kalerkantho


সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কর্মপরিকল্পনা

জাতিসংঘ নির্দেশিত লক্ষ্য অর্জনে সমন্বয় নেই

► ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে উদ্যোগ গ্রহণ
► দুর্ঘটনার হার চলতি বছরের শুরু থেকেই ঊর্ধ্বমুখী

পার্থ সারথি দাস   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



জাতিসংঘ নির্দেশিত লক্ষ্য অর্জনে সমন্বয় নেই

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোয় সরকারের লক্ষ্য অর্জন পথ হারাচ্ছে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ের অভাবে। ২২টি জাতীয় মহাসড়কে ধীরগতির তিন চাকার বাহন চলাচল নিষিদ্ধসহ অনেক সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই।

ফলে এসব সিদ্ধান্ত মুখ থুবড়ে পড়েছে।

জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার জন্য দশক ঘোষণা করে। জাতিসংঘের এ ঘোষণার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকার। এ জন্য সপ্তম পাঁচশালা পরিকল্পনায় সরকার ২০২০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ৫০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত তথ্যের ৮৭ শতাংশই হারিয়ে যায়। ফলে এ পরিকল্পনা করতে হয়েছে অপ্রকৃত পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সড়ক ও মহাসড়কে গাড়ি বেড়ে যাওয়া, যোগ্য চালকের তীব্র সংকট, সড়ক ও মহাসড়ক নির্মানে ত্রুটি, ২২৭টি ব্ল্যাক স্পটের উন্নয়ন না হওয়া, চালকদের বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালনা, মহাসড়কে যান্ত্রিকের সঙ্গে অযান্ত্রিক গাড়ি চলাচল বন্ধ না হওয়ায় দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে হঠাৎ করে দুর্ঘটনার হার ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), সওজ অধিদপ্তর, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি করপোরেশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সড়কে দুর্ঘটনা কমানোর ব্যাপারে সমন্বয় ব্যবস্থাই গড়ে ওঠেনি।

মহাসড়ক ও রেলপথের মধ্যে যান ও ট্রেন চলাচলের জন্য উপযোগী অবকাঠামো নির্মাণ করার পরিকল্পনা শুরু থেকেই নেই। ফলে লেভেলক্রসিংয়েও প্রাণ যাচ্ছে মানুষের।  

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে, গত ১২ বছরে ৫১ হাজার ৫০০ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫৭ হাজার ২২৬ জনের। ২০১৪ সালে পাঁচ হাজার ৯৯৭টি দুর্ঘটনায় আট হাজার ৭৯৮ জন নিহত হয়। ২০১৬ সালে দুই হাজার ৯৯৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে সড়কে দুর্ঘটনার হার ছিল ৩৫ শতাংশ কম। নিহতের হার ৫০ শতাংশ কম ছিল। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকেই সড়কে দুর্ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনতে হলে কমিটি, সংস্থা আছে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। সমন্বিত কর্মসূচি থাকলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুসারে, দেশের ৩৭ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে জাতীয় মহাসড়কে, ১২ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে ও ১৫ শতাংশ ঘটছে ফিডার রোডে। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের সব মহাসড়কই দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষণায় বের হয়েছে, দেশের ৮৭ শতাংশ দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানই সংরক্ষণ করা হয় না। থানায় সংরক্ষণ করা মামলার সংখ্যা ধরে সরকার বলছে, বছরে গড়ে আড়াই হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বছরে বাংলাদেশে প্রাণহানি ঘটছে গড়ে ২১ হাজার মানুষের আর বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বছরে সড়কে প্রাণ যাচ্ছে প্রায় ১২ হাজার মানুষের।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও সওজ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের ১৮টি জাতীয় মহাসড়কে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান আছে ২২৭টি। সড়কে দুর্ঘটনার ৩৫ শতাংশই ঘটছে এসব স্থানে। ২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট ব্র্যাক-পিপিআরসির গবেষণায় বের হয়ে আসে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ—এই পাঁচ জেলায় দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়কাংশের দৈর্ঘ্য ৫৭ কিমি। দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ৯০ শতাংশ ঘটছে বাসস্ট্যান্ডে। ২৮ দশমিক ৪০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে বাজার এলাকায়। প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন করা হয়েছে। তার পরও মহাসড়কে চালকদের অতি গতিতে গাড়ি চালানো, বিভিন্ন স্থানে সংকেত না থাকা, সড়কসংলগ্ন অবকাঠামোর কাজ চলায় মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েই গেছে। সওজ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বলে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর দিয়ে দিনে গড়ে চলাচল করে ২০ হাজার গাড়ি। মহাসড়কের ৩৮টি স্থানেই আছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। যাত্রাবাড়ী, শিমরাইল, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, কুমিল্লার গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লার বিশ্বরোড, শাহরাস্তি, ফেনী ও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড অংশে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়কের ২২ কিলোমিটার অংশও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে আছে। ২২৭টির মধ্যে ১৪৪টি স্থানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সওজ অধিদপ্তর ১৬৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। গত বছর এই কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ হয়নি। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ৩৫টি, গাজীপুর-টাঙ্গাইল ও জামালপুর মহাসড়কে ১৪টি, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ২২টি, নগরবাড়ী-বাংলাবান্ধা মহাসড়কে ২৪টি, নগরবাড়ী-রাজশাহী মহাসড়কে ২৪টি, দৌলতদিয়া-ঝিনাইদহ-খুলনা মহাসড়কে ১৬টি, ঢাকা-মাওয়া-বরিশাল মহাসড়কে চারটি, বঙ্গবন্ধু সেতু সংযোগ সড়কে আটটি ব্ল্যাক স্পট আছে। কোথাও বাঁকা, কোথাও মোড় না থাকা, বিভাজক না থাকায় এসব স্থান দুর্ঘটনাপ্রবণ। আরিচা হয়ে ঢাকা-বাংলাবান্ধা মহাসড়ক ৫০৭ কিলোমিটার। তার মধ্যে ঢাকা-আরিচা অংশে ৮৮ কিলোমিটারে আগে বছরে গড়ে ১৪৫ জনের প্রাণহানি ঘটত। এ মহাসড়কে আগে বছরে গড়ে ১৩১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটত। ২২টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ঝুঁকি কমানো হয়েছে মহাড়কের প্রশস্ততা বাড়িয়ে। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করছেন ড সামছুল হক। তিনি বলেন, এ মহাসড়কের মতো সব মহাসড়কে ত্রুটি সারানো গেলে দুর্ঘটনার হার কমবে।

