kalerkantho


মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের রিপোর্ট

হত্যা ধর্ষণ নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র

মেহেদী হাসান   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হত্যা ধর্ষণ নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র

সন্তান প্রসবের প্রহর গুনছিলেন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়েত ইয়ো পিন গ্রামের এক নারী। ওই নারী প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করলেও নবজাতকের মুখ দেখার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে ওই বাড়িতে অপেক্ষা করছিল স্বজনরা।

কিন্তু একদল সেনা সদস্যের বর্বরতায় সেই নবজাতকের আগমন-মুহূর্তটি দুঃস্বপ্ন হয়ে ধরা দেয়। রাখাইনের নার সার কিউ গ্রাম থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া এক রোহিঙ্গা তরুণী সেদিনের সেই নৃশংস ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) একটি তদন্তদলের কাছে। ওই তরুণী বলেন, ‘কিয়েত ইয়ো পিনে আমি আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুকে সামরিক বাহিনীর হত্যার শিকার হতে দেখেছি। সামরিক বাহিনী যখন গ্রামে ঢুকল তখন আমার ওই আত্মীয়া প্রসব করার অবস্থায় ছিলেন। আমরা সবাই ঘরের মধ্যে ছিলাম। সামরিক বাহিনী আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করে। প্রসব বেদনায় কাতর থাকায় আমার আত্মীয়াটি ঘর থেকে বেরোতে পারেননি। তাই তারা তাঁকে টেনেহিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে এবং তাঁর পেটে বড় একটি লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করে। শিশুটি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই তাকে ভারী বুট জুতো দিয়ে চেপে মেরে ফেলে সেনারা। এরপর তারা ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ’

এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী দেশটির রাখাইন রাজ্যের মংডুর উত্তরের একটি এলাকায় রোহিঙ্গা নারীদের গণধর্ষণ, শিশু-তরুণসহ সব বয়সী মানুষকে হত্যা, নির্মম নির্যাতন, গুম করাসহ মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন ঘটিয়েছে। গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে প্রণীত জাতিসংঘের ওএইচসিএইচআরের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে গতকাল শুক্রবার।

জাতিসংঘের মানবাধিকার তদন্তকারী একটি দল সম্প্রতি বাংলাদেশে ২০৪ জন রোহিঙ্গার সাক্ষাত্কার নিয়েছে। বেশির ভাগ রোহিঙ্গাই হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের বিবরণ দিয়েছে। পরিবারের অন্তত একজন সদস্য নিহত হওয়া এবং কেউ না কেউ নিখোঁজ থাকার তথ্য দিয়েছে সাক্ষাত্কার প্রদানকারীদের প্রায় অর্ধেকই। সাক্ষাত্কার দেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে ছিল ১০১ জন নারী। তাদের দুই-তৃতীয়াংশেরই বেশি ধর্ষণ বা কোনো না কোনোভাবে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। অনেকে বলেছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী স্থানীয় রাখাইন যুবকদের সঙ্গে নিয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। রাখাইন যুবকরা সামরিক পোশাক পরলেও তাদের চিনতে পেরেছে রোহিঙ্গারা।

জাতিসংঘ জানায়, রোহিঙ্গা শিশুদের ভয়ংকর নির্মমতার শিকার হওয়ার তথ্য মিলেছে। আট মাস, পাঁচ বছর ও ছয় বছর বয়সী তিন শিশুর তথ্য উল্লেখ করে জাতিসংঘ বলেছে, তাদের ছুরি দিয়ে জবাই করা হয়েছে। এক মা বর্ণনা দিয়েছেন কিভাবে তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে তাকে ধর্ষণ থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল। তিনি বলেন, তাঁকে ধর্ষণ করতে আসা ব্যক্তি একপর্যায়ে লম্বা একটি ছুরি বের করে এবং তার মেয়ের গলা কেটে ফেলে।

অন্য এক ঘটনায় পাঁচজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা মিলে এক নারীকে ধর্ষণের সময় তার আট মাস বয়সী শিশুকে মেরে ফেলে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সাম্প্রতিক সহিংসতার মাত্রা নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জায়িদ রাদ আল হুসেইন। তিনি বলেন, ‘শিশুদের ওপর ভয়ংকর নির্মমতা সহ্য করার মাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে। কতটা ঘৃণা থাকলে মায়ের দুধের জন্য কান্নারত একটি শিশুকে এক লোক ছুরি দিয়ে হত্যা করতে পারে এবং ওই মাকে ধর্ষিত হওয়ার সময় নিজের শিশুসন্তানকে হত্যার দৃশ্যও দেখতে হয়! যে নিরাপত্তা বাহিনীর তাঁকে রক্ষা করার কথা, তারাই তাঁকে ধর্ষণ করে! এটি কেমন অভিযান?’

জায়িদ রাদ আল হুসেইন বলেন, ‘আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলি তারা যেন সর্বশক্তি নিয়ে আমার সঙ্গে মিলে মিয়ানমারের নেতৃত্বের প্রতি এ ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানায়। অভিযোগের যে ব্যাপকতা ও মাত্রা তা অবশ্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো প্রতিক্রিয়ার দাবি রাখে। ’

জাতিসংঘ জানায়, বারবার আহ্বান সত্ত্বেও মিয়ানমার সরকার জাতিসংঘের ওএইচসিএইচআরকে রাখাইন রাজ্যে নির্বিঘ্নে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জায়িদ রাদ আল হুসেইন তাঁর দপ্তরের কিছু কর্মীকে বাংলাদেশের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় পাঠান।

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, জাতিসংঘের ওএইচসিএইচআরের একটি দল গত ৮ থেকে ২৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি নিয়ে তাদের মতো করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।

