kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


লুডু বাহিনীর গোলাইডাঙ্গা অভিযান

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু মানিকগঞ্জ   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



লুডু বাহিনীর গোলাইডাঙ্গা অভিযান

গোলাইডাঙ্গার যুদ্ধ মানিকগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ওই যুদ্ধে লুঙ্গি-গামছাপরা তরুণ মুক্তিসেনাদের হাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ৮৩ জন সদস্য নিহত হয়েছিল।

অথচ কোনো মুক্তিযোদ্ধার গায়ে আঁচড়ও লাগেনি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এর খবর প্রচার করা হয়েছিল ফলাও করে।

গোলাইডাঙ্গা যুদ্ধের অবিশ্বাস্য বিজয়ের খবরে মানিকগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা আরো উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি বাহিনী, দালাল, রাজাকারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষের বুকে সঞ্চারিত হয় সাহস। মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর তাদের বিশ্বাস, আস্থা আরো পোক্ত হয়। ১৯৭১ সালের ২৯ অক্টোবর সংঘটিত হয়  মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দারুণ অনুপ্রেরণার ওই যুদ্ধ।

সিংগাইর উপজেলার গোলাইডাঙ্গা স্কুলে ছিল ‘লুডু বাহিনী’র (মুক্তিবাহিনীর অংশ) ক্যাম্প। রাজাকারদের মাধ্যমে ক্যাম্পের খবর চলে যায় পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে। ক্যাম্প আক্রমণ করতে উপজেলা সদর থেকে (তৎকালীন সিংগাইর থানা সদর) সাতটি ছইছাড়া নৌকা নিয়ে ধলেশ্বরীর শাখা নুরালী খাল হয়ে রওনা দেয় তারা। গুপ্তচর মারফত মুক্তিবাহিনী এ খবর পেয়ে যায়। সিদ্ধান্ত হয় পাল্টা আক্রমণের। তাদের কাছে ভারী অস্ত্র ছিল না। একজনের (লোকমান হোসেন) হাতে ছিল একটি বেটাগান, আরেকজনের (জাহিদুর রহমান) হাতে একটি স্টেনগান; বাকিদের হাতে ছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেল। ঠিক জায়গায় অ্যামবুশ করা, আচমকা আক্রমণ চালানো এবং পিছিয়ে আসা—এই তিন বিষয়ের সমন্বয় করে আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়।

পাকিস্তানি সেনাদের পৌঁছানোর আগেই মুক্তিযোদ্ধারা গোলাইডাঙ্গা কুমের (নদীর যে জায়গায় জলের ঘূর্ণি হয়) কাছে গিয়ে অবস্থান নেয়। সেখানে নুরালী খাল তিন শাখায় ভাগ হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাদের নৌকার বহরটি কুমের কাছে গিয়ে বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে চলে যায় গোলাইডাঙ্গা স্কুলের দিকে। অ্যামবুশ করা মুক্তিযোদ্ধারা তাদের যেতে দেখলেও আক্রমণের চেষ্টা করেনি। তাদের পরিকল্পনা ছিল ফেরার পথে আক্রমণ করবে। স্কুলের ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের না পেয়ে পাকিস্তানি সেনারা একই পথে ফিরতি যাত্রা করে। পরিকল্পনা মতো কুমের মাঝামাঝি আসামাত্র মুক্তিসেনারা তাদের ওপর আক্রমণ করে। এতে নিহত হয় ৮৩ হানাদার।

গোলাইডাঙ্গা যুদ্ধের অন্যতম যোদ্ধা লোকমান হোসেন ছিলেন ইপিআরের (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) সদস্য। ওই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তিনি ‘টাইগার লোকমান’ পরিচিতি পান। যুদ্ধের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের কমান্ডার তোবারক হোসেন লুডু সেদিন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁদের মধ্যে তিনি এবং আর দু-একজনের প্রশিক্ষণ ছিল; বাকিরা কৈশোর পেরোনো ছাত্র। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি নির্দেশ ছিল প্রথম গুলি ছুড়বেন তিনি। তিনি নদীতে গলা পর্যন্ত নেমে নলখাগড়ার আড়াল নিয়েছিলেন। বাকি সবাই আড়াল নিয়ে নদীর পাড়ে ছিল।