বিআরটিএ ও বিভিন্ন পরিবহন মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, দেশে কমপক্ষে ১০ লাখ গাড়ি চলছে বৈধ চালক ছাড়া। মোটরযান অধ্যাদেশ অনুসারে, পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে সারা দেশে জেলা প্রশাসনের অধীনে ড্রাইভিং কম্পিট্যান্সি টেস্ট বোর্ডের মাধ্যমে শারীরিক ও লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার নিয়ম আছে। বিআরটিএ বিভিন্ন পরিবহন নেতার চাপে পড়ে পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ দিচ্ছে। বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষার পরিবর্তে বিআরটিএর একজন মোটরযান পরিদর্শকের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে সড়কে প্রকৃত চালকের বদলে অবৈধ চালক বাড়ছে।   বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের চাপে পড়ে সংস্থার উচ্চপর্যায় থেকে পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। এ যাবৎ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের অধীন বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের তালিকা ধরে বিশেষ চাপে এক লাখ ৯৮ হাজার যুবককে পেশাদার চালক হিসেবে পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দিয়েছে সংস্থাটি।

জানা গেছে, নিয়ম অনুসারে, সব জেলা-উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সড়ক নিরাপত্তা কমিটি থাকার কথা। কিন্তু সব কমিটি এখনো হয়নি।   দুর্ঘটনার পর বিআরটিএ প্রতিনিধির উপস্থিত থাকার নিয়ম থাকলেও তা নিশ্চিত করা হয় না।

লেভেলক্রসিংগুলো মৃত্যুফাঁদ : বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, পূর্ব রেলে এক হাজার ১৬০টি লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে ৮১৪টিতে রেলের অনুমোদন নেই। পশ্চিম রেলে এক হাজার ২৪৯টি লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে ২৭১টিতে রেলের অনুমোদন নেই। বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিসংখ্যান অনুসারে, সাত বছরে লেভেলক্রসিংগুলোয় ২৬৪টি দুর্ঘটনায় ২০১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। সওজ অধিদপ্তর, এলজিইডি, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ অন্যান্য সংস্থার ওপর নিজের দায় চাপিয়ে রেলওয়ে মৃত্যুফাঁদ বানিয়ে রেখেছে লেভেলক্রসিংগুলোকে। রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, দেশে আছে দুই হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার রেলপথ। এসব রেলপথে দুই হাজার ৫৪১টি লেভেলক্রসিং আছে। এর একটিরও যুতসই অবকাঠামো নেই। অনেক ক্ষেত্রে ওভারব্রিজ না করেই পথচারী চলাচলের পথে দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুতসই অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে বছর বছর গেটম্যান নিয়োগ দিয়ে নিয়মিত ব্যয় করতে হতো না। আর এ জন্য নিয়োগ বাণিজ্যও বন্ধ হয়ে যেত। রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, ১৫ শতাংশ লেভেলক্রসিংয়ে গেট আছে। তবে এসব গেটে গেটম্যানরা নিয়মিত তত্পর থাকে কি না তা তদারকির জন্য বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাও নেই।

সড়ক পরিবহন আইনও হয়নি : বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে ২০২০ সালের মধ্যে দেশে দুর্ঘটনার হার দ্বিগুণ হয়ে যাবে। সংস্থার সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১.৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যে ৯ ধরনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তায় পরিকল্পনা প্রণয়ন, ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের ব্যবস্থা, তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা, নিরাপত্তা প্রকৌশল পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়ন, সড়ক ও পরিবহন আইন আধুনিকায়ন করা, ট্রাফিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষাকেন্দ্র বাড়ানো, যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পাঠ্যপুস্তকে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা, প্রচার জোরদার, সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য মহাসড়কের পাশে জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সমন্বয়ের অভাবে কোনোটিরই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি সড়ক পরিবহন আইন ছয় বছরেও করা হয়নি।

তবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফিটনেসহীন গাড়ি ও ভুয়া চালকদের বিরুদ্ধে বিআরটিএ ঢাকা ও চট্টগ্রামে নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অভিযান চালায়। অন্যান্য জেলায় জেলা প্রশাসনকে এ জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়। দুই বছর ধরে আমরা এ ব্যবস্থা চালু করেছি। সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি অনুমোদনের জন্য চলতি মাসেই মন্ত্রিসভা বৈঠকে তোলা হবে। নিরাপদ সড়কের জন্য আমরা সমন্বয় জোরদারে আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালাচ্ছি। ’


মন্তব্য