kalerkantho

তাঁর যত বাক্যবাণ

নিখিল ভদ্র   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



তাঁর যত বাক্যবাণ

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নানা রস মিশিয়ে বক্তব্য দিতেন। সংসদের ভেতরে ও বাইরে তাঁর বক্তব্যের সময় সবাই হয়ে যেতেন নির্বাক শ্রোতা। ২০০১ সালের শেষ দিকে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পড়ে তাঁর ওপর। ৫৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হয়ে তিনি কৌতুক করেই বলেছিলেন—‘আমি শেষ ট্রেনের যাত্রী। ’ সংবিধান নিয়ে অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রশ্নহীন দক্ষতার জন্য সুরঞ্জিত প্রায় সময়ই এ রকম অনেক সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। তাঁর শতাধিক উক্তি এখন স্মৃতিচারণার পাতায়।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের তিন বছর পর মন্ত্রিসভায় স্থান পান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। চুল পাকছে, বয়স পঁয়ষট্টির ঘর পার হয়েছে। এরপর মন্ত্রিত্ব পাওয়ায় বলেছিলেন—‘আমি শেষ ট্রেনের যাত্রী। ’ প্রথম রেলমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর। সে সময় রেলওয়েকে দুর্নীতিমুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, রেলের ‘কালো বিড়ালটি’ খুঁজে বের করতে চাই।

২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে রেল ভবনে উপস্থিত কয়েকজন সাংবাদিককে বলেছিলেন—‘আমারে দিছে রেল। মিটারগেজও বুঝি না, ব্রডগেজও বুঝি না। ’ পরে রেলওয়ের মহাপরিচালককে তিনি ডেকে এনে বিভিন্ন পরিভাষা সম্পর্কে জানেন।

চারদলীয় জোট সরকারের সময় সিলেট শহরের কোর্ট পয়েন্টে বক্তব্য দিতে গিয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে লক্ষ্য করে তির্যক সুরে বলেন—‘খালেদা বেগম, ঘসেটি বেগম। ’

১৯৭০ সালের নির্বাচনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) মনোনয়ন নিয়ে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভাটি অঞ্চল থেকে উঠে আসা মাটি ও মানুষের প্রতিনিধি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। এরপর আর তাঁকে থেমে থাকতে হয়নি। ন্যাপের পর একতা পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি ও আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে শুধু দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। তাই তাঁকে নিয়ে সব সময় সতর্ক থাকত প্রতিপক্ষ, এমনকি স্বপক্ষের নেতাকর্মীরাও। আর তাঁর উত্থাপিত অনেক বিষয়ের ওপর স্পিকারকে রুলিং দিতে দেখা গেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে শেষ পর্যন্ত কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেননি। যে কারণে তিনি সেদিন ওই সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি। নবম সংসদে আদালতের আদেশ অনুযায়ী বাহাত্তরের সংবিধান  পুনঃপ্রবর্তনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১১ সালের ২৯ জুন বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনের পর সেদিন স্বাক্ষর না করার ব্যাখ্যা দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘১৯৭২ সালে সংবিধান পাসের পর সবাই মূল সংবিধানে স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু আমি তখন সংবিধান প্রণয়নে সক্রিয় অংশগ্রহণ করলেও স্বাক্ষর করিনি। বাহাত্তর সালে আমি ছিলাম একজন তরুণ যুবক। সদ্য যুদ্ধের ময়দান থেকে উঠে এসেছি মাত্র। উদ্যমে, সাহসে ও শক্তিতে টগবগে ছিলাম। তপ্ত যৌবন নিয়ে সংসদে এসেছিলাম। ’

সংবিধান ও আইন নিয়ে যখন বিতর্ক দেখা দিয়েছে তখনই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দ্বারস্থ হয়েছেন শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে সংসদ সদস্যরাও। এমনকি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্বে থাকা রাজনীতিকরাও তাঁর পরামর্শ নিয়েছেন। বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, ‘১৯৮৬ সালে আমি যখন প্রথম সংসদ সদস্য হই, তখন সংসদে তাঁর বক্তব্য শুনেই শিষ্যত্ব গ্রহণ করি। তিনি আমাদের শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখেছি। অনেক জটিল বিষয়ের সহজ সমাধান নিয়েছি। ’

বিগত মহাজোট সরকারের মন্ত্রীর পাশাপাশি ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর সংসদবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। তার পরও তাঁকে সংসদে দাঁড়িয়েই নিজের দল ও সরকারের কঠোর সমালোচনা করতে দেখা গেছে। ২০১০ সালের ১৩ জুলাই সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, দেশের সবচেয়ে গোপনীয় বিজি প্রেসটি আর গোপনীয় থাকল না। ২০০৩ সাল থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই কাজগুলো এখান থেকে হয়ে আসছে। এ বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা দাবি করেন তিনি। এ সময় স্পিকারের আসনে থাকা বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি তো কিছু বলতে পারি না। তবে আমিও তাই মনে করি। ’

