kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


হেমায়েত বাহিনী ছিল হানাদারদের জন্য আতঙ্ক

আজিজুল পারভেজ ও প্রসূন মণ্ডল, গোপালগঞ্জ   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



হেমায়েত বাহিনী ছিল হানাদারদের জন্য আতঙ্ক

এক দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধার নাম হেমায়েত উদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধকালে নিজেই গড়ে তুলেছিলেন একটি দুর্ধর্ষ বাহিনী।

তাঁর নামে গড়ে ওঠা বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে থেকেই লড়াই করেছে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে। বিশাল এই আঞ্চলিক বাহিনী শত্রুপক্ষের জন্য আতঙ্কে পরিণত হয়েছিল। এই বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্র বিস্তৃত ছিল তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর ও বরিশালের উত্তরাঞ্চল জুড়ে।

হেমায়েত উদ্দিন ছিলেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন হাবিলদার। ২৫ মার্চের কালো রাতে হানাদার বাহিনী যখন বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন তিনি জয়দেবপুর ছাউনিতে ছিলেন। তিনি কয়েকজন বিদ্রোহী সঙ্গী ও অস্ত্র নিয়ে ফরিদপুরের পথে যাত্রা করেন। যাত্রাপথে তাঁকে বেশ কয়েক জায়গায় হানাদার বাহিনীকে মোকাবিলা করতে হয়। কয়েকজন যোদ্ধাকেও হারান। অবশেষে সঙ্গীদের নিয়ে তিনি প্রথমে ফরিদপুর ও পরে ২৮ এপ্রিল নিজ গ্রাম গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার টুপুরিয়ায় পৌঁছান। এরপর গড়ে তোলেন বিশাল এক বাহিনী।

দেশের অভ্যন্তরেই গড়ে ওঠা এ বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া অস্ত্র দিয়েই পাকিস্তানি শত্রুর মোকাবিলা করে। কোটালীপাড়া থানা দখল করার পর ৯ মে কোটালীপাড়ার জহরেরকান্দি হাই স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে ৩৫২ জন তরুণ-যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

জহরেরকান্দি ট্রেনিং সেন্টারের প্রধান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ওয়ারেন্ট অফিসার জোবেদ আলী শেখ ও চিফ ইন্সপেক্টর ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার কোরের আবদুল খালেক। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ছিলেন ২৫ জন ওস্তাদ। তাঁরা সবাই ছিলেন বাঙালি আর্মি, প্রাক্তন ইপিআর ও পুলিশ সদস্য।

হেমায়েত বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে আমার বাহিনী বা আমি কখনো কোনো সাহায্যের জন্য ভারতে যাই নাই। অসংখ্য থানা, পাকিস্তানি আর্মি ও পুলিশের অস্ত্র লুট করেছি। মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে দীর্ঘ ৯টি মাস যুদ্ধ করেছি। অসংখ্যবার মরতে মরতে বেঁচে গেছি। ’

বৃহত্তর ফরিদপুরের রাজৈর, মাদারীপুর, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত বিল বাগিয়ায় প্রথম ঘাঁটি স্থাপন করে হেমায়েত বাহিনী। ১ মে গৌরনদীর বাড্ডা হাই স্কুলে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন হেমায়েত উদ্দিন। যে পতাকা আর কখনো সেখান থেকে নামেনি।

২৬ মে এক সফল অভিযানে বরিশালের গৌরনদী থানার বাটরা বাজার এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা এই বাহিনীতে যোগ দিতে থাকে। স্থান সংকুলানে অসুবিধা হওয়ায় পশ্চিম দিকে পয়সারহাটের উত্তরে রাজাপুর নামক গ্রামে তিনি সদর দপ্তর স্থাপন করেন। ১ জুন বরিশাল ও ফরিদপুরের এই অঞ্চলে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়।

বরিশালের উজিরপুর, গৌরনদী থানা, ফরিদপুরের কালকিনি, মাদারীপুর, রাজৈর, গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া, মুকসুদপুর, কাশিয়ানী এবং খুলনার মোল্লারহাট থানার অংশবিশেষ ছিল হেমায়েত বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত।

