kalerkantho


‘বন্দুকযুদ্ধে’ কয়েক ঘণ্টায় নিহত ৪

আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া; বাগেরহাট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি   

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘বন্দুকযুদ্ধে’ কয়েক ঘণ্টায় নিহত ৪

বগুড়া, বাগেরহাট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত বুধবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টায় পুলিশ ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে চার ব্যক্তি নিহত হয়েছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী এ দুই বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, বগুড়ার শেরপুরের জামনগর গ্রামে নিহত আজিমুল হক ওরফে আল-আমীন ওরফে রনি (২৩) নব্য জেএমবির সামরিক শাখার অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান।

আর সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জের সুখপাড়া চর এলাকায় নিহত হয়েছে বেল্লাল মীর ওরফে কানা বেল্লাল (৩০) নামের এক বনদস্যু। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে বুলবুল ইসলাম ওরফে বুইল্লা নামের এক ডাকাত এবং নুরুল ইসলাম ওরফে নুরু নামের এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে।

বগুড়া : শেরপুর থানার পুলিশের ভাষ্য, বিস্ফোরক মামলার আসামি রনিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে সে অস্ত্র ও অন্য জেএমবি কমান্ডারদের তথ্য দেয়। তথ্য অনুযায়ী তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারসহ অন্য জেএমবি জঙ্গিদের ধরতে গতকাল ভোররাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও শেরপুর থানার পুলিশ যৌথ অভিযান শুরু করে। দলটি শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের জামনগর গ্রামের একটি সেতুর কাছে পৌঁছলে রনিকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য পুলিশের ওপর তার সহযোগীরা অতর্কিতে গুলি চালায়। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। ওই সময় রনি গাড়ি থেকে পালাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়। পরে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে সে মারা যায়।

গোলাগুলির পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও তিন রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে।

বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি আমিরুল ইসলাম জানান, রনি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বুজরুক রাজারামপুর গ্রামের নুরুল হকের ছেলে। এ ব্যাপারে শেরপুর থানায় একটি মামলা হয়েছে।

গোদাগাড়ী উপজেলার বুজরুক রাজারামপুর গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই তার পরিবারের লোকজন গাঢাকা দেয়। জেএমবিতে যোগ দেওয়ার আগে রনি ছাত্রশিবির করত বলে জানায় এলাকাবাসী।

বগুড়া জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রনি বগুড়ার শেরপুর উপজেলার জুয়ানপুরে উদ্ধারকৃত বিস্ফোরক ও গ্রেনেড মামলার আসামি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য বগুড়ার গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বুজরুক রাজারামপুর গ্রামে অভিযান চালায়। সেখানে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করে সে। ধরতে গেলে সে গোয়েন্দা পুলিশের কনস্টেবল আব্দুস সালাম ও ইসমাইল হোসেনকে ছুরিকাঘাত করে। পরে পুলিশ রনিকে গ্রেপ্তার করে বগুড়ায় নিয়ে আসে। আর আহত দুই কনস্টেবল রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

বাগেরহাট : র‌্যাবের ভাষ্য, গতকাল সকালে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জের সুখপাড়া চর এলাকায় বনকেন্দ্রিক দস্যু ‘শামছু বাহিনী’র সদস্যদের সঙ্গে র‌্যাব সদস্যদের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। আধাঘণ্টা ধরে গোলাগুলির পর দস্যুরা পিছু হটলে বন তল্লাশি করে ওই বাহিনীর সক্রিয় সদস্য বেল্লাল মীর ওরফে কানা বেল্লালের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন র‌্যাব সদস্যরা। এ ছাড়া বন থেকে দস্যুদের ব্যবহৃত দেশি-বিদেশি পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র, ৭৭ রাউন্ড গুলি, বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহত বেল্লালের বাড়ি বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় বলে র‌্যাব জানিয়েছে। তবে তার বাবার ও গ্রামের নাম জানাতে পারেননি র‌্যাব সদস্যরা।

