kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নদীভাঙন রোধে সব ব্যবস্থাই অস্থায়ী, নেই মহাপরিকল্পনা

মোশতাক আহমদ   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নদীভাঙন রোধে সব ব্যবস্থাই অস্থায়ী, নেই মহাপরিকল্পনা

দ্বীপ জেলা ভোলায় নদীভাঙন শুরু হয় ষাটের দশকে। তখন থেকে ছোট ছোট প্রকল্পের মাধ্যমে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

কিন্তু সে অর্থে ভাঙন ঠেকানো যায়নি। ভাঙনের কবলে পড়ে ভোলার আয়তন দিন দিন কমছেই। মেঘনার ভাঙনে শীর্ণকায় হয়ে পড়েছে তজুমদ্দিন ও দৌলতখান উপজেলা। মেঘনার করালগ্রাসেই বিলীন হয়ে গেছে চাঁদপুরের পুরান বাজার এলাকা, বারবার সরিয়েও রক্ষা করা যায়নি ঐতিহ্যবাহী এই নদীবন্দর।

নদীভাঙনের বা স্থাপনা বিলীন হওয়ার এমন করুণ চিত্র দেশের ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীতীর এলাকায় অনেক পাওয়া যাবে।

সরকার বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উপকূলীয় ১৬ জেলার পুরনো বেড়িবাঁধগুলো তিন মিটার উঁচু করার পরিকল্পনা করেছে। মাঝারি ধরনের কিছু প্রকল্প হাতেও নিয়েছে। কিন্তু নেওয়া হয়নি সামগ্রিক পরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান)।

পাউবো সূত্র জানায়, ১৯৫৯ সালে তৎকালীন পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ওয়াপদা) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে তারা নদীভাঙন রোধে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ওয়াপদা ভেঙে পরে পানি উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড আলাদা করা হয়েছে। সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে (ওয়াপদা ও পাউবো মিলে) নদীভাঙন রোধে ৭৫১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গত চার দশকে এ খাতে সরকার খরচ করেছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু মহাপরিকল্পনা তথা মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় কার্যকর কিছু করা যাচ্ছে না। মাঝারি বা ছোট প্রকল্প দিয়ে স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধ করা যাচ্ছে না; জনগণের সহায়-সম্পদ ও জমি রক্ষা করা যাচ্ছে না। দেশে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ লোক প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের শিকার হয়। বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি ডলার।

পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় একই স্থানের জন্য বারবার প্রকল্প নিতে হয়। আর প্রকল্প পরিকল্পনা, সেই পরিকল্পনা পাস হওয়া, অর্থ বরাদ্দ, দরপত্র আহ্বান এবং এরপর কাজ শুরু করে শেষ করতে দুই থেকে তিন বছর লেগে যায়। স্থায়ী পরিকল্পনা না থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হয় সামান্যই।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবীর বলেন, বাংলাদেশের নদীগুলো উজান থেকে নেমে এসেছে। উজানের পানি দ্রুত নামার সময় ভাঙন ঘটায়। বর্ষায় বেশি হয়, তবে শীতেও নদীভাঙন হয়। বরাদ্দ বাড়ানো হলে, মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী নদীতীর সংরক্ষণ, ড্রেজিং প্রভৃতি করা হলে স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধ করা সম্ভব। তিনি আরো জানান, গত বছর সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল, সরকার বরাদ্দ দিয়েছে তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পাউবো সূত্র জানায়, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ার এ চিত্র নতুন নয়। প্রতিবছর ভাঙন রোধসহ আনুষঙ্গিক কর্মকাণ্ডের জন্য যে পরিমাণ অর্থের চাহিদা উপস্থাপন করা হয়, এর বিপরীতে বরাদ্দ মেলে কম। ফলে ভাঙনের হুমকিতে থাকা বিস্তৃত জনপদ, ফসলি জমি, বন্দর, যোগাযোগ অবকাঠামো ইত্যাদি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পাউবো সূত্র জানায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দুই হাজার ৬৫৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকার চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া যায় মাত্র ৩৬৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছরে দুই হাজার ১৩৪ কোটি ৩২ লাখ টাকার বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ৩১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আর ২০১০-১১ অর্থবছরে এক হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৩০৫ কোটি দুই লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাযথ পরিকল্পনা ও বরাদ্দ কম থাকায় ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না, পুরনো প্রকল্পগুলোও রক্ষণাবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় নদীভাঙনজনিত ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

বাংলাদেশে ছোট-বড় প্রায় ৩১০টি নদনদী রয়েছে। এসবের প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ তীর এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকে সব সময়। প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কিলোমিটার এলাকায় বেড়িবাঁধ রয়েছে। কিন্তু সেসব ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। ফলে বর্ষা মৌসুমে অনেক স্থানে বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