বর্তমান সরকারের পাস করা তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় সমালোচনা করেন সরকারি দলের এই সংসদ সদস্য। সাংবাদিক প্রবীর সিকদারের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা গ্রহণ ও তাঁকে প্রথম দফায় জামিন না দেওয়ার সমালোচনা করে ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট তিনি বলেন, এই মামলার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। আর মামলা নিলেও জামিন দিলেন না কেন? তিনি বলেন, বিচার বিভাগ এখন নির্বাহী থেকে পৃথক ও স্বাধীন। সেখানে নির্বাহী বিভাগের কোনো কন্ট্রোল নেই। তাহলে এটা কিভাবে হলো? ক্রসফায়ার নিয়েও সংসদে সমালোচনা করতে দেখা গেছে।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে দেখা গেছে। ২০১১ সালের ২৭ অক্টোবর স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বক্তৃতা করে মন্ত্রীদের সংসদে আনা যাবে না। কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল তত্ত্ব থেকে আমরা সরে এসেছি। তাই সংসদে না এসে অন্য কোনো স্থানে হাজিরা দিয়ে মন্ত্রীরা চাকরি পাকাপোক্ত করেন। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার। ’

এর আগে ২০১০ সালের ২৪ জুন সংসদ অধিবেশনে ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনার আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে আলোচনার সুযোগ নিয়ে তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল না থাকলেও সংসদ সদস্যদের সাধারণ বাজেট আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী উপস্থিত না থাকলে প্রতিমন্ত্রী বা পরিকল্পনামন্ত্রী উপস্থিত থাকেন। তাঁরাও যদি না থাকেন তবে অর্থসচিব বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সংসদের গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে বাজেট আলোচনার নোট নেন এবং পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে অবহিত করেন। কিন্তু আমি বেশ কয়েক দিন ধরে লক্ষ করছি তেমনটি হচ্ছে না। অর্থমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে কেউ এই কাজটি করছেন না। ’

২০১৫ সালের ৯ জুন সম্পূরক বাজেট উত্থাপনের প্রচলিত বিধি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘সংসদে পাস না হওয়া পর্যন্ত সম্পূরক বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করা যায় না।   কিন্তু সম্পূরক অর্থ খরচ করার পরই সংসদে বিলটি আনা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বরাদ্দ খরচ করার পর বিলটি এনেছেন, তবে আমরা ভোট দেব কিসে? অর্থমন্ত্রী ইচ্ছা করলে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করার আগে অর্থ, অনুমিত কিংবা সরকারি সংসদীয় হিসাব কমিটিতে এসে বলতে পারতেন, অতিরিক্ত এই টাকাটি দরকার। সেখানে আলোচনার পর সংসদে বিলটি আনলে ভালো হতো। ’

সংসদে জীবনের শেষ বক্তব্য : জাতীয় সংসদ অধিবেশনে গত ২৯ জানুয়ারি জীবনের শেষ বক্তব্য দিয়েছিলেন প্রয়াত বর্ষীয়ান রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ওই দিন পয়েন্ট অব অর্ডারে সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, কর্তব্য ও দায়িত্বের ওপর ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জাতিসংঘ বিশ্বের কোনো দেশে হস্তক্ষেপ করতে পারে না, সেটিই তিনি তুলে ধরেছিলেন তাঁর সাবলীল তেজোদীপ্ত বক্তব্যে।

পয়েন্ট অব অর্ডারে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি যে সার্চ কমিটি গঠন করেছেন তা গোটা জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘসহ পৃথিবীর কোনো দেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে পারে না। জাতিসংঘ যদি আমাদের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে চায় তাহলে জাতি হিসেবে আমরা খুব বিব্রত হব। ’ আর বিএনপির এ নিয়ে আর কোনো কথা থাকলে সার্চ কমিটির কাছে তা তুলে ধরার পরামর্শ দেন তিনি।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আরো বলেন, ‘নতুন ইসি গঠন ও সার্চ কমিটি নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা কথা চলছে। এ ব্যাপারে আমাদের আরো সজাগ থাকতে হবে। আমরা যে যত বড় নেতাই হই না কেন, আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির অবস্থান নিয়ে কোনো কথা বলতে পারব না। একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য ইসি গঠনে বিএনপির যদি ভালো কোনো প্রস্তাব থাকে, তাহলে আমরাও সেটিতে শতভাগ একমত। বরং আমরা এখন যে চর্চা করছি সেটি আমাদের সাংবিধানিক  অজ্ঞতা ও সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী। কারণ সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের ঊর্ধ্বে, তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার আমাদের  কারো নেই। সুতরাং আমি মনে করি ইসি গঠন নিয়ে যে সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে সেখানে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেই আমাদের সামনে এগোতে হবে। ’

বিএনপিকে উদ্দেশ করে সুরঞ্জিত বলেন, সুযোগ এখনো চলে যায়নি। ঘোলা পানিতে মাছ শিকার না করে সাংবিধানিক উপায়ে বিএনপিকে কথা বলতে হবে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করেই বলেছেন, সংবিধানের মধ্যে থেকেই ক্ষমতার প্রয়োগ করতে হবে। এর বাইরে কিছু করার ক্ষমতা রাষ্ট্র কাউকে দেয়নি।


মন্তব্য