kalerkantho


জীবন বদলে গেছে অজপাড়াগাঁয়েও

রাজীব আহমেদ   

৪ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০



জীবন বদলে গেছে অজপাড়াগাঁয়েও

চার দশক আগের বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য অনেক। দেশ বদলেছে, জীবন বদলেছে।

সেই বদলের ছোঁয়া লেগেছে গ্রামীণ জীবনেও। সত্তরের দশকে অজপাড়াগাঁ বলতে যা বোঝাত, তা এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন। দুর্গম গ্রামও এখন পাকা সড়ক দিয়ে সংযুক্ত হয়েছে শহরের সঙ্গে। যে গ্রামে আগে কুপিও জ্বলত না সব ঘরে, এখন সেখানে হয় পল্লীবিদ্যুত্ নয়তো সৌর বিদ্যুতের আলো ঝলমল করে। যে গ্রামে ডাকে চিঠি পৌঁছাতে মাস লেগে যেত, সেই গ্রামেও আছে এখন মোবাইল ফোনের কাভারেজ।

গ্রামে এখনো দারিদ্র্য আছে, কিন্তু না খেয়ে থাকা মানুষ আর নেই। এখনো আঁতুড়ঘরে সদ্যোজাত শিশু শেষ চিৎকার দিয়ে চির বিদায় নেয়, কিন্তু সংখ্যায় অনেক কম। গ্রামের শিশুদের এখনো লাঙল ধরতে হয়, তবে বিদ্যালয় থেকে ফিরে। রোগ-শোক-জরা আছে, সেই সঙ্গে আছে চিকিৎসার ব্যবস্থাও।

জীবন বদলানোর আশায় এখনো শহরে যায় গ্রামের বহু তরুণ-তরুণী, তবে সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন এখন গ্রামে থেকেও দেখা যায়। শুধু নৌকাবাইচ আর হাডুডু নয়, গ্রামের ছেলেটি এখন লা লিগার বার্সেলোনা বনাম রিয়াল মাদ্রিদ ম্যাচেরও খবর রাখে।

বদল এসেছে গ্রামীণ অবকাঠামোতে, খাদ্যের প্রাপ্যতায়, জীবনযাত্রার মানে, যোগাযোগব্যবস্থায়, শিক্ষায় ও স্বাস্থ্যে। কুঁড়েঘরের জায়গায় এসেছে টিনের ঘর। প্রায় প্রতি বাড়িতেই আছে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার ব্যবস্থা। মহামারি বিদায় নিয়েছে। হাঁটা আর নৌকার বদলে মানুষ এখন যন্ত্রচালিত বাহনে চড়ে। শুধু ভাত আর ডাল নয়, পাতে সবজি-মাছ-মাংসও থাকে। এক বেলা নয়, বেশির ভাগ মানুষই এখন তিন বেলা ভরপেট খেয়েই বেঁচে থাকে। সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠায়। খুব কম পরিবারই বাল্যকালে কন্যাশিশুর বিয়ে দেয়।

চার দশকে সাম্প্রতিকতম পরিবর্তনটি এসেছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। কৃষির বাইরেও দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ৭১ শতাংশই এখন গ্রামে। শুধু কৃষিকাজ নয়, গ্রামের মানুষ এখন বহু পেশায় নিজেকে যুক্ত করে জীবন বদলে দিচ্ছে। প্রত্যন্ত গ্রামেও চলে গেছে ব্যাংকের সেবা। উদ্যোক্তা হয়ে উঠছে গ্রামের তরুণ-তরুণীরাও।

অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ গত বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, গ্রাম মানেই এখন আর কৃষিকাজ নয়। গ্রামীণ খাতে উন্নয়ন হচ্ছে। কৃষিবহির্ভূত কাজ গ্রাম থেকে শহরে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং ধীরে ধীরে তা বাড়ছে। তিনি বলেন, গ্রামীণ পরিবারগুলো শুধু কৃষি নয়, নানা ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত। এটা আগে ছিল না, এখন হচ্ছে। গ্রাম-শহরের অর্থনৈতিক বিভাজন অনেক কমে গেছে।

বাংলাদেশের প্রথম খানা আয়-ব্যয় জরিপ হয়েছিল ১৯৭৩-৭৪ সালে। ওই জরিপে দেখা যায়, তখন গ্রামের একেকটি খানার (পরিবার) মাসিক গড় আয় ছিল ৪৬৪ টাকা। ২০১০ সালের সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, সেই গড় আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬৪৮ টাকায়। তখন একটি পরিবার যে আয় করত, এখন তার ২১ গুণ বেশি আয় করে। সেই আয় দিয়ে মানুষ এখন শুধু তার খাদ্য চাহিদাই নয়, অন্য অনেক চাহিদাও পূরণ করছে।

খাদ্য গ্রহণেও এসেছে বৈচিত্র্য। তখন গ্রামের মানুষের খাবার বলতে ছিল ভাত আর ডাল। মাছ, মাংস, ডিম জুটত খুব কম। ১৯৭৩-৭৪ সালে গ্রামের একজন মানুষ দিনে গড়ে মাত্র ৪.৯৩ গ্রাম মাংস খেতে পারত। ডিম খেতে পারত ১.১৬ গ্রাম। এখন সেটা বেড়ে মাংস ১৪.৭ ও ডিম ৫.৮ গ্রাম হয়েছে। মোট খাদ্য গ্রহণের হার দিনে ৬৭৮.৫৩ গ্রাম থেকে বেড়ে এক হাজার গ্রাম ছাড়িয়েছে। মাছ খাওয়ার হার ২৬ গ্রাম থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৬ গ্রাম।

১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে পরিবারগুলো খাদ্যের পেছনে ব্যয় করত তাদের মোট ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ। এ ছাড়া ৫.