kalerkantho


জাতীয় অধ্যাপক ড. সুফিয়া আহমদ

ভাষা আন্দোলন থেকে প্রকৃত নারী জাগরণ শুরু হয়েছে

আপেল মাহমুদ   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ভাষা আন্দোলন থেকে প্রকৃত নারী জাগরণ শুরু হয়েছে

‘আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন ঢাকার রাস্তায় মেয়েদের খুব একটা দেখা যেত না। রিকশায় চলাফেরা করার সময় হুড কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে দেওয়া হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্রীর সঙ্গে একজন ছাত্রের কথা বলতে হলে প্রক্টরের অনুমতি নিতে হতো। এমন রক্ষণশীল পরিবেশে শুরু হয় ভাষাসংগ্রাম। তবে তখন আর ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিভেদ থাকেনি। ছাত্রছাত্রী সবাই একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভাষা রক্ষার আন্দোলনে। সে-ই মেয়েদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাইরে বেরিয়ে আসা। তারাও ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের কাজ করতে থাকে। মূলত প্রকৃত নারী জাগরণ শুরু হয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে। ’ এ অভিমত দেশের প্রথম নারী জাতীয় অধ্যাপক ও ভাষাসংগ্রামী ড. সুফিয়া আহমদের।

সম্প্রতি ড. সুফিয়া আহমদের সঙ্গে কথা হয় তাঁর গুলশানের বাসভবনে।

তিনি বলেন, ‘সেই নারী জাগরণের সুফল বর্তমানে দেশের প্রত্যেক মানুষ ভোগ করছে। আজ দেশের যে শিল্প উন্নয়ন, এর পেছনে লাখ লাখ নারীর অবদান রয়েছে। সকালে রাস্তায় দাঁড়ালে দেখা যায় অসংখ্য কর্মজীবী নারী কল-কারখানায় যাচ্ছে। বিশেষ করে গার্মেন্টশিল্পে ওদের অবদান সবচেয়ে বেশি। ওদের হাতে সেলাই করা কাপড় বিশ্বের বাজার মাত করছে। আমরা যখন বিদেশ থেকে বিখ্যাত ব্র্যান্ডের কাপড়-চোপড় কিনে আনি, তখন কাপড়ের ট্যাগে লেখা থাকে মেড ইন বাংলাদেশ। এটা সত্যি অবিশ্বাস্য সাফল্য। আমি মনে করি এদের এ সাফল্যগাথার মূলে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের সময় রাজপথে নারীদের আন্দোলন। ’

১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন ড. সুফিয়া আহমদ। সেসব দিনের কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য আলাদা কোনো আবাসিক হল ছিল না। যারা ঢাকার বাইরে থেকে পড়তে আসত তাদের থাকার জন্য একটি পুরনো ভবন দেওয়া হয়েছিল, যা মহিলা হোস্টেল নামে পরিচিত ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমাদের খাতাপত্রে বিভিন্ন আবাসিক হলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হতো। আমি সংযুক্ত ছিলাম সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সঙ্গে। তবে আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম তারা যে যেখানেই থাকি সবাই এসে মহিলা হোস্টেলে আড্ডা দিতাম। সেখান থেকে সংগঠিত হয়ে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতাম। আমাদের নেতৃত্ব দিতেন ড. শাফিয়া খাতুন। ’

এই ভাষাসংগ্রামী জানান, ভাষা আন্দোলনের কৃতিত্ব শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কিংবা ইডেন কলেজেরই নয়। আমরা সে সময় দেখেছি ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-কর্মচারীদের পাশাপাশি ঢাকার, বিশেষ করে পুরান ঢাকার অনেক সাধারণ মানুষ এগিয়ে এসেছে। তারা এক সঙ্গে মিছিল করেছে বাংলা ভাষার পক্ষে। এমনকি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে পর্যন্ত জড়িয়েছে। সে সময় শামসুন নাহার নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী বোরকা পরতেন। একুশে ফেব্রুয়ারি আমরা তাঁর নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করি। ছাত্ররা মিছিল নিয়ে এলে পুলিশ ওদের ধরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে ছেড়ে দিত। এভাবে তিনটি দলকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। পরে সিদ্ধান্ত হয়, ছাত্রদের পরিবর্তে ছাত্রীদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মিছিল করতে হবে। এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে আমি, ড. শাফিয়া খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, লায়লা সামাদ, শামসুন নাহার, সারা তৈফুরসহ আরো কয়েকজন ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করতে করতে এগিয়ে যাই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল অ্যাসেম্বলির দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু সামনে পুলিশ লাঠি দিয়ে প্রতিবন্ধতা দেওয়ায় আমরা নিচু হয়ে সে প্রতিবন্ধতা পেরিয়ে যেতে থাকলে হঠাৎ করে আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়। টিয়ার গ্যাস দিয়ে পুরো এলাকা অন্ধকার করে দেওয়া হয়। আহত হয়ে আমরা সেখানে অবস্থান করতে থাকলে একজন বয়স্ক মানুষ আমাদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা এখান থেকে কোথাও যাবে না। মিছিলের ওপর গুলি হয়েছে। কয়েকজন সে গুলিতে মারা গেছে। তোমরা বের হলে তোমাদেরও ওরা মেরে ফেলবে। ’