র‌্যাব বরিশাল-৮-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আনোয়ার-উজ-জামান জানান, তাঁর নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল গতকাল সকাল সোয়া ৮টার দিকে সুন্দরবনের সুখপাড়া চরের কাছ থেকে দুবলারচরের দিকে যাচ্ছিল। ওই সময় বনের ভেতর থেকে দস্যুরা গুলি ছুড়তে থাকে। র‌্যাব সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। পরে ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা ব্যক্তিকে স্থানীয় জেলেরা বনদস্যু শামছু বাহিনীর সদস্য বেল্লাল মীর ওরফে কানা বেল্লাল বলে শনাক্ত করে।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আনোয়ার-উজ-জামান আরো জানান, বনের মধ্যে পলিথিনের ছাউনি দেওয়া একটি আস্তানা পাওয়া গেছে। ওই আস্তানাটি ধ্বংস করা হয়েছে। আর উদ্ধার করা অস্ত্র ও গুলির মধ্যে রয়েছে বিদেশি একটি দোনলা বন্দুক, বিদেশি দুটি একনলা বন্দুক, একটি এলজি, বিদেশি একটি কাটা রাইফেল, ৭৭ রাউন্ড গুলি, দেশে তৈরি চারটি ধারালো অস্ত্র প্রভৃতি।

র‌্যাব বরিশাল-৮-এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবীর জানান, নিহত দস্যুর লাশ এবং অস্ত্র ও গুলি থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এর আগে গত ৭ ডিসেম্বর শামছু বাহিনীর সক্রিয় সদস্য মো. আল-আমীন ও মো. হুসাইন মোল্যা এবং গত ৬ ফেব্রুয়ারি শামছু বাহিনীর প্রধান শামছু ওরফে কুপা শামছু র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : বিজয়নগর থানার পুলিশ জানায়, গত বুধবার গভীর রাতে উপজেলার চান্দুরা ইউনিয়নের খেতাবাড়ী এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে ওই ইউনিয়নের কালিসীমা গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে বুলবুল ইসলাম ওরফে বুইল্লা ডাকাত নিহত হয়। আর গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের মিরসানি এলাকায় নিহত হয় মাদক ব্যবসায়ী নলগড়িয়া গ্রামের আলফাজ আলীর ছেলে নুরুল ইসলাম ওরফে নুরু। তাদের উভয়ের বিরুদ্ধে বিজয়নগর থানায় পাঁচটি করে মামলা রয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে পাইপগানসহ বিভিন্ন ধরনের দেশি অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত দুজনের লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

এ দুই ঘটনায় অন্তত ১০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে বলে দাবি পুলিশের। খেতাবাড়ীর ঘটনায় আহত হন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মো. ইউনুস, এএসআই আলী আহম্মদ, কনস্টেবল মোবারক, ওমর ফারুক ও মহসীন। মিরাসানির ঘটনায় আহত হন বিজয়নগর থানার এসআই মো. সালামত, মো. মহিউদ্দিন, মো. জালাল, কনস্টেবল মো. সাইফুল ও মো. নুরুজ্জামান। ইটপাটকেলের আঘাতে আহতরা প্রাথমিক চিকিৎসা নেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

বিজয়নগর থানার ওসি মো. আলী আরশাদ কালের কণ্ঠকে জানান, কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী নুরুকে বুধবার সন্ধ্যার পর গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচারের তথ্য দেয় সে। গতকাল ভোরে তাকে নিয়ে সীমান্ত এলাকার মাদক পাচারের জায়গায় যাওয়া হয়। এ সময় একদল চোরাকারবারি মাদক নিয়ে আসছে দেখে পুলিশ প্রতিরোধে এগিয়ে যায়। তখন পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও গুলি ছুড়ে। গোলাগুলির মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ নুরুল ইসলামকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ওসি আরো জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি পাইপগান, ২০ কেজি গাঁজা, চার রাউন্ড কার্তুজ, চারটি ছুরি ও তিনটি রামদা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বিজয়নগর থানায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে।

খেতাবাড়ী এলাকার ঘটনা সম্পর্কে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মো. মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, বুধবার রাত ১টার দিকে খবর পাওয়া যায়, খেতাবাড়ী এলাকায় একদল ডাকাত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ খবরে সেখানে গেলে ডাকাতদল পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। পরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকা ব্যক্তি নিজেকে বুলবুল বলে পরিচয় দেয়। জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি পাইপগান, কার্তুজ ও গুলির খোসা উদ্ধার করে। এ ঘটনায় এসআই ইউনুস বাদী হয়ে বিজয়নগর থানায় তিনটি মামলা দায়ের করেছেন।


মন্তব্য