kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বিশ্বরেকর্ড গড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ

এক ক্লাসে ৩২০০ ‘খুদে বিজ্ঞানী’

নাসরুল আনোয়ার, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ) থেকে   

১২ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



এক ক্লাসে ৩২০০ ‘খুদে বিজ্ঞানী’

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে গতকাল ২৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তিন হাজার ২০০ ছাত্রছাত্রীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় সারা বিশ্বের বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ব্যবহারিক ক্লাস। এই ক্লাস পরিচালনা করেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘তোমরা কেমন আছ’—ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের এমন প্রশ্নের উত্তরে শিশু শিক্ষার্থীরা সমস্বরে বলো উঠল, ভালো আছি। একজন, দুজন নয়; ৩২০০ জন! তা-ও আবার একসঙ্গে, একই ক্লাসে! বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে এক ক্লাসে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীর জমায়েত হওয়ার এ ঘটনা কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের। গতকাল বুধবার কুলিয়ারচর থানার মাঠে দুপুর ১২টায় শুরু হয় এই ক্লাস, চলে টানা প্রায় দেড় ঘণ্টা। এর মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ব্যবহারিক ক্লাস হয়ে গেল।

ক্লাসে অংশ নেয় উপজেলার ২৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বইয়ে বাংলাদেশের নাম তুলতে কুলিয়ারচর উপজেলা প্রশাসন এ আয়োজন করে। হাজিরা নিশ্চিত করতে সব শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর নেওয়া হয়।  

আয়োজক সূত্র জানায়, এর আগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যবহারিক ক্লাসের রেকর্ডটি গড়েছিল অস্ট্রেলিয়া। ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট ব্রিসবেনে দুই হাজার ৯০০ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে ব্যবহারিক ক্লাস হয়। গিনেস কর্তৃপক্ষ সেটিকে বিশ্বে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ক্লাস হিসেবে রেকর্ড করে। গতকালের ক্লাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে ছাড়িয়ে গেল।

পুরো ক্লাস পরিচালনা করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিসিবির (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) সভাপতি ও কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনের সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন।

খুদে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, পৃথিবীর আর কোথাও এত বড় ক্লাস হয়নি। শুরুতেই তিনি শিক্ষার্থীদের বৈদ্যুতিক চুম্বক তৈরি করা শেখান। ব্যাটারি, তার, পেরেক, সুই ইত্যাদি দিয়ে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে চুম্বক তৈরি করতে শেখে। কাটা আলুর মধ্যে সুই গেঁথে তাতে কাগজের টুকরা সাঁটিয়ে কম্পাস তৈরি করাও শেখে ওরা।

এ সময় শিক্ষার্থীরা নিজ হাতে পরখ করে সমমেরুতে চুম্বকের বিকর্ষণ সম্পর্কেও জেনে যায়। ড. জাফর ইকবাল এ সময় নিজের হাতের ওপর পিঠে একটি চুম্বক রেখে আরেকটি চুম্বকের সমমেরু ধরেন তালুতে। ওপরে রাখা চুম্বকটি তখন ডিগবাজি খায়। তিনি এভাবে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিজ্ঞানের নানা খেলায় মেতে ওঠেন।  

বৈদ্যুতিক চুম্বক (ইলেকট্রো ম্যাগনেট) ও কম্পাস তৈরি করতে পেরে শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে খুশির ঝিলিক। উপজেলার ছয়সূতী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জ্যোতি কালের কণ্ঠকে বলল, ‘খুব ভালো লাগছে। অনেক কিছু শিখতে ও জানতে পারছি। ’ ড. জাফর ইকবাল ছেলেমেয়েদের উদ্দেশে বলেন, ‘পৃথিবীর সব মানুষ আজ দেখছে, ৩২০০ ছেলেমেয়ে একসঙ্গে চুম্বক তৈরি করছে। এ চুম্বক দিয়েই তৈরি হয় বৈদ্যুতিক মোটর, তাতেই চলে বৈদ্যুতিক পাখা। পৃথিবীর মাঝখানেও এমন একটা চুম্বক আছে। আমাদের পৃথিবীটাই বিশাল একটা চুম্বক। ’ শিক্ষার্থীরা জেনে যায় যে কম্পাস সব সময় উত্তর-দক্ষিণে মুখ করে থাকে।

ক্লাসে কম্পিউটারের কার্যকারিতা ও ভণিতা করে ই-মেইল পাঠানোও শেখানো হয়। শিক্ষার্থীরা একটি হলুদ খামে পুরে ‘ই-মেইল’ পাঠায়। সেগুলো একসঙ্গে যুক্ত হয় রাউটারে। ‘রাউটার’ নির্ধারণ করা হয় তথ্য-প্রযুক্তি ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককেই। তিন হাজার ২০০ ‘ই-মেইল’ অভীষ্ট রাউটারে পৌঁছার পর সেখান থেকে লটারির মতো খাম তুলে ১৬ জন শিক্ষার্থীকে পুরস্কৃত করা হয়। পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত বিভিন্ন বিজ্ঞান-কল্পকাহিনীবিষয়ক বই। তবে সব ছেলেমেয়েই একটি করে ‘সায়েন্স কিট’ পায়।   

