kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ইংল্যান্ডের সঙ্গে আজ শুরু বাংলাদেশের টেস্ট ‘পরীক্ষা’

নোমান মোহাম্মদ, চট্টগ্রাম থেকে   

২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



 ইংল্যান্ডের সঙ্গে আজ শুরু বাংলাদেশের টেস্ট ‘পরীক্ষা’

চট্টগ্রামে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মুশফিক ও কুক। ছবি : কালের কণ্ঠ

সেবার আকাশে ছিল মেঘের রাজত্ব। এবার রোদ্দুরের সাম্রাজ্য।

এক সপ্তাহের ব্যবধানে চট্টগ্রামের আকাশের কী আশ্চর্য রংবদল!

ঠিক যেমনিভাবে রূপ বদলে যায় বাংলাদেশের টেস্ট-ওয়ানডের সাফল্য সম্ভাবনায়। ওয়ানডে সিরিজের আবহে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ফেভারিটের মনিহার পরিয়ে দেন স্বাগতিকদের। টেস্ট সিরিজের আগে আবার বাংলাদেশ দলনেতা স্বেচ্ছায় সে সিংহাসন ছেড়ে দেন সফরকারীদের জন্য। চট্টগ্রামের আকাশের পালাবদলের প্রতিবিম্ব হয়েই যেন এক দিনের ক্রিকেটের সঙ্গে পাঁচ দিনের ক্রিকেটে ফেভারিটের পালাক্রম যায় বদলে। কিন্তু ওয়ানডে সিরিজে তো কাগজ-কলমের হিসাবে এগিয়ে থেকেও জিততে পারেনি বাংলাদেশ! টেস্ট সিরিজেও কি হবে একই চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি?

আশা করার ভরসা ঠিক পায় না বাংলাদেশ। ১৪ মাস পর টেস্ট খেলতে নামা দলের কাছে অতটা প্রত্যাশা করতে কেমন যেন বাধো বাধো লাগে সমর্থকদেরও।

সপ্তাহখানেক আগে সিরিজ নির্ধারণী ওয়ানডের মঞ্চ ছিল চট্টগ্রাম। যে ম্যাচের আবহে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন জুড়ে দেয় আবহাওয়া। আগের তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে সেই ম্যাচ আয়োজন নিয়ে ছিল বড় শঙ্কা। টেস্ট আবহে আয়োজন নিয়ে আশঙ্কা নেই বটে। তবে ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণে আবহাওয়া বড় ভূমিকা পালন করতে পারে ঠিকই। কাল জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের প্রচণ্ড গরম যেন দিয়ে রাখে সেই পূর্বাভাস। আকাশ থেকে রুপালি শঙ্খচূড়ের মতো নেমে আসা রোদ্দুর যেভাবে ছোবল বসায়, তাতে এই টেস্টে গরমেই দিশাহারা হয়ে যেতে পারে ইংল্যান্ড। এই গুপ্তঘাতকে প্রতিপক্ষকে কাবু করার সুবিধাটুকু বাংলাদেশ নিতে পারলেই হয়! ব্যাট-বলের ক্রিকেটীয় দক্ষতার ব্যবধান তখন কমে আসবে নিঃসন্দেহে।

এমন আবহাওয়ায় এমনিতেই অভ্যস্ত নন ইংরেজ ক্রিকেটাররা। আর কালকের গরমে তো বাংলাদেশের খেলোয়াড়দেরই হাঁসফাঁস অবস্থা। সামনের পাঁচ দিনের আগাম ছবিটা তাই স্বাগতিক অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম আগাম আঁকতে পারছেন, ‘আবহাওয়া অবশ্যই অনেক বড় প্রভাব ফেলবে। টানা পাঁচ দিন মনোযোগ ধরে রেখে ধারাবাহিক ক্রিকেটে খেলা হবে চ্যালেঞ্জিং। তবে এই কন্ডিশন আমাদের চেয়ে ওদের জন্য আরো কঠিন। যেহেতু ওরা এ ধরনের আবহাওয়ায় অভ্যস্ত নয়। অবশ্য ওরা এখানে প্রায় ২০ দিন ধরে আছে। তবু চেষ্টা করব সুবিধা যতটুকু আছে আমাদের, তা কাজে লাগাতে। ’ আর বাংলাদেশের সেই সুবিধাটুকু মেনে নেন প্রতিপক্ষ অধিনায়ক অ্যালিস্টার কুকও, ‘আজ তো মনে হচ্ছে, তাপমাত্রা যেন এক-দুই ডিগ্রি বেড়ে গেছে। আগামী পাঁচ দিনে মাঠে থেকে খেলাটা হবে তাই কঠিন চ্যালেঞ্জের। ’

ফরম্যাট বদলে ওয়ানডে থেকে টেস্ট হয়েছে। সেখানে অধিনায়কত্ব বদল হয়েছে দুই দলেরই। বাংলাদেশের রাজদণ্ড মুশফিকের হাতে, ইংল্যান্ডের কুক। অদল-বদল হয়েছে ফেভারিটের তকমাতেও। মুশফিক তা মেনে নিচ্ছেন। তাই বলে যুদ্ধের আগে হার মেনে নিচ্ছেন না, ‘ইংল্যান্ড দল গত কয়েক বছরে দেশের মাটিতে ও বাইরে যেভাবে খেলছে, তাতে ওরা টেস্ট সিরিজে পরিষ্কার ফেভারিট। তবে এটাই শেষ কথা নয়। ওয়ানডে সিরিজেও আমরা ফেভারিট ছিলাম; কিন্তু হেরেছি। টেস্টে যারা শুরুতে ম্যাচের লাগাম ধরতে পারবে, তারাই পুরো নিয়ন্ত্রণ করবে। আমরা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে মুখিয়ে আছি। আশা করি কঠিন লড়াই করতে পারব। ’