ড. সুফিয়া আহমদ বলেন, ‘লঠিচার্জে সেখানে থাকা সবাই কমবেশি আহত হয়। সবচেয়ে বেশি আহত হই আমি ও রওশন আরা বাচ্চু। টিয়ার গ্যাসের শেলে চোখে অসহ্য যন্ত্রণা করছে, তখন আমরা একটি আশ্রয়ের খোঁজ করতে থাকি। কাছেই ছিল সলিমুল্লাহ হলের প্রভোস্ট ড. ওসমান গনির বাংলো। সেখানে গিয়ে আমরা চোখ-মুখে পানি দিয়ে গ্যাসের ঝাঁজ কমাতে চেষ্টা করি। এরপর প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে মেডিক্যাল কলেজের দিকে হাঁটতে থাকি। কিন্তু এর মধ্যে প্রচণ্ড গুলি শুরু হয়ে যায়। তখন পুলিশের গুলিতে বরকতের মৃত্যুসংবাদ পাই। বিকেলে অ্যাসেম্বলিতে আইন পরিষদের অধিবেশনে আনোয়ারা খাতুন নারীদের ওপর পুলিশি নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরে এর বিচার দাবি করেন। ’

প্রতিকূল সামাজিক অবস্থার মধ্যে কিভাবে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছিলেন—এ প্রশ্নের জবাবে সুফিয়া আহমদ বলেন, ‘আমার বাবা বিচারপতি হিসেবে সরকারি চাকরি করলেও তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী মানসিকতার মানুষ। ১৯৪৮ সালের দিকে বরিশালে জজিয়তি করার সময় তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে বন্ধু-বান্ধবকে চিঠি লিখতেন। নানা ব্যস্ততার জন্য তিনি সেসব চিঠি আমাকে খসড়া করতে দিতেন। এ কাজ করতে গিয়েই আমি বাবার আদর্শ সম্পর্কে জানতে পারি। মূলত তখন থেকেই দেশে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে অনেকের মনে নানা জিজ্ঞাস্য শুরু হয়। এসব প্রশ্ন আমার মনেও উঠত। যার কারণে ভাষা আন্দোলনে সহজেই যোগদান করতে পেরেছি। বাবা বরিশাল থেকে ঢাকায় বদলি হয়ে এলে আমিও তাঁর সঙ্গে চলে আসি। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ’ ভাষা আন্দোলনকারীদের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মূল্যায়ন তো হয়েছেই। তবে এখনো তাদের বিষয়ে সরকার অনেক কিছু করতে পারে। আমার ও ড. শাফিয়ার নামে রাস্তার নামকরণ হয়েছে। আমি মনে করি, রওশন আরা বাচ্চুর নামেও একটি রাস্তার নামকরণ হওয়া উচিত। তা ছাড়া আমরা তো আর টাকা-পয়সা কিংবা পদকের জন্য ভাষা আন্দোলন করিনি। তবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যদি আমাদের খোঁজখবর নেওয়া হতো তাহলে শেষ বয়সে একটু ভালো লাগত। ’

১৯৩২ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন সুফিয়া আহমদ। পড়াশোনা করেছেন সেন্ট ফ্রান্সিস জ্যাভিয়ার্স, ডাইহিল স্কুল, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর বাড়ির সাজানো-গোছানো ড্রয়িংরুমের দেয়ালে বাবা বিচারপতি ইব্রাহিম, স্বামী ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমদ এবং বিচারপতি ছেলে ও চিকিৎসক মেয়ের বিভিন্ন ছবি টাঙানো দেখা গেল। জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নানা গবেষণাকর্মের পাশাপাশি তিনি বাবা বিচারপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিমের ডায়েরির বঙ্গানুবাদ ও টিকা-টিপ্পনী তৈরি করছেন, যা অচিরেই বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হবে। নিজের আত্মজীবনী লেখার কাজও শুরু করেছেন তিনি।


মন্তব্য