পাউবোর মনিটরিং সেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ১৩০টি স্থানে নদীভাঙনের ঘটনা ঘটছে। দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভাঙনপ্রবণ নদী যমুনা। অন্য নদনদীর মধ্যে মেঘনা, পদ্মা, তিস্তা, ধরলা, আত্রাই, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, কুশিয়ারা, খোয়াই, সুরমা, মনু, জুরি, সাঙ্গু, গোমতী, মাতামুহুরি, মধুমতি, সন্ধ্যা, বিষখালীও যথেষ্ট ভাঙনপ্রবণ।

মনিটরিং সেল সূত্র জানায়, প্রতিবছর সারা দেশে গড়ে ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার এলাকা নদীভাঙনের শিকার হয়। আকস্মিক ভাঙন ঠেকাতে মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা, পাওয়া গেছে মাত্র ৩০০ কোটি।

পাউবোর চিফ মনিটরিং অফিসার মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, এ বছর বর্ষার শুরু থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে ১৬২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব মেরামত করতে লাগবে ৩৩৪ কোটি টাকা।

তবে সূত্র জানায়, গত অর্থবছরে ভোলায় নদীভাঙন রোধে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটি বাস্তবায়িত হলে ভোলায় ভাঙন চিরতরে বন্ধ হবে।

পাউবোর সিরাজগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, জেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে প্রমত্তা যমুনা। তীরবর্তী প্রায় ২৬ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। পাউবো দুই দফায় ১৬ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বাকি ১০ কিলোমিটার এলাকার বসতিগুলো ঝুঁকিতেই রয়েই গেছে।

পাউবোর সাবেক মহাপরিচালক আব্দুর রউফ বলেন, তিনি চাকরিতে থাকার সময় যমুনার ভাঙন রোধে ১৮০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের প্রকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এখনো সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। তা বাস্তবায়িত হলে রংপুরের কাউনিয়া থেকে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ হয়ে পাবনা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা যেত। প্রতিবছর সরকারের শত শত কোটি টাকা খরচ হয়; কিন্তু সেভাবে নদীভাঙন রোধ হয় না। কারণ মাস্টারপ্ল্যান নেই।

পাউবো সূত্র জানায়, প্রতিবছর বিভিন্ন জেলায় কয়েক শ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে চলে যায়। জমিজমা সহায়-সম্পদ হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব হয়। তারা মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মায় পানি বাড়ায় শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়। কুণ্ডেরচরের খেজুরতলা-খালাসীকান্দির প্রায় এক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং মসজিদ-মাদ্রাসা, হাট-বাজার, স্কুলসহ বহু প্রতিষ্ঠান পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়।

পানি বিষেশজ্ঞরা বলছেন, দেশে দারিদ্র্যের একটি বড় কারণ নদীভাঙন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদীভাঙনের কারণে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং বিপদাপন্ন লোকের সংখ্যা আকস্মিকভাবে বেড়েছে। সর্বস্বান্ত মানুষ নতুন আশ্রয়ের খোঁজে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছুটছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ লোক প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের শিকার হয়। বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি ডলার। প্রায় তিন লাখ পরিবার গৃহহীন হয়। তারা খোলা আকাশের নিচে, পথের পাশে, বাঁধে, শহরের রাস্তার ফুটপাতে, সরকারের খাসজমিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

পাউবো সূত্র জানায়, ক্রমাগত নদীভাঙনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বাড়ছে ভূমিহীনের সংখ্যা। এ পর্যন্ত সারা দেশে নদীভাঙনের কারণে ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৩৮ লাখ ছাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষকে বাড়ি তৈরির জন্য ভূমি বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়। এত খাসজমি সরকারের হাতে নেই। এ জন্য নদীভাঙন রোধ করাই উত্তম পন্থা। সে জন্য জরুরি মাস্টারপ্ল্যান।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানিসম্পদ বিভাগের প্রধান ড. আতাউর রহমান বলেন, এখনই নদীভাঙন থেকে দেশকে রক্ষার মহাপরিকল্পনা নিতে হবে। এ জন্য বিদেশি সাহায্য নিলেও লাভবান হবে বাংলাদেশ।

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী ড. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘নদীগুলোর তীরকে যদি বেঁধে ফেলা যেত তবে নদীভাঙনের হাত থেকে আমরা মুক্তি পেতাম। কিন্তু এ জন্য যে অর্থ দরকার তা আমাদের নেই। নদীভাঙন রোধে মহাপরিকল্পনা নেই। তবে সরকার চাইলে সংশ্লিষ্টরা অবশ্যই এগিয়ে আসবে। ’


মন্তব্য