kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আহত পাইলটকে উদ্ধার করেছিল ‘সজীব গ্রুপ’

কাজী হাফিজ   

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আহত পাইলটকে উদ্ধার করেছিল ‘সজীব গ্রুপ’

ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সচিত্র সাপ্তাহিক পত্রিকায় ‘দে সেভড এ পাইলট’ (তারা এক পাইলটকে রক্ষা করেছিল) শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি। ফ্লাইট লে. জেসি মালিকের ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে ডান হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা স্কোয়াড্রন লিডার কেডি মেহেরার  ছবিও ছাপা হয়।

বর্ণনা করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর সকালে ঢাকা বিমানবন্দর আক্রমণ করতে এসে কিভাবে কেডি মেহেরার হান্টার জেটটি

পাকিস্তানি স্যাবর জেটের পাল্টা আক্রমণে ঢাকার পার্শ্ববর্তী এক গ্রামে বিধ্বস্ত হয়, কিভাবে তিনি বিমান থেকে ইজেক্ট করেন (বেরিয়ে যান), শত্রু বাহিনীর মরিয়া তল্লাশি থেকে কারা তাঁকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতীয় বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেয়। সেই ঘটনার বিবরণ হয়তো এখন প্রতিবেশী দেশের সশস্ত্র বাহিনীর আর্কাইভে অজস্র দলিলের ভিড়ে চাপা পড়ে আছে। কেডি মেহেরা নিজেও ঘটনাটি কিভাবে মনে রেখেছেন তা সহজে জানার উপায় নেই। কিন্তু সাভারের মুশুরিখোলা তুলাতুলি গ্রামের হাসিনা আর তাঁর মেয়ে জোস্নার স্মৃতিতে তা এখনো অম্লান। আহত মেহেরাকে সেদিন তাঁরাই প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছিলেন। ক্ষতস্থানের চিকিৎসা হয়েছিল গাঁদা পাতার রসে আর হাতের ভাঙা হাড়ের চিকিৎসা হয়েছিল বাঁশের টুকরো দিয়ে সোজা করে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে।

সেদিনের সেই কিশোরী জোস্না এখন তার মুক্তিযোদ্ধা স্বামী হানিফের সঙ্গে সাভারের ফুলবাড়িয়ায় কবিরাজি কারবারে জড়িত।

ভারতীয় ওই পাইলটকে সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের যে দলটি ঢাকার মোহাম্মদপুরের অদূরে ভাকুর্তা বটতলী হাইমচর গ্রামের কাছ থেকে উদ্ধার করে হাসিনাদের আশ্রয়ে নিয়ে গিয়েছিল তারাও ভুলতে পারেনি ঘটনাটি। ওই দলের বেশির ভাগ যোদ্ধাই ছিল হাই স্কুলপড়ুয়া অথবা সদ্য স্কুল পেরোনো ছাত্র। তাদেরই একজন জহিরুদ্দিন জালাল, যিনি ‘বিচ্ছু জালাল’ নামেই বেশি পরিচিত। তিনি সেদিনের স্মৃতি হিসেবে তাঁর কাছে সংরক্ষিত রেখেছেন কেডি মেহেরার বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানটির একটি ফায়ারিং চাবি, ভিজিটিং কার্ড এবং তাদের দলনেতার কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে ১৯৭২ সালে কেডি মেহেরার লেখা একটি চিঠি।

পুলিশ সুপারের ছেলে জহিরুদ্দিন জালাল একাত্তরে ছিলেন ঢাকার আজিমপুরের ওয়েস্ট অ্যান্ড হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার আগে ঢাকায় সার্কিট হাউসে বাবার সরকারি বাসায়ই থাকতেন। গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের তারাইলের রাউতি গ্রামে। তাঁদের দলনেতা সজীব ছিলেন পাশের গ্রাম পুরুরার ছেলে। অবশ্য সজীবও যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগে তাঁর অভিভাবকদের সঙ্গে ঢাকার আজিমপুর কলোনিতে থাকতেন। সজীবরা তিন ভাই-ই ভাসানী ন্যাপ করতেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বর্তমানে তিনি লন্ডন প্রবাসী। দলের আরেক সদস্য বারীও এখন সজীবের সঙ্গে লন্ডনে একই এলাকায় বসবাস করছেন। বারী যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগে ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’ ও ‘লালসালু’র সহ-প্রযোজক জাইবুল এনাম খানও সে সময় ছিলেন সজীব গ্রুপের গেরিলা। যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ছিলেন রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। ওই দলের সঙ্গে আরো ছিলেন শাহানেওয়াজ, বাহাউদ্দিন, হেলাল, খোকন, নয়ন, সাইফুল, এ জে এম রাহাগীর, লুৎফর ও আহমেদুর রহমান খোকা। তাঁদের মধ্যে আজিমপুর নিউ পল্টনের খোকন ছিলেন সবার ছোট। তিনি ছিলেন ওয়েস্ট অ্যান্ড হাই স্কুুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। জার্মানিতে স্থায়ী হয়েছেন। বাহাউদ্দিন ও হেলালও ওয়েস্ট অ্যান্ড হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তাঁদের একজন থাকেন ফ্রান্সে, অন্যজন ইংল্যান্ডে। নয়ন থাকেন রামপুরায় বাবার বাসায়। সাইফুল দীর্ঘদিন সৌদি আরবে কাটিয়ে এখন মিরপুর ২ নম্বরে একটি ফ্ল্যাট কিনে বসবাস করছেন। এ জে এম রাহাগীর পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতা। সে সময়ে ওয়েস্ট অ্যান্ড হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র লুৎফর থাকেন রামপুরায়। ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত। আহমেদুর রহমান খোকা মারা গেছেন। শাহনেওয়াজও মারা যান যুক্তরাষ্ট্রে।

