kalerkantho


বাংলাদেশে গণহত্যা সরকার উৎখাত ও হত্যার দায় কিসিঞ্জারেরও

মেহেদী হাসান   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশে গণহত্যা  সরকার উৎখাত ও হত্যার দায় কিসিঞ্জারেরও

হেনরি কিসিঞ্জার যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক পররাষ্ট্রমন্ত্রী—গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে দলীয় নির্বাচনী বিতর্কে একজন প্রার্থী এ মন্তব্য করেন। তিনি সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, গণহত্যা ও সামরিক আগ্রাসনকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া এবং তা বাস্তবায়নে সহযোগিতার মতো বিতর্কিত ও কলঙ্কিত ইতিহাসের জনক। একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যায় পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্রগুলো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র কনস্যুলেট ও ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়া শাখার কর্মকর্তাদের আপত্তি সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। আর এ নীতির মুখ্য কারিগর ছিলেন তত্কালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তী সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে আসা হেনরি কিসিঞ্জার। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনে গত ১১ফেব্রুয়ারি ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী বিতর্কে হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে নিজের পার্থক্য বোঝাতে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, ‘এটি বরং আমার কাছে আশ্চর্য হওয়ার বিষয়। কারণ কিসিঞ্জার (হেনরি কিসিঞ্জার) এ দেশের (যুক্তরাষ্ট্রের) আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন বলেই আমি বিশ্বাস করে এসেছি। আমি গর্বের সঙ্গে বলব, কিসিঞ্জার আমার বন্ধু নন। তাঁর কাছ থেকে আমি পরামর্শ নেব না। ’

কিসিঞ্জারের সঙ্গে হিলারির (২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) সখ্য নতুন নয়। হিলারি নিজেও পররাষ্ট্র ও কৌশলগত বিষয়ে কিসিঞ্জারের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার কথা স্বীকার করে থাকেন। হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে কিসিঞ্জারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও পরামর্শসংশ্লিষ্ট ই-মেইলও গত ৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে।

বার্নি স্যান্ডার্স সেদিনের বিতর্কে কিসিঞ্জারের সমালোচনা করতে গিয়ে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের উদাহরণ দিয়েছেন। আলাদাভাবে বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করেননি তিনি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাধীন যেসব গণমাধ্যমে বার্নি স্যান্ডার্সের সেই বক্তব্যের বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোতে বাংলাদেশে গণহত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনায় কিসিঞ্জারের দায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গত সপ্তাহে যুদ্ধাপরাধের দায়ে বসনীয় সার্ব নেতা রাদোভান কারাদিচের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ গঠিত আদালতের রায়ের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের অপরাধ করা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদেরও বিচারের দাবি উঠছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্কার ও নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে যুদ্ধ, গণমাধ্যম ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক নিয়মিত লেখক পিটার মাস নিউ ইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইন্টারসেপ্টে গত ২৪ মার্চ প্রকাশিত ‘হোয়াট দ্য গিল্টি ভার্ডিক্ট অব রাদোভান কারাদিচ টেলস আস অ্যাবাউট ওয়ার ক্রাইমস আফটার ওয়ান/ইলেভেন’ শীর্ষক নিবন্ধে যুদ্ধ আইন ভাঙা এবং অপরাধ করা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের দায়মুক্তির ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। আর সেখানে তিনি যৌক্তিকভাবেই হেনরি কিসিঞ্জারের প্রসঙ্গ টেনেছেন।

পিটার মাস লিখেছেন, ‘আজ হেনরি কিসিঞ্জার মূলধারার রাজনীতিক এবং সাংবাদিকদের সঙ্গ ও তোষামোদ পেয়ে থাকেন। অথচ অর্ধ শতক আগে তাঁর (কিসিঞ্জারের) কথা ও ইঙ্গিতে কিভাবে বাংলাদেশ, আর্জেন্টিনা ও কম্বোডিয়ার কবরগুলো পূর্ণ হয়েছিল তা আমরা এখনো জানছি। ’

কিসিঞ্জারের বয়স এখন প্রায় ৯৩ বছর। যুক্তরাষ্ট্রে খুব সম্মান নিয়ে থাকা এ ব্যক্তিও অতীত অপরাধের দায়ে ভবিষ্যতে কোনো একদিন বিচারের মুখোমুখি হয়ে অপমানিত হবেন বলে আশা পিটার মাসের। অন্তত নব্বইয়ের দশকের অপরাধের জন্য ২০১৬ সালে কারাদিচের বিচার তাঁকে এ বিষয়ে আশাবাদী করে তুলেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত হেনরি কিসিঞ্জার সাম্প্রতিক সময়ে নিজ দেশেই বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন। গত বছর জানুয়ারি মাসে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে উষ্ণ অভ্যর্থনার বদলে বিক্ষোভ দেখতে হয়েছে তাঁকে। বিক্ষোভকারীরা কিসিঞ্জারকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ ও ‘কসাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁর গ্রেপ্তার দাবি করে।