জাতিসংঘ বলেছে, গত ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের তিনটি সীমান্ত চৌকিতে হামলার পর সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক অভিযান এবং অবরুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাত্কার নেয় ওই দলটি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বরাবরই বলছে, ৯ অক্টোবরের পর তারা ওই অঞ্চলে অপরাধীদের খোঁজে অভিযান চালিয়েছে। তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিবরণ থেকে স্পষ্ট যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও কিছু ক্ষেত্রে বেসামরিক লোকজন অভিযানের নামে বাড়িঘর, স্কুল, বাজার, দোকানপাট, মাদরাসা ও মসজিদ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে, শুধু বসতবাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়, তাদের খাবার ও খাবারের উত্স যেমন ধানক্ষেত ধ্বংস করেছে, গবাদি পশু ছিনিয়ে নিয়ে গেছে সেনারা।

প্রতিবেদনের একটি অংশের উদ্ধৃতি দিয়ে ওএইচসিএইচআর জানায়, ‘বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা লোকজনের অনেক সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এটি নিশ্চিত যে সেনাবাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবেই রোহিঙ্গাদের ঘরের মধ্যে আটকে রেখে আগুন দিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আগুন লাগানো ঘরে রোহিঙ্গাদের ঢুকতে বাধ্য করেছে। ’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ‘বেশ কয়েকটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে, সেনাবাহিনী বা রাখাইন গ্রামবাসী বয়স্ক, প্রতিবন্ধীসহ রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর সব সদস্যকে ঘরে আটকে আগুন দিয়ে সবাইকে মেরে ফেলেছে। ’

ওএইচসিএইচআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচার ও লাগাতার গুলিবর্ষণের সময় অনেক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। আবার অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছাড়ার সময় নিহত হয়। যারা গুরুতর আহত হয়েছে তাদের কোনো ধরনের জরুরি চিকিত্সা পাওয়ার সুযোগ ছিল না। ওএইচসিএইচআরের প্রতিনিধিদলকে সাক্ষাত্কার দেওয়া অনেকেই মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দেখার পর থেকে অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় আছে। মিয়ানমারে তাদের অনেকের প্রিয়জনদের সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে বা তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ওই ব্যক্তিদের পরিণতি কী হয়েছে তা তারা জানে না। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা সেখানে রেখে আসা স্বজনদের নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তিত।

জাতিসংঘ জানায়, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের অনেকেই বলেছে, সেখানে তাদের আটক করে নির্যাতন বা ধর্ষণের সময় বলা হতো—‘তোরা বাংলাদেশ থেকে এসেছিস এবং বাংলাদেশেই তোদের ফিরে যাওয়া উচিত। ’ অথবা ‘তোর আল্লাহ তোকে কিভাবে বাঁচাবে? দেখ, আমরা তোকে কী করি?’

ওএইচসিএইচআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯ অক্টোবরের পর থেকে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের সমাজ থেকে বিচ্যুত করার ধারাবাহিক নীতির অংশ।

প্রতিবেদন থেকে ধারণা পাওয়া যায়, গত অক্টোবরে শুরু হওয়া মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান জানুয়ারিতেও অব্যাহত ছিল। হয়তো এর ভয়াবহতার মাত্রা কিছুটা কমেছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল : জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, ‘প্রার্থনা করা, পরিবারের সদস্যদের জন্য মাছ ধরা কিংবা নিজেদের ঘরে ঘুমানোর সময় অনেককে হত্যা করা হয়েছে। দুই বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে আশি বছরের বৃদ্ধাকে পর্যন্ত নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটনার নির্দেশদাতাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘মিয়ানমার সরকারকে অনতিবিলম্বে তার নিজের লোকদের ওপর ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন থামাতে হবে। যা ঘটেছে তা অস্বীকার করার নীতি ছেড়ে মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই এসব ঘটনা স্বীকার করে ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ’

ওএইচসিএইচআর বলেছে, প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর যে মাত্রায় সহিংসতার তথ্য প্রকাশ পেয়েছে তা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ।

অক্টোবর থেকে ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে : গত অক্টোবর মাস থেকে প্রায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে গত বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিচ এমন তথ্য তুলে ধরেন। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা দপ্তরের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, গত অক্টোবর মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর থেকে সেখানে অন্তত ৯২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র বলেন, রাখাইন রাজ্যের উত্তরাংশে জাতিসংঘ ও অন্য সংস্থাগুলোর ত্রাণ তত্পরতা তিন মাস ব্যাহত হওয়ার পর মিয়ানমার সরকার আবার তাদের কিছু কার্যক্রম শুরু করার অনুমতি দিয়েছে। তবে বিদেশি কর্মীরা তাদের চলাফেরায় বিধিনিষেধ অনুধাবন করায় সেখানে স্থানীয় কর্মীদের মাধ্যমেই বেশির ভাগ গ্রামে খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

মুখপাত্র আরো বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতীয়তা, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, ধর্ম বা নাগরিক মর্যাদা নির্বিশেষে সবার কাছে প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ দিতে সেখানে চলাফেরায় বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানাচ্ছে জাতিসংঘ।

তদন্তের আশ্বাস সু চির : জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার যায়িদ রা’দ আল-হোসেইন গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে আমি অং সান সু চির সঙ্গে কথা বলেছি। সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি ও চলমান অভিযান বন্ধ করতে আমি তাঁকে তাঁর সব ধরনের সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছি। তিনি আমাকে বলেছেন, এ বিষয়ে তদন্ত করা হবে। তিনি বলেছেন, তাঁদের বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন। ’


মন্তব্য