশোর অপরাধ দমনে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তেজগাঁও ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার বিপ্লব সরকার জানান, গ্যাং গ্রুপ প্রতিরোধে নানা কৌশল হাতে নেওয়া হয়েছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আসছে কি না, মনিটরিং করা হচ্ছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, কিশোর অপরাধীদের জেরা করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এসব গ্রুপে অভিজাত পরিবারের সন্তানরাও আছে। তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, কিশোর অপরাধীদের প্রতিরোধ করতে থানা পুলিশকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও কাজ করছে। পাড়া-মহল্লার অপরাধীদের তালিকা হচ্ছে।  

পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘কিশোর অপরাধীদের রুখতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় পুলিশ ও র‌্যাবের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তালিকাভুক্ত অপরাধীদের ধরারও চেষ্টা চলছে। আশা করি, অল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। ’

কিশোর অপরাধ রুখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে  দায়িত্ব নিয়ে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক পথে ফেরাতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘আমাদের তরুণরা যত দ্রুত প্রযুক্তি গ্রহণ করছে, তত দ্রুত মূল্যবোধ গ্রহণ করছে না। স্কুলগুলো অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা পাচ্ছে না। কিশোরদের জন্য কাউন্সেলিং জরুরি। শুরুর দিকে যদি তাদের সংশোধন করা যায় তাহলে অনাহৃত অনেক ঘটনা এড়ানো সম্ভব। ’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক (প্রক্টর) ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, কিশোর-তরুণদের মধ্যে স্বাভাবিক নিয়মেই নিজের বীরত্ব দেখানোর একটা প্রবণতা থাকে। এর থেকে তারা অভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের খারাপ পথ থেকে ফেরাতে পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সিনেমায় দেখানো নৃশংসতা ও ভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাবে তারা অপরাধী হয়ে উঠছে। তারা ইচ্ছামতো সব কিছু করার চেষ্টা করছে, অপরাধে জড়াচ্ছে। তাদের সংশোধন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. মুনতাসির মারুফ বলেন, পরিবার থকে শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে সন্তানদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পরিবারকেই এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে হবে।

পশ্চিমা অ্যাকশন বা হরর মুভি, কম্পিউটার গেম থেকেও কিশোর-তরুণদের মনে অপরাধ প্রবণতা সঞ্চারিত হচ্ছে, তাই তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের কথাও বলেছেন কেউ কেউ।

মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, তথ্য-প্রযুক্তির কারণে শিশু-কিশোরদের নৈতিক স্খলন হচ্ছে। শহরের শিশু-কিশোররা পরিবার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। এর ফলে তারা মাদকাসক্ত  হয়ে যাচ্ছে, যা ইচ্ছা তাই করছে।

মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান (ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নূরজাহান খাতুন বলেন, শিশু-কিশোররা ঘরে বসেই ইন্টারনেটে বিশ্ব দেখছে। তারা অপরাধের কৌশল শিখছে, এর থেকে তাদের মধ্যে এক ধরনের হিরোইজম তৈরি হচ্ছে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কামাল উদ্দিন বলেন, এখন টেলিভিশন চ্যানেলগুলো শিক্ষামূলক কিছু প্রচার করে না। বরং যেগুলো প্রচার করে সেগুলো দেখে উঠতি বয়সীরা অপরাধে ঝুঁকে পড়ে। অসংখ্য এফএম রেডিও চলছে, কিন্তু সেখানে কী শেখানো হচ্ছে?

সংস্কৃতির এই সংকট উত্তরণে সমাজে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। সে জন্য অবাধ তথ্য-প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ এ মনোবিজ্ঞানীর।  

সংশোধনের সুযোগও থাকতে হবে

শিশুরা অপরাধের সংস্পর্শে আসার আগে ও পরে দুই রকম পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। শিশু বা কিশোর অপরাধীকে আইনের কাছে সোপর্দ করার পর তাকে অবশ্যই সংশোধন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি সংশোধন কেন্দ্রে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আইন অনুযায়ী একজন কিশোরকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আনা গেলে সে অবশ্যই সংশোধন হবে—এমনটাই মনে করেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও শিশু আইন বিশেষজ্ঞ ড. নাহিদ ফেরদৌসী।

১৯৭৪ সালে অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া কিশোরদের সংশোধনের জন্য টঙ্গীতে জাতীয় কিশোর সংশোধনী কেন্দ্র গড়ে ওঠে। দেশের তিনটি সংশোধন কেন্দ্রের মধ্যে বড় এই কেন্দ্রে বর্তমানে (গত বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত) ৩৫৬ জন কিশোর আছে। এরা বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। আদনান হত্যার ঘটনায় দুই কিশোরসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া আরো অনেক কিশোর অপরাধী এখানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশোধন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. শাহজাহান।

ঢাকায় কিশোরদের অপরাধ বিচারে গঠিত ‘কিশোর আদালত’ সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের বর্তমান সময় পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৫১৭টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ২০০টি, গত বছর ৩০৬টি ও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানির মামলাও রয়েছে।

কিশোর আদালতের সরকারি আইনজীবী শাহাবুদ্দিন মিয়া বলেন, এসব মামলার বাইরে গত পাঁচ বছরে শুধু ঢাকায় প্রায় ১৫টি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ নূর খান বলেন, প্রথমে কিশোর বা শিশু অপরাধের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। আর অপরাধের সংস্পর্শে কিশোররা যাতে না আসতে পারে সে জন্য সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সঠিকভাবে  প্রয়োগ করতে হবে।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, সারা দেশে কিশোর অপরাধের মামলার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে এ সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সাধারণ ও ধনী পরিবারের সন্তানরা নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। আবার কিশোর অপরাধীদের একটি বড় অংশই অভিভাবকহীন, পথশিশু ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। এদের আইনের আওতায় এনে সংশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়াটাও জরুরি।


মন্তব্য