বাংলাদেশের জন্য লড়াইটা কঠিন হয়ে গেছে টেস্টে অনভ্যস্ততার কারণে। ২০১৫ সালের আগস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্ট খেলে মুশফিকের দল। সাড়ে ১৪ মাস পর আবার পাঁচ দিনের ক্রিকেট খেলতে নামছে আজ। ১৬ বছরের টেস্ট যুগে এত দীর্ঘ বিরতি পড়েনি কখনো। এর আগের দীর্ঘতমর সঙ্গেও জড়িয়ে ইংল্যান্ডের নাম। তাদের বিপক্ষে ম্যানচেস্টারে ২০১০ সালের ৪ জুন শুরু হওয়া টেস্টের পর ২০১১ সালের ৪ আগস্ট জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারেতে মাঠে নামে বাংলাদেশ। ঠিক ১৪ মাস পর। এবারের বিরতি আরেকটু বেশি। আর প্রত্যাবর্তনটা হচ্ছে সেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। যারা কিনা বাংলাদেশের এই বিরতির সময় টেস্ট খেলেছে ১৬টি!

ইংল্যান্ড তাই ফেভারিট হবে না কেন!

গত দুই বছরে ওয়ানডেতে দুই কূলপ্লাবী সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। টেস্টে যে একেবারে বিপরীত স্রোত, তা বলা যাবে না। গত বছর খুলনায় পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের সমান ড্র যার হাইলাইট। দক্ষিণ আফ্রিকাকে অল আউট করা এবং তাদের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে লিড পাওয়ার কথা তো কাল মনেই করিয়ে দেন মুশফিক, ‘অবশ্যই এটা ভাবনার যে টেস্টে আমরা সেভাবে ভালো খেলতে পারছি না। কিন্তু গত ১৪-১৫ বছরের চেয়ে গত এক বছরে ভালো খেলেছি। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে অল আউট করেছি, লিড নিয়েছি। এমন অনেক ইতিবাচক দিক আছে। তবে এখনো বহু কাজ করার বাকি আছে। ’ বাকি আছে বলেই তো কাগজ-কলমে আলোকবর্ষ এগিয়ে ইংল্যান্ড।

টেস্টের দিনদুয়েক আগে কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে খোলাখুলি বলে দেন, ২০ উইকেট নেওয়ার মতো বোলার বাংলাদেশের নেই; অনভিজ্ঞ বোলিং লাইনআপ নিয়ে এই ম্যাচ জেতা হবে বোনাস। তা বোলিংটা অনভিজ্ঞই বটে। বিশেষত পেস বোলিং। মাশরাফি বিন মর্তুজা টেস্ট খেলছেন না সেই ২০০৯ সাল থেকে। এই ফরম্যাটে অভিষেক হয়নি তাসকিন আহমেদের। ইনজুরির কারণে নেই মুস্তাফিজুর রহমান ও মোহাম্মদ শহীদ। ফর্মের কারণে স্কোয়াডে রাখা হয়নি রুবেল হোসেন ও আল-আমিন হোসেনকে। কেবল দুই পেসার আছেন ১৪ জনে—শফিউল ইসলাম ও কামরুল ইসলাম। তবে বাংলাদেশের রণকৌশল যে স্পিনারদের ঘিরে, তা বোঝা যায় অধিনায়কের কথায়, ‘ফ্ল্যাট উইকেটে ২০ উইকেট নেওয়া কঠিন। সেদিক থেকে বলব আমরা এবারের পরিকল্পনা করেছি অন্য রকম। আমাদের মূল শক্তি স্পিনাররা। উইকেট যদি স্পিনারদের সাহায্য করে, তাহলে ওদের ২০ উইকেট নেওয়ার মতো বোলার রয়েছে আমাদের। ’ অন্য প্রশ্নে মুশফিকের উত্তরেও উইকেট নিয়ে চাহিদাটা বোঝা যায়, ‘যদি প্রথম ইনিংসে ৩০০-র বেশি রান করতে পারি, তাহলে তা আমাদের অনেক এগিয়ে দেবে। ’

ব্যাটসম্যানদের কাছে প্রত্যাশা ইনিংসে মোটে ৩০০ রান! উইকেট যে স্পিনবান্ধব হবে, বুঝতে বাকি থাকে না। দলের একাদশ নির্বাচনে থাকতে পারে এর প্রভাব। টেস্ট ব্যাটিং লাইনের প্রথম ছয়জন একেবারে নির্দিষ্ট। সাতে সাব্বির রহমানের টেস্ট অভিষেক হওয়াও নিশ্চিত। দেশসেরা অফস্পিনার বিবেচনায় মেহেদী হাসানের মাথায় উঠছে টেস্ট ক্যাপ। সাকিব ও তাইজুল ইসলামের সঙ্গে স্পিন আক্রমণ ত্রিফলায় তিনি অন্যতম অস্ত্র। সঙ্গে দুই পেসার। যেখানে তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট অভিষেক হতে পারে কামরুল ইসলামের; পেস আক্রমণে যিনি হবেন শফিউল ইসলামের সঙ্গী। স্কোয়াডের ১৪ জনের মধ্যে সৌম্য সরকার, নুরুল হাসান ও শুভাগত হোম থাকতে পারেন একাদশের বাইরে।

তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আজ থেকে শুরু হওয়া ম্যাচে শেষ পর্যন্ত যে ১১ জনই খেলুন না কেন, তাঁদের দায়িত্ব টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের রং বদলে দেওয়ার। মেঘের কালো থেকে রোদ্দুরের রুপালিতে রূপান্তরের। ঠিক ওই চট্টগ্রামের আকাশের মতোই!


মন্তব্য