kalerkantho


হুলিয়ার কারণে পড়াশোনা আগায়নি

এম এ খালেক

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হুলিয়ার কারণে পড়াশোনা আগায়নি

‘ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে পড়ার সময়ই মিটিং-মিছিলে যেতাম। ভাষা আন্দোলন নিয়ে সভা-সমাবেশে যোগ দিয়েছি। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতেও আমরা কলেজ থেকে বের হয়ে শহরে মিছিল করি। পুলিশ সেই মিছিল ভেঙে দেয়। পরে জানতে পারি আমার নামে হুলিয়া বের হয়েছে। বাসা থেকে পালিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাই। অনেক দিন সেখানেই ছিলাম। এরপর আর পড়ালেখা হয়নি। ’

ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সেই দিনগুলোর প্রসঙ্গ টানতেই মনের গহিনে জমে থাকা স্মৃতির পাহাড় নাড়া খেয়ে ওঠে এম এ খালেক আল আজাদের। হাতড়ে হাতড়ে তিনি তুলে আনতে থাকেন টুকরো টুকরো কথা, মায়ের ভাষার জন্য ভালোবাসার নমুনা। হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরতে হয়েছে, জেলও খেটেছেন। ছাড়া পেলেও নজরদারিতে ছিলেন দীর্ঘ সময়। পালিয়ে থাকার কারণে উচ্চ মাধ্যমিক আর পাসই করা হয়নি তাঁর।

দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় জড়িত ছিলেন ময়মনসিংহের এই ভাষাসৈনিক। লোকজনের কাছে তিনি খালেক স্যার নামেই পরিচিত। বয়স এখন ৮৪ বছর। বার্ধক্য জেঁকে ধরেছে। বলতে গেলে অনেকটাই শয্যাশায়ী। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা, স্মৃতিশক্তিও আজ আর খুব প্রখর নয়। কিছু জানতে চাইলে অনেকক্ষণ চুপ থেকে দু-একটা করে বাক্য বলেন।

জানা গেল, মুক্তাগাছার ঘোঘা গ্রামের রজব আলী সরকার ও ফাতেমা বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে এম এ খালেকই একমাত্র ছেলে। মুক্তাগাছার আর কে হাই স্কুলে পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনার পর ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে ভর্তি হন। চাকরিজীবী চাচা নজর আলীর বাসা ছিল শহরের গোহাইলকান্দি এলাকায়। সেখানে থেকেই পড়াশোনা চলত। পরে চাচা বদলি হয়ে যান জামালপুরে। অষ্টম শ্রেণিতে উঠে এম এ খালেকও চলে যান জামালপুর জেলা শহরে। সেখান থেকে আবার চলে যান মুক্তাগাছার গাবতলী স্কুলে। সেখান থেকেই ১৯৪৯ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন আনন্দ মোহন কলেজে। আবার গোহাইলকান্দির বাসায় ওঠেন। নিয়মিত কলেজে যান। তত দিনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। তরুণ এম এ খালেকও এ নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগ দেওয়া শুরু করেন।  

এম এ খালেকের কথা থেকে জানা যায়, প্রথমবারের পরীক্ষায় তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাস করতে পারেননি। ফলে ১৯৫২ সালেও তিনি উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রই ছিলেন। সে সময় একদিন কলেজের ছাত্ররা ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সিদ্ধান্ত নেন ২১ ফেব্রুয়ারি মিছিল হবে। শুধু ক্যাম্পাসে নয়, মিছিল যাবে কলেজের বাইরে। মিছিল হবে শহরের প্রধান সড়কে। নির্ধারিত দিনে কলেজ থেকে মিছিল শুরু হলো। কলেজ থেকে বের হয় শহরের প্রধান সড়কের নতুন বাজার পর্যন্ত পৌঁছে যায় মিছিল। কয়েক শ ছাত্র ছিলেন সেই মিছিলে। নেতৃত্বে ছিলেন রফিক উদ্দিন ভুঁইয়া, শামসুল হক প্রমুখ। প্রধান সড়কে পুলিশ মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

মিছিলের পর সেদিন আর কলেজে ফেরেননি এম এ খালেক। বিকেলে শহরের গোহাইলকান্দি এলাকার বাসায় ফেরেন। তখন চাচা নজর আলী ছিলেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্টেনোগ্রাফার। অফিস শেষে সন্ধ্যায় চাচা বাসায় আসেন। এসে চোখ গরম করে এম এ খালেককে বলেন, ‘তুই কইছিলি দিনের বেলা’। তিনি (এম এ খালেক) মিছিলের কথা জানান। চাচা বলেন, ‘এখনই বাসা থেকে চলে যা, পুলিশ তোকে ধরতে আসবে। তোর নামে হুলিয়ে বের হয়েছে। ’ ওই রাতেই এম এ খালেক চলে যান মুক্তাগাছার প্রত্যন্ত পল্লী ঘোঘা গ্রামে। তারপর আর পড়াশোনার জন্য ফেরা হয়নি আনন্দ মোহন কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাও দেওয়া হয়নি। তবে রাজনীতি সচেতনতার কারণে সময় পেলেই গ্রাম থেকে চলে যেতেন মুক্তাগাছা পৌর শহরে। সেখানে পাকিস্তানবিরোধী সমাবেশ ও মিছিলে যোগ দিতেন।

স্মৃতি হাতড়ে এম এ খালেক বলেন, সময়টা আজ আর ঠিকঠাক মনে নেই। ১৯৫৩ বা ৫৪ সালের দিকে পুলিশ তাঁকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠায়। জেলে ছিলেন চার মাস। গুরুতর অসুস্থ হয়ে ময়মনসিংহ শহরের এস কে হাসপাতালেও ভর্তি ছিলেন। পরে মা-বাবা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছেলেকে মুক্ত করেন। তবে এর পর তাঁকে এক বছর নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। পরে পেশাগত জীবনে মুক্তাগাছা ও ময়মনসিংহের একাধিক স্কুলে ক্রীড়া শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধেও ছিলেন সক্রিয়। ১৯৯১ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।

আরেকটি বিষয়ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন মহলে এম এ খালেককে পরিচিত করে তোলে। তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে নানা ভঙ্গিতে খেলা দেখাতেন। ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত পল্লী—সবখানে তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় এ খেলার কারিগর। জাতীয় দিবসগুলোতে বিভিন্ন স্টেডিয়ামে তাঁর খেলা দেখতে হাজরি হতো অসংখ্য দর্শনার্থী।

এখন মুক্তাগাছা শহরে নিজ বাসাতেই সময় কাটে এই ভাষাসৈনিকের। ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি নিয়ে সুখের সংসার। তবে নিজের জীবনী নিয়ে তেমন কোনো তথ্য লিখে রাখেননি তিনি। স্থানীয়ভাবেও এগুলো কেউ সংগ্রহ করেননি। এ কারণে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের এই সাক্ষীর কথা অগোচরেই থেকে গেছে।

সমাজ ও আগামী প্রজন্মের উদ্দেশে কিছু বলার অনুরোধ জানালে এম এ খালেক শুধু বলেন, ‘এখনকার রাজনীতি ভালো লাগে না। আগের সেই সম্মান আর নাই। ’


মন্তব্য