ইয়াহিয়ার বিচক্ষণতার প্রশংসা করেছিলেন কিসিঞ্জার : যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণকারী (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক) সাংবাদিক ও সমালোচক ক্রিস্টোফার হিচেন্স ২০০১ সালে ‘দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’ (হেনরি কিসিঞ্জারের বিচার) গ্রন্থে কিসিঞ্জারের বিরুদ্ধে ইন্দোচায়না, বাংলাদেশ, চিলি, সাইপ্রাস ও পূর্ব তিমুরে ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, সরকার উত্খাত ও রাজনীতিক হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনেন। হিচেন্সের মতে, হত্যা, অপহরণ ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্রসহ যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ প্রচলিত, প্রথাগত ও আন্তর্জাতিক আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য কিসিঞ্জারের বিচার হওয়া উচিত। কিসিঞ্জারকে তিনি ‘কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী’ ও ‘বিস্ময়কর মিথ্যাবাদী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ওই গ্রন্থের ভিত্তিতে ২০০২ সালে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি হয়। এটিও যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে বহুল আলোচিত। ক্রিস্টোফার হিচেন্সের ‘হেনরি কিসিঞ্জারের বিচার’ গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়টি বাংলাদেশ নিয়ে, যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ : একটি গণহত্যা, একটি ক্যু ও একটি হত্যা’।

ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে হিচেন্স লিখেছেন, ১৯১৫ সালে তুরস্ক থেকে তত্কালীন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হেনরি মর্গেনথাও সংখ্যালঘু আর্মেনীয়দের নিধনযজ্ঞের যে বিবরণ পাঠিয়েছিলেন, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট থেকে পাঠানো গণহত্যার বিবরণ ছিল তার চেয়েও ভয়াবহ। যুক্তরাষ্ট্র কনস্যুলেট তার রেডিও ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে ওই হত্যাযজ্ঞের সরাসরি বিবরণ পেয়েছিল। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র কনসু্যুলেটের কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড নিজেই সরাসরি ওয়াশিংটনে তার বিবরণ পাঠিয়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশিদের ওপর যেসব অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছিল সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রেরই সরবরাহ করা।

সে সময় পশ্চিমা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলোতেও গণহত্যার চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। তবু যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন প্রশাসন ছিল তখন পাকিস্তানের পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র দমন ও নৃশংসতার নিন্দা না জানাতে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে আর্চার ব্লাড যে বার্তাটি ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন এর প্রতি সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক দলের ২০ সদস্যের সবাই এবং ওয়াশিংটনে পৌঁছার পর যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সবাই তাতে স্বাক্ষর করেছিলেন।

সে সময় ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিংও নিক্সন প্রশাসনের নীতির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ওয়াশিংটনে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। নিক্সন ও কিসিঞ্জার দ্রুত আর্চার ব্লাডকে তাঁর পদ থেকে প্রত্যাহার করেন। রাষ্ট্রদূত কিটিং ‘ভারতের ভক্ত হয়ে গেছেন’ বলে মন্তব্য করেন নিক্সন। ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে যখন বাংলাদেশে গণহত্যা চলছে তখন কিসিঞ্জার জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে পাঠানো এক বার্তায় তাঁর ‘বিচক্ষণতা ও কৌশলে’র জন্য ধন্যবাদ জানান।

বাংলাদেশে যখন যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ চলছে তখন কিসিঞ্জার ও নিক্সন পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্রে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশে নির্বিচার গণহত্যা চালাচ্ছে জেনেও ওয়াশিংটন তখন ইসলামাবাদের পক্ষে ছিল। এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা ছিল জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কিসিঞ্জারের।

১৯৭৪ সালে মুখরক্ষার এক সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কিসিঞ্জার ঢাকায় আট ঘণ্টার যাত্রাবিরতি করেন। সে সময় তিনি তাঁর অতি সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে ১৯৭১ সালে বঙ্গোপসাগরে যুদ্ধজাহাজ এন্টারপ্রাইজ কেন পাঠিয়েছিলেন সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

হিচেন্স লিখেছেন, ‘আমরা এখন জানি, তাঁর (কিসিঞ্জারের) সফরের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের একটি দল বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের একটি দলের সঙ্গে মুজিবকে উত্খাতের পরিকল্পনা করছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট (১৪ আগস্ট দিবাগত রাতে) মুজিব ও তাঁর পরিবারের ৪০ জন সদস্যকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। এরপর কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর (শেখ মুজিব) ঘনিষ্ঠতম রাজনৈতিক সহযোগীদের কারাপ্রকোষ্ঠে হত্যা করা হয়। ’