জালাল জানান, ‘সজীব গ্রুপ’ নামে খ্যাত তাঁদের দলে ১৩ জন ছাড়াও পরে আরো অনেকে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে সুরকার ও সংগীতশিল্পী ইমতিয়াজ আহমেদ বুলবুল ও প্রয়াত নৃত্যশিল্পী আমীর হোসেন বাবু, সাভারের হানিফ ও মঞ্জু ছিলেন অন্যতম।

কেডি মেহেরার জীবন রক্ষা যেভাবে : ভারতীয় পাইলট কেডি মেহেরার জীবন রক্ষা প্রসঙ্গে জালাল বলেন, ‘‘আমাদের সে সময় হাইড আউট (লুকিয়ে থাকার স্থান) ছিল সাভার এলাকায়। ৪ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা বিমানবন্দরে ভারতীয় হান্টার জেটের আক্রমণ শুরু হয়। পাকিস্তানিদের পাল্টা আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্কোয়াড্রন লিডার কেডি মেহেরার জেটটি তখন নিচু দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চক্কর খাচ্ছিল। পতন নিশ্চিত ভেবে আমরা ওই দিকেই দৌড়াতে থাকি। পাইলট প্যারাশুট নিয়ে লাফ দিলেন। কিন্তু প্যারাশুট খুলল মাটির মাত্র কয়েক ফুট ওপরে। এ অবস্থায় একটি ক্ষেতে আছড়ে পড়েন তিনি। আর তাঁর বিমানটি ঘুরপাক খেতে খেতে বিধ্বস্ত হয় কেরানীগঞ্জের হজরতপুর গ্রামের চুনারচরে। আমরা পাইলটের কাছে পৌঁছানোর আগেই গ্রামবাসী তাঁকে ঘিরে ধরে। গ্রামবাসীর হাতে কোদাল, মই, কাস্তে দেখে পাইলট আতঙ্কিত। তিনি তাদের পাকিস্তানিদের সমর্থক ভেবে তখন আর্তস্বরে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিচ্ছিলেন। ফলে হিতে বিপরীত হয়। গ্রামবাসী তাঁকে হানাদার বাহিনীর পাইলট ভেবে মারধর শুরু করে। আমরা সেখানে পৌঁছলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। তার হাত তখন ভেঙে গেছে এবং কপাল দিয়ে রক্ত ঝরছে। মেহেরার কোমরে ছিল একটি ৩৮ বোরের রিভলবার। আমাদের হাতে অস্ত্র দেখে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিনে নেন এবং স্লোগান পাল্টে ‘জয় বাংলা’ বলে ওঠেন। আমরাও তাঁকে আশ্বস্ত করি। ওদিকে পাকিস্তানি ফাইটার বিমানগুলো তখন পাইলটের খোঁজে আকাশে চক্কর দিচ্ছে। আরো একটি ভারতীয় জঙ্গি বিমান ওই দিন বিধ্বস্ত হয় এবং ওই বিমানের পাইলট ধরা পড়ে। তাঁকে পাকিস্তানিরা টেলিভিশনে দেখায়। আমরা পরিস্থিতি বুঝে পাইলটকে দ্রুত একটি আখ ক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে ফেলি। তার পকেটে ছিল একটি মানচিত্র, বাংলাদেশের পতাকা, মানিব্যাগ, পরিচয়পত্র, স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের ছবি এবং লাল রঙের একটি ফায়ারিং চাবি। আমাদের তখন আশঙ্কা ওই পাইলটের খোঁজে পাকিস্তানি হানাদাররা হেলিকপ্টারে করে যেকোনো সময় কমান্ডো বাহিনী নামাতে পারে। অথবা স্পিডবোটে করেও তারা আসতে পারে। আমরা পাইলটকে লুঙ্গি পরিয়ে মাথায় গামছা পেঁচিয়ে পুরোপুরি গ্রামবাংলার কৃষক বানিয়ে ফেলি। এরই মাঝে খবর এলো আরিচা রোড হয়ে সাদুরচরের ওপর দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী আসছে। আমরাও পজিশন নিলাম। ভারতীয় ওই পাইলটকে হাতের মুঠোয় পেতে শত্রু বাহিনীর অভিযানে বাধা হয়ে দাঁড়াল তাদের জন্য পারাপার অযোগ্য একটি শীর্ণ নদী (মরা বুড়িগঙ্গা) আর নদীর এপারে আমাদের সজীব গ্রুপের যোদ্ধারা। ওদিকে আকাশে নতুন করে শুরু হয় ডগ ফাইট। পাকিস্তান আর্মিরাও ভারতীয় ফাইটারগুলোকে লক্ষ্য করে অবিরাম গুলি ছুড়ছে। আমরাও পাকিস্তানি বাহিনীকে লক্ষ্য করে সতর্কভাবে গুলি ছুড়তে থাকি। একপর্যায়ে তারা নদীর ওপার থেকে পজিশন উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এরপর আহত পাইলটকে আমরা নিয়ে যাই তুলাতুলি গ্রামের হাসিনাদের বাড়িতে। ওই বাড়িতেই তখন আমাদের ক্যাম্প। প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন হাসিনা ও তার কিশোরী মেয়ে জোস্না। পরদিন বারী অনেক চেষ্টার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রথমবর্ষের ছাত্র ইকবালকে নিয়ে আসে। ”

