kalerkantho


চোখ বুজলে ভেসে ওঠে মর্মান্তিক সব দৃশ্য

লোকমান আহমদ আমীমী

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



চোখ বুজলে ভেসে ওঠে মর্মান্তিক সব দৃশ্য

লোকমান আহমদ আমীমীর জন্ম ১৯২৮ সালে, কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামে। লেখাপড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ঢাকায় আসেন ১৯৪৯ সালে।

ভর্তি হন ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায়। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় ১৯৫২ সালে অংশ নেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বের হওয়া মিছিলে। এই ভাষাসৈনিক বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মদপুর জামে মসজিদের খতিব ও ইমামের দায়িত্ব পালন করছেন। ওই মসজিদের ইমাম কোয়ার্টারে গত বুধবার আলাপচারিতায় তিনি তুলে ধরেন ভাষা আন্দোলনের নানা দিক।

আমীমী বলেন, ‘১৯৫২ সালে আমি আলিম ক্লাসের ছাত্র। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও সংশ্লিষ্ট এলাকা তখন আন্দোলনমুখর। তো মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষার দাবিতে বের হওয়া মিছিলে আমিও অংশগ্রহণ করেছিলাম। ’ তিনি বলেন, ‘অস্বীকার করার উপায় নেই যে ভাষা আন্দোলনের সময় মাদ্রাসায় শিক্ষিতরা উর্দুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। ব্যতিক্রমও ছিল।

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও মওলানা আকরম খাঁ বাংলার পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। তত্কালীন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমানের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাঁর উৎসাহ-উদ্দীপনায় সে সময় ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্র ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। এসব ছাত্রের নেতৃত্বে ছিলেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ জিয়াউল হক সাহেবের ছেলে এবং পরবর্তীকালে মওলা ব্রাদার্সের মালিক আতিকুল মওলা। আমিও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের একজন ছিলাম। ’

‘উর্দু অ্যান্ড উর্দু শ্যাল বি দ্য স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান—১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এই ঘোষণার পর উপস্থিত জনতার একজন হয়ে আমিও সমস্বরে উচ্চারণ করেছিলাম—নো...নো। ’

মাওলানা আমীমী বলেন, ‘বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারির আন্দোলন ছিল ১৯৪৮ সালের প্রতিবাদধ্বনির চরম প্রকাশ। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে ২১ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ মিছিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেদিন আমাদের মাদ্রাসা খোলা ছিল। ১৪৪ ধারা জারির কারণে মিছিলে অংশগ্রহণ করা না-করা নিয়ে শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দেয়। আমরা বেশির ভাগ ছাত্র ক্লাস বর্জন করি। মাদ্রাসার অধ্যাপক মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান মিছিলের পক্ষে আমাদের উৎসাহিত করেন। অধ্যক্ষের কনিষ্ঠ পুত্র মরহুম আতিকুল মওলার নেতৃত্বে আমরা মাদ্রাসা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো কলাভবন গেটে এসে উপস্থিত হই। কলাভবনের সামনে দুপুর ১২টার দিকে ছাত্রনেতা গাজীউল হকের সভাপতিত্বে সভার কাজ আরম্ভ হয়। আমার মনে আছে, গাজীউল হক খদ্দরের পাঞ্জাবি ও পাজামা পরিহিত ছিলেন। মরহুম শামসুল হক বক্তব্য দিলেন। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শোভাযাত্রা বের করা সম্পর্কে মতবিরোধ দেখা দিল। শেষ পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা দশজন করে বের হয়ে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। মিছিল নিয়ে বের হওয়ার পর পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তিনকোণ পুকুরের পাড়ে গ্যাস ছোড়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে নিরস্ত্র ছাত্র আর সশস্ত্র পুলিশের মধ্যে শুরু হয় খণ্ডযুদ্ধ। সংঘর্ষ শুরু হয় মেডিক্যাল কলেজ গেট, মেডিক্যাল হোস্টেল ও এর চারদিকে। পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জে আহত হয় বহু ছাত্র। ’

ভাষাসৈনিক আমীমী বলেন, ‘তখন বেলা সাড়ে ৩টা থেকে ৪টা। তত্কালীন ঢাকার অবাঙালি ম্যাজিস্ট্রেট কোরাইশী মোটরসাইকেলযোগে মেডিক্যাল কলেজের সামনে উপস্থিত হন। মোটরসাইকেল মাঝরাস্তায় থামিয়ে সিটে বসা অবস্থায়ই তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি করার নির্দেশ দেন। নির্দেশে পেয়ে পুলিশ পর পর তিনবার গুলি ছোড়ে। আমার বাম পাশে দাঁড়ানো এক যুবকের পেটে গুলি লাগে। তিনি পেট চেপে ধরেন। কিন্তু ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। কয়েকজন মিলে তাঁকে নিয়ে যায় হাসপাতালে। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালেই ওই যুবক প্রাণ হারান। তাঁর নাম ছিল আবদুস সালাম। ’

লোকমান আহমদ আমীমী বলতে থাকেন, ‘নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে শহীদদের রক্তাক্ত জামাকাপড়ের পতাকাবাহী বিরাট মিছিল বের হয়। ছাত্র-জনতার সঙ্গে সচিবালয়ের ১০ হাজার কর্মচারীও ওই মিছিলে যোগ দেন। সে সময় এটাই ছিল সবচেয়ে বড় মিছিল। সেখানে পুলিশ নিরাপত্তা আইনে আবুল হাশেম, খয়রাত হোসেন, মাওলানা তর্কবাগীশ, মওলানা ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, মুনীর চৌধুরী, অজিত গুহ, অলী আহাদসহ অনেককে গ্রেপ্তার করে। ’

স্মৃতিকাতর এই ভাষাসৈনিক সব শেষে বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের রক্তঝরা দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও আমার দেহ-মন শিউরে ওঠে। ঐতিহাসিক ওই ঘটনা আজ থেকে ৬৪ বছর আগে হলেও মনে হয় যেন এই সেদিন ঘটেছে। চোখ বুজলে পরিষ্কার ভেসে ওঠে মর্মান্তিক সব দৃশ্য। ’


মন্তব্য