হেমায়েত উদ্দিনের দাবি, তাঁর বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার ৫৫৮ জন। তাদের মধ্যে ট্রেনিং দেওয়া সম্ভব হয়েছিল তিন হাজার ২০০ জনকে। নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ছিল ৩৪০ জন। দেড় হাজার গরিব মুক্তিযোদ্ধাকে মাসিক ৯৫ টাকা হিসেবে বেতনও দেওয়া হতো। ২৪ জন নারীকেও অস্ত্র চালনা শিক্ষা দেওয়া হয়। তাদের মধ্য থেকে দুজনকে অধিনায়ক করা হয়। তাঁরা হলেন আশালতা বৈদ্য ও প্রমিলা বিশ্বাস। তাঁদের বাড়ি ফরিদপুরের কোটালীপাড়ায়।

হেমায়েত বাহিনীর তত্ত্বাবধানে কোটালীপাড়া, নারকেলবাড়ীর চার্চ মিশনে একটি সংক্ষিপ্ত নার্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও খোলা হয়। সেখানে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি হাসপাতালও পরিচালনা করা হতো। হেমায়েত উদ্দিন রণাঙ্গনে আহত হওয়ার পর তাঁর চিকিত্সাও এই হাসপাতালে করা হয়।

হেমায়েত বাহিনী সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার স্বার্থে কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করা হয়। দায়িত্বে ছিলেন একেকজন গ্রুপ কমান্ডার। হেমায়েত দাবি করেন, তাঁর বাহিনী ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক অভিযান পরিচালনা করে। এর মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সফল অভিযান ছিল ১৮টি। এই বাহিনীর প্রথম অপারেশন ছিল ২৮ এপ্রিল কোটালীপাড়া থানা দখল অভিযান। এই অভিযানে পুলিশ আত্মসমর্পণ করে। ফলে বিপুল অস্ত্রও হস্তগত হয়। ৩ ডিসেম্বর মুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত মোট পাঁচবার এই থানায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।

হেমায়েত বাহিনীর একটি উল্লেখযোগ্য অপারেশন হলো পয়সারহাটের যুদ্ধ। ২০ মে সংঘটিত এই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী গানবোট ও তিনটি স্টিল বডির লঞ্চ নিয়ে আক্রমণ চালালে মুক্তিযোদ্ধারা সাহসিকতার সঙ্গে তা প্রতিহত করে। এই যুদ্ধের পর সাতলা, বাগদা, পয়সারহাটসহ প্রায় ২০ মাইল এলাকা হানাদারমুক্ত অঞ্চলে পরিণত হয়। এরপর ২৪ জুন বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাটের প্রায় আড়াই মাইল পূর্ব-দক্ষিণে এক দুঃসাহসী অভিযান চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর খুলনাগামী মালবাহী নৌবহর দখল করে নেয় এ বাহিনী।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য অভিযান হলো রামশীলের যুদ্ধ। ১৪ জুলাই পাকিস্তানি বাহিনীর তিনটি শক্তিশালী দল ব্যাপক ফায়ার কভারের সাহায্যে মাদারীপুর, টেকেরহাট হয়ে হেমায়েত বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। এদিন মাত্র ১৩ জন যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি বিশাল বাহিনীকে প্রতিহত করেন হেমায়েত উদ্দিন। প্রায় ৪৫ মিনিট গোলাগুলির পর শত্রু বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়। এই যুদ্ধে বাহিনী প্রধান হেমায়েত উদ্দিন গুরুতর আহত হন। চিকিত্সায় সুস্থ হয়ে তিনি আবার রণাঙ্গনে ফিরে আসেন।

কোটালীপাড়া থানা আক্রমণ, চাঁদেরহাট আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ, নাজিরপুর থানার মাটিভাঙ্গা লঞ্চ স্টেশনে পাকিস্তানি লঞ্চ আক্রমণ, গোপালগঞ্জ যুদ্ধ, ভাটিয়াপাড়া ওয়্যারলেস সেন্টার যুদ্ধ, গোপালগঞ্জের শিকিরবাজার মুক্তি ক্যাম্পে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলা প্রতিরোধ যুদ্ধ, শিকিরবাজারের অদূরে কুরপালা পাকিস্তানি ঘাঁটি আক্রমণ, চৌধুরীর হাটখোলা যুদ্ধ, শেখ বাড়ির যুদ্ধ—হেমায়েত বাহিনীর আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সফল অভিযান।

হেমায়েত বাহিনীর কাছে কোটালীপাড়া, বরিশালের গৌরনদী ও যশোরের কালিয়া থানায় পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

স্বাধীনতার পর হেমায়েত উদ্দিন তাঁর বাহিনী নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেন। বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার তাঁকে ‘বীরবিক্রম’ খেতাবে ভূষিত করে।


মন্তব্য