আয়োজক কর্তৃপক্ষের দাবি, গতকাল আরো কয়েকটি ‘বিশ্বরেকর্ড’ গড়েছে তারা। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের হাতে একসঙ্গে সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। ভিজিটিং কার্ডের আকারে দেওয়া এসব সনদপত্রও বিশ্বের সবচেয়ে ছোট সনদপত্র। শিক্ষার্থীরা তাদের ছয় হাজার ৪০০ হাত একসঙ্গে উঁচিয়ে সনদপত্র দেখায়। ড. জাফর ইকবাল তখন ঘোষণা দেন, এর সবই একেকটা বিশ্বরেকর্ড।

‘খুদে বিজ্ঞানী’দের দীর্ঘ ক্লাসের একঘেয়েমি কাটাতে ড. জাফর ইকবাল রসিকতাও করেন। তিনি ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য আগে কিনে রাখা আলু পচে যাওয়ার ‘গুমর’ ফাঁস করে দেন। পরে আবার নতুন করে আলু কিনে আনার তথ্য জানান। শুনে ছেলেমেয়েরা হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে। ত্রিপল-শামিয়ানায় আবদ্ধ ‘শ্রেণিকক্ষে’ টানা দুই ঘণ্টা অবস্থান করে শিক্ষার্থীরা ঘেমে-নেয়ে উঠছিল। তা আঁচ করতে পেরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক সবাইকে নিয়ে হাতের তালুতে এক-দুই-তিন আঙুলে বৃষ্টির ধ্বনি তোলেন। তাতে চমৎকার আবহ তৈরি হয়। পরে তিনি প্রশ্ন করেন, এখন নিশ্চয়ই গরম কমে গেছে?     

পুরস্কার না পাওয়া শিশুরা যাতে মন খারাপ না করে সে জন্য নাজমুল হাসান পাপন সব শিক্ষার্থীকে পুরস্কার দেওয়ার আশ্বাস দেন। এমন ক্লাসের আয়োজনকারী কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ড. ঊর্মি বিনতে সালামকে তিনি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। জেলা প্রশাসক মো. আজিমউদ্দিন বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ইউএনও ড. ঊর্মি বিনতে সালাম, কুলিয়ারচর পৌরসভার মেয়র ইমতিয়াজ বিন মুসা জিসান, কুলিয়ারচর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. জিল্লুর রহমান প্রমুখ। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ইয়াসমিন হক।   

বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসানের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় নাজমুল হাসান পাপন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষিত মানুষ দরকার। আমি সব সময় নতুন প্রজন্মের পক্ষে। ক্রিকেটার মুস্তাফিজ, মিরাজ, সাকিব, তামিমরা যেমন বাংলাদেশকে সারা পৃথিবীর কাছে তুলে ধরেছে; আমার দৃঢ়বিশ্বাস, তেমনি তোমরা নতুন প্রজন্ম কুলিয়ারচরকেও সারা বিশ্বের কাছে নতুন করে উপস্থাপন করবে। ’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক অংশ নেওয়া ২৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘শেখ রাসেল ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব’ স্থাপনের ঘোষণা দিলে বাঁধভাঙা উল্লাস শুরু হয় শিক্ষার্থীদের মাঝে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তিতে বিশ্ব জয় করব। আর তা করবে তোমরাই। ’ তিনি সবাইকে বিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাস করার তাগিদ দেন। শেষে তিনি স্লোগান ধরেন, ‘আমরা হব জয়ী, আমরা দুর্বার, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে আইসিটি হবে হাতিয়ার। ’     

দূর থেকে যেন পরিচালকের দিকনির্দেশনা দেখা যায়, সে জন্য মাঠের মাঝখানে ত্রিপল-শামিয়ানায় তৈরি বিশাল ‘শ্রেণিকক্ষে’র ফাঁকে ফাঁকে অগণিত মনিটর সাঁটিয়ে রাখা হয়। ক্লাস উপলক্ষে গতকাল কুলিয়ারচর পৌর শহর উৎসবের নগরে পরিণত হয়। অতিথিদের আগমনে নানা জায়গায় স্থাপন করা হয় তোরণ। বিশাল মাঠজুড়ে গড়া শ্রেণিকক্ষের চারপাশ সাজানো হয় বিলবোর্ড, ব্যানারসহ নানা কিছু দিয়ে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ জন শিক্ষার্থী, কুলিয়ারচরের ১৪০ জন শিক্ষক ও একদল রোভার স্কাউট ক্লাস পরিচালনায় সহায়তা করেন।


মন্তব্য