লোকমান হোসেন বলেন, হানাদার বাহিনীর নৌকাগুলোকে ফিরে আসতে দেখা গেল। সাতটি নৌকার একটি একটু পেছনে ছিল। তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন ওই নৌকাটির কাছে আসার। কিন্তু একজন মুক্তিসেনা উত্তেজনা সামাল দিতে না পেরে ফায়ার শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে অন্যরাও ফায়ার শুরু করেন। হতবিহ্বল পাকিস্তানি সেনারা প্রতিরোধ করার আগেই গুলিবিদ্ধ হয়ে অথবা পানিতে ডুবে মারা যায়। কিন্তু পেছনের নৌকাটির কয়েকজন সেনা নদীর ওপর পাড়ে নেমে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে শুরু করে। একটি গুলি তাঁর মাত্র দুই হাত কাছে দিয়ে চলে যায়। তিনি দ্রুত নদীর পাড়ে উঠে আড়াল নিয়ে শুরু করেন গুলিবর্ষণ। বেশ কিছুক্ষণ গুলি-পাল্টা গুলি চলার পর ওই পাকিস্তানি সেনারাও মারা যায়। মুক্তিযোদ্ধারা বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করে। কিছুক্ষণ পর পাকিস্তানি বাহিনীর একটি প্লেন এসে আকাশ থেকে গুলি ছুড়তে শুরু করলে মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।

লোকমান হোসেন বলেন, দুই দিন কি তিন দিন পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে গোলাইডাঙ্গা যুদ্ধের খবর প্রচারিত হয়। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এবং তিনি সরাসরি সে খবর শুনেছেন। খবরের কথাগুলো এখন হুবহু তাঁর মনে নেই। যতটুকু মনে আছে ততটুকু তিনি জানান। বলেন, খবরে বলা হয়েছিল, ‘মুক্তিবাহিনীর চিপা মাইরে গোলাইডাঙ্গার নদীর কাদায় গাইরা মরছে ৮৩ পাকি সেনা। মুক্তিসেনাদের গায়ে আঁচড়টি লাগেনি। ’

লোকমান হোসেন বলেন, গোলাইডাঙ্গার সফল অপারেশন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবর প্রচারের পর দলের সবাই আরো চাঙা হয়ে ওঠে। গ্রামের মানুষের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিশ্বাস আরো পোক্ত হয়। অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনাদের মনে এমন ভয় ঢুকে যায় যে তারা আগের মতো ক্যাম্প ছেড়ে বের হতো না। দালাল-রাজাকাররাও আগের মতো সাধারণ মানুষকে অত্যাচার করতে সাহস পেত না।

গোলাইডাঙ্গা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তোবারক হোসেন লুডু। তিনি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র ছিলেন; স্বাধীনতার পর পড়াশোনা শেষ করেন। এখন তিনি মানিকগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার। তিনি বলেন, ‘ওই যুদ্ধের পর পাকি মিলিটারিদের মনোবল ভেঙে যায়। তারা বুঝতে পারে, মুক্তিযোদ্ধারা অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তারাও পাল্টা আক্রমণ করার ক্ষমতা রাখে। ’ তিনি বলেন, গোলাইডাঙ্গা যুদ্ধের কয়েক দিন পর থানা পর্যায়ের ক্যাম্প গুটিয়ে নিতে থাকে পাকিস্তানি মিলিটারি। নভেম্বর মাসের মধ্যে মানিকগঞ্জের বেশির ভাগ অঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়। ১৩ ডিসেম্বর পুরোপুরি মুক্ত হয় মানিকগঞ্জ। সেদিন শহরে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন মুক্তিযোদ্ধারা।


মন্তব্য