kalerkantho


২১ ফেব্রুয়ারির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম

অধ্যাপক ফুলে হুসেন

শরীফুল আলম সুমন   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



২১ ফেব্রুয়ারির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম

‘১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আগেই কিশোরগঞ্জের আখড়াবাজারে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ মহকুমা অফিসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। গুরুদয়াল কলেজের ছাত্রসংসদের ভিপি হেদায়েত হোসেন পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন। ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, মাসুদুল আমিন খান, আবু তাহের খান পাঠান, নুরুল আমিন, শাহাদাত চৌধুরী, আমাকেসহ আরো কয়েকজনকে সংগ্রাম পরিষদের সদস্য করা হয়।   আমরা বিভিন্নভাবে ২১ ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ ধর্মঘটের প্রস্তুতি নিই। এ নিয়ে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি শহরবাসীর মধ্যেও ব্যাপক উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে। ’

কালের কণ্ঠকে কথাগুলো জানালেন ভাষাসৈনিক অধ্যাপক ফুলে হুসেন। জানা গেল, ১৯৪৮ সালে তিনি যখন নেত্রকোনা সদরের দত্ত হাই স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তখন থেকেই ভাষাসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে আইএসসি পড়তে কিশোরগঞ্জ সদরে চলে যান, তখন আন্দোলনের সঙ্গে আরো গভীরভাবে সম্পৃক্ত হন। গুরুদয়াল কলেজে আইএসসির প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালে তিনি কিশোরগঞ্জ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের মহকুমা শাখার দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। পরে মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় অংশ ছিল তাঁর। গত বুধবার রাজধানীর মগবাজারে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

ফুলে হুসেন বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশের মানুষ, যে দেশের মানুষের ভাষা বাংলা আর দেশের নাম বাংলাদেশ। ভাষার নামের সঙ্গে মিলিয়ে দেশের নাম বিশ্বে বিরল। আসলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই স্বদেশপ্রেমের জন্ম হয়েছে। এই ভাষা আন্দোলনের অনুপ্রেরণায়ই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বাঙালি। ’ 

আন্দোলনের সেই দিনগুলোর কথা মনে করে এই ভাষাসংগ্রামী বললেন, “কিশোরগঞ্জ শহরের বাইরেও ২১ ফেব্রুয়ারির সাধারণ ধর্মঘটের ডাক পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম আমরা। বিশেষ করে বিভিন্ন থানা সদরের স্কুলগুলোতে খবর পাঠানো হয়। ২১ ফেব্রুয়ারির জন্য আমরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম। সেদিন শহরের গুরুদয়াল কলেজ, রামানন্দ হাই স্কুল, আজিমুদ্দিন হাই স্কুল, সরযুবালা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস থেকে বেরিয়ে মিছিল করে। শহরে দোকানপাট বন্ধ থাকে, কোনো বাজার বসেনি। আমরা যখন মিছিল নিয়ে শহর প্রদিক্ষণ করছিলাম তখন দু-এক জায়গায় ধর্মঘটবিরোধী মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের অনুসারীদের তত্পরতা দেখা যায়। কিন্তু আমাদের সবাই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে এতটাই অনুপ্রাণিত ছিল যে মুসলিম লীগ বা নেজামে ইসলামের অনুসারীরা আমাদের কোনো ধরনের বাধা বা আক্রমণের সাহস পায়নি। ২১ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘট কিশোরগঞ্জে সফল হয়। এতে নেতৃত্ব দেয় কিশোরগঞ্জ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সেদিন ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে গুলির কথা আমরা কিশোরগঞ্জবাসী জানতে পারি পরের দিন ভোরে। খবর জানার সঙ্গে সঙ্গে আমরা শহরের শহীদি মসজিদের পাশে ইসলামিয়া বোর্ডিংয়ের সামনে জড়ো হই। সাধারণ মানুষও আসতে থাকে। জমায়েত হয়ে ওঠে প্রতিবাদী স্লোগানে মুখরিত। স্বতঃস্ফূর্ত ও তাত্ক্ষণিক সেই সমাবেশে আমি ছাড়াও হেদায়েত হোসেন, আবু তাহের খান পাঠান ও আরো দু-একজন বক্তৃতা করে। তখন ২৩ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জে স্কুল-কলেজে ধর্মঘট, হরতাল, প্রতিবাদ ও শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য মাইকের ব্যবস্থা করতে আমার ও আরো দুই সহকর্মীর ওপর দায়িত্ব পড়ে। কিন্তু এসডিও সাহেব ছাত্রদের মাইক ভাড়া দিতে নিষেধ করেন এবং মাইকের দোকানে পুলিশ মোতায়েন করেন। এতে দোকানিরা মাইকের দোকান বন্ধ করে পালিয়ে যায়। পরে কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মাসুদুল আমিন খান মাখন ভাইয়ের শরণাপন্ন হলাম। তাঁর বাবা ছিলেন কিশোরগঞ্জের তখনকার সরকারি পিপি। মাখন ভাই সব শুনে বললেন, ‘হয়ে যাবে, তোরা সকাল সকাল চলে আসিস। ’”

ফুলে হুসেন বলেন, ‘২৩ ফেব্রুয়ারি সকালে পাঁচজন মাখন ভাইয়ের বাসায় গেলে তিনি আমাদের শহীদি মসজিদে নিয়ে গেলেন। মসজিদের ইমাম মাওলানা আতাহার আলীর কাছে জনসভার জন্য মাইক চাইলেন। কিন্তু হুজুর কোনোভাবেই মাইক দেবেন না। পরে মাখন ভাইয়ের নির্দেশে আমরা জোর করেই মাইকসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে এলাম। সকাল ১১টার সময় শহরের জেলখানার সামনে খেলার মাঠে গিয়ে দেখি মাঠ লোকে প্রায় ভরপুর। অনেকের সঙ্গে আমিও সেই জনসভায় বক্তৃতা দিই। বক্তৃতা চলাকালেই মসজিদের ইমাম সাহেবও আমাদের কাছাকাছি ঘাসের ওপর এসে বসেন। সভায় সরকারের নির্মমতার নিন্দা জানিয়ে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারির সভা করেই আমরা থেমে থাকিনি। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় কিশোরগঞ্জ মহকুমা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা প্রতিটি থানা সদরে সভা-সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন। আমার ওপর ভার পড়ল হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, নিকলি ও করিমগঞ্জে আন্দোলন সংগঠনের। দুজন সহকর্মী নিয়ে প্রতিটি থানায় সমাবেশ করেছি। ’

ফুলে হুসেনের জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনা জেলায়। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেন। ওই বছরই নীলফামারী কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব শেষে ১৯৮২ সালে স্বেচ্ছায় অবসরে যান তিনি। বর্তমানে রাজধানীর মগবাজারে বসবাস করেন।


মন্তব্য