মুজিব হত্যার খবরের জন্য কিসিঞ্জারের অপেক্ষা করার তথ্য-প্রমাণ এখন পাওয়া যায়।

অবমুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের নথিতেও বিতর্কিত কিসিঞ্জার : যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দপ্তরের অবমুক্ত করা নথিগুলোতেও হেনরি কিসিঞ্জারের বিতর্কিত ভূমিকার প্রমাণ রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশিদের ওপর গণহত্যার সময় পাকিস্তানকে অবৈধভাবে অস্ত্র দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন করেছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কিসিঞ্জার ও প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন।

বাংলাদেশে গণহত্যার বিষয়ে নীরব থাকার নীতি অনুসরণ করে তাঁরা পাকিস্তানকে সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। গণহত্যার মধ্যেও পাকিস্তানি একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনায় নিক্সন জেনারেল ইয়াহিয়াকে তাঁর একজন ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি আরো বলেন, ইয়াহিয়াকে কী সিদ্ধান্ত নিতে হবে তা তিনি ধারণা করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র ইয়াহিয়ার জন্য বিব্রতকর কিছু করবে না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ নিয়ে জাতিসংঘে আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে পরামর্শ করে বরাবরই পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে শুধু ‘আগ্রাসনকারী’ হিসেবেই অভিহিত করেনি, বঙ্গোপসাগরে পারমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন ইউএসএস এন্টারপ্রাইজও পাঠিয়েছিল।

চীনকে ভারতীয়দের ওপর হামলা চালাতে উৎসাহ দেন কিসিঞ্জার : ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে ভারতীয় কর্মকর্তাদের কিসিঞ্জার বলেন, যেকোনো প্রেক্ষাপটে চীনের চাপের বিরুদ্ধে ভারতকেই সমর্থন দেবে যুক্তরাষ্ট্র। ওই মাসেই আরেক বৈঠকে কিসিঞ্জার বলেন, চীনের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই ভারতের বিরোধিতা করবে।

তবে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের শেষ দিকে জাতিসংঘে চীনা রাষ্ট্রদূত হুয়ায় হা’র সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে কিসিঞ্জার চীনকে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য উৎসাহ দেন।  

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগেই বিদেশ ভ্রমণে খুবই সতর্ক : ১৯৭০-এর দশকে চিলিতে আগুস্তো পিনোশের সামরিক শাসনের সময় পাঁচ ফরাসি নাগরিক গুম হওয়া-সংক্রান্ত এক মামলায় ২০০১ সালে হেনরি কিসিঞ্জারকে তলব করেন ফরাসি এক বিচারক। ব্যক্তিগত এক সফরে কিসিঞ্জার তখন প্যারিসে। তিনি যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন সেখানে তাঁর সমনও পৌঁছে যায়। কিন্তু তাঁকে রক্ষায় এগিয়ে আসে ফ্রান্সের যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস। তারা তখন ফ্রান্সের বিচার বিভাগকে বলেছিল, কিসিঞ্জারের ব্যস্ততা আছে। তাই তিনি আদালতে হাজির হতে পারবেন না। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ওই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রান্সের আদালতে হাজির হতে বাধ্য নন।

সমন পাওয়ার পরপরই দ্রুত কড়া পাহারার মধ্যে ফ্রান্স ছেড়ে গিয়েছিলেন কিসিঞ্জার। স্পেন ও বেলজিয়ামেও তাঁর নামে সমন রয়েছে। চিলির একটি আদালত ১৯৭৩ সালে সরকার উত্খাতের ঘটনায় কিসিঞ্জারকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চেয়েছিল। কিন্তু এসবের কোনোটিতেই সাড়া দেননি তিনি। বিভিন্ন দেশের আদালতের চাপ ও গণবিক্ষোভের হুমকির মুখে পূর্বপরিকল্পনা সত্ত্বেও ২০০২ সালের মার্চে কিসিঞ্জার তাঁর ব্রাজিল সফর বাতিল করতে বাধ্য হন। সে সময় থেকেই তিনি বিদেশ সফর পরিকল্পনার বিষয়ে খুবই সতর্ক। যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যার বিষয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন, এমন দেশে তিনি যান না।

এই হেনরি কিসিঞ্জারই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর ওই পর্যবেক্ষণকে এখন ভুল বলেই স্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাব্লিউ মজিনা অকপটে স্বীকার করেছেন, কিসিঞ্জারের ওই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ মন্তব্য পুরোপুরি ভুল ছিল।


মন্তব্য