kalerkantho


মিছিল করতেই যেন স্কুলে যেতাম

অধ্যাপক ইয়াকুব মিয়া

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মিছিল করতেই যেন স্কুলে যেতাম

“বায়ান্নর ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী খান আবদুল কাইয়ুম খান বাজিতপুর ডাকবাংলার মাঠে মিটিং করতে আসেন। তাঁকে বরণ করতে স্যাররা মাঠের রাস্তায় আমাদের দাঁড় করানোর প্রস্তুতি নেন।

কিন্তু কুলিয়ারচরের ক্লাস নাইনের ছাত্র শচীন্দ্র চন্দ্র দাস ও ক্লাস ক্যাপ্টেন আমাদের বলল, আমরা মন্ত্রীকে কালো পতাকা দেখাতে যাব। পরে স্যারদের নেতৃত্বে আমরা সারিবদ্ধভাবে ডাকবাংলার দিকে যাচ্ছিলাম। ছোট বলে আমাকে মিছিলের সামনেই রাখা হয়েছিল। মাঠের দিকে যেতে যেতে আমরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান শুরু করে দিই। টাউন হাই স্কুল পর্যন্ত যেতেই পুলিশ শুরু করে লাঠিচার্জ। আমি সামনে থাকায় আমার গায়ে মার লাগে বেশি। মার খেয়ে সে কী কান্না আমার! ওই অবস্থায় দৌড়ে স্কুলে ফিরে যাই। কয়েকজন স্যার এসে গায়ে হাত বুলিয়ে দেন। কিন্তু মুসলিম লীগপন্থী স্যাররা আমাদের গালাগাল করেন।

কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপচারিতায় এ বর্ণনা দিলেন ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া বাজিতপুর কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ইয়াকুব মিয়া। এই অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।   অধ্যাপক ইয়াকুব মিয়া বলেন, ‘মাতৃভাষার দাবিতে ১৯৫২ সালে আমরা মিছিল নিয়ে বের হলে সাধারণ মানুষ হাত উঁচিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে যেত। এমনকি দোকানপাট থেকে রাস্তায় বেরিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মিছিলে অংশ নিত। তখন মিছিল করার জন্যই যেন স্কুলে যেতাম। মিছিল করাটা নেশা হয়ে গিয়েছিল। আমিসহ অনেক ছাত্রের হাতে থাকত টিনের তৈরি হর্ন (বুমা)। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন পর্যন্ত মিটিং-মিছিলে গেছি। ভাষা আন্দোলনই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ করার প্রেরণা জুগিয়েছে। ’ 

জানা গেল, ভাষা আন্দোলনের সময় বাজিতপুর থানা ছিল কিশোরগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত। এখানে স্কুল ছাত্ররাই মূলত ভাষা আন্দোলন জোরদার করে। ঢাকায় ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে ছাত্র-জনতা হত্যার খবর পৌঁছে যায় বাজিতপুরে। ওই ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিসচেতন মানুষ ও ছাত্র-জনতাকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায়ই সিদ্ধান্ত হয় প্রতিবাদ করার। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল-সন্ধ্যা হরতালের কর্মসূচি দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে মাল্টিলেটার হাই স্কুলের (বর্তমানে হাফেজ আব্দুর রাজ্জাক পাইলট হাই স্কুল) ছাত্ররা। ইয়াকুব মিয়া সে সময় ওই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন।

অধ্যাপক ইয়াকুব মিয়া জানান, ২২ ফেব্রুয়ারি সকালেই ওই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র আনিসুর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন সৈয়দ সিরাজুল হুদা তৌফিক, প্রাণেশ কুমার সাহা, আবদুল কাইউম, আবদুস সালাম, শামসুল হক, মোহাম্মদ আলী, বেলায়েত হোসেনসহ আরো অনেকেই। তাঁরা তখন স্কুলের ছাত্র। প্রবীণ ব্যক্তিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বাজিতপুরের অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান। ছাত্রদের মধ্যে পরে সাংবাদিকতায় আসা ইনছাফউদ্দিন আহমদও ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখেন। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আশরাফ উদ্দিন, ছাত্রনেতা আবু তাহের খান পাঠান, কলেজ ছাত্র হেদায়েতুল ইসলাম, ফুলে হোসেন, তরুণ লাইব্রেরির মালিক আমিনুল হক প্রমুখ ভাষা আন্দোলনকারীদের সংগঠিত করেছিলেন।      

ইয়াকুব মিয়া জানান, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঢাকায় এসে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা দিলেন তখন তার প্রতিবাদে বাজিতপুরেও মিছিল হয়।

প্রবীণ এ ভাষা সংগ্রামী জানালেন, বায়ান্নর ২২ ফেব্রুয়ারি হরতাল চলাকালে ছাত্রদের সঙ্গে তিনিও মিছিলে অংশ নেন। ছাত্ররা ওই দিন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘আমাদের সংগ্রাম চলছে, চলবে’, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘খুনি নুরুল আমিনের বিচার চাই’ ইত্যাদি স্লোগান ধরে। সেদিন কার্যত ছাত্ররাই অচল করে দেয় বাজিতপুর। ২৩ ফেব্রুয়ারি হয় শোকসভা। ছাত্রদের কর্মকাণ্ডে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে তত্পর হয়ে ওঠে।  

মওলানা ভাসানীর প্রতি ইয়াকুব মিয়ার অনুরাগ জন্মে ছোটবেলাতেই। মোহাম্মদ তোয়াহা, শান্তি সেন, আব্দুল মতিন, নগেন সরকারদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। কিশোরগঞ্জ জেলা ভাসানী ন্যাপের সভাপতি নগেন সরকারের সঙ্গে নিবিড় সখ্য ছিল তাঁর। পরে অধ্যাপক ইয়াকুব কেন্দ্রীয় সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি বাজিতপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

প্রবীণ এই নেতা আক্ষেপ করে বলেন, ‘এখনকার ছাত্রদের অবস্থা খোলা বইয়ের মতো। তারা বিপথগামী ও আদর্শহীন। ঐক্যবদ্ধ নয়, সমাজ-রাজনীতি থেকেও বিচ্ছিন্ন। পরিবর্তনের স্বপ্ন নেই ওদের চোখে। রাজনীতি দূষিত হয়ে যাওয়ায় সব কিছুই দূষিত হয়ে গেছে। তবে এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আমার ধারণা, দেশ গঠনে, নতুন প্রজন্ম রক্ষায় একসময় সবাই এক কাতারে দাঁড়াব। ’


মন্তব্য