তুলাতুলি গ্রাম থেকে ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লার চান্দিনায় ভারতীয় বাহিনীর কাছে কেডি মেহরাকে পৌঁছে দেওয়ার পথে নানা ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনারও বর্ণনা দেন জালাল। তিনি বলেন, ‘‘তাকে ছদ্মবেশে নিয়ে নদীপথে গজারিয়ার রসুলপুর গ্রামের রেনু রাইস মিলে উঠি। তখন শাহাদত ভাই (প্রয়াত সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী) ও আলম ভাইয়ের (হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক) সঙ্গে দেখা হয়। তাঁরা নদীপথে তাঁকে আগরতলায় নেওয়া উচিত হবে না বলে পরামর্শ দেন। বলেন, নদীপথে হানাদার বাহিনী মুভ করেছে। কিন্তু আমাদের কমান্ডার সজীব তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন না। পরে চাঁদপুরের কাছে কালীকাপুর গ্রামের পাশ দিয়ে নৌকায় যাওয়ার সময় বিপদে পড়ি। পাকিস্তানিদের তিনটি স্পিডবোট এগিয়ে আসে আমাদের দিকে। স্পিডবোটের ঢেউ এসে লাগে আমাদের ছোট্ট ছানি নৌকায়। কেডি মেহেরা আমাদেরকে বলতে থাকেন, ‘আর গোলাগুলি নয়। আমি আত্মসমর্পণে রাজি। ’ মেহেরার ওই মনোভাবের কারণে আমরা তাঁর রিভলবারটি তাঁকে দিয়ে দিই। সেই সঙ্গে একটি সাদা গেঞ্জি। বলি, আপনার ইচ্ছে হলে আপনি এই গেঞ্জি উড়িয়ে আপনার আত্মসমর্পণের ইচ্ছার কথা জানাতে পারেন। কিন্তু আমরা লড়ব। এরকম একটি মুহূর্তে হঠাৎ স্পিডবোটগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে যায় কয়েকটি ভারতীয় জেট। তা দেখে মেহেরা আনন্দে বলে ওঠেন, ‘দিজ আর মাই বয়েজ। ওরা এসে গেছে। ওরা পাকিস্তানিদের বোট দেখে গেল। এখনই ওই বোটগুলোয় আঘাত হানবে ওরা। ’ ঘটলও তাই। ভারতীয়দের ওই আক্রমণে সেখানে অন্যান্য সঙ্গীসহ নিহত হয় পাকিস্তানিদের থার্ড কমান্ডো ব্যাটালিয়নের মেজর বিল্লাল। এই মেজর বিল্লালই একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। এরপর আমরা মেঘনা নদী পার হয়ে ভাটারচর, বদরপুর, গজারিয়া, বাতাকান্দি, নাগরচর, আসমানি বাজার, বাখরাবাদ দাউদকান্দি হয়ে চান্দিনায় পৌঁছি। নৌকা থেকে নেমে কিছুটা যেতেই দেখি মিত্র বাহিনীর একটি জিপ। হাঁফ ছাড়লাম। অবশেষে জীবিত ফিরিয়ে দিতে পারলাম কেডি মেহেরাকে। ”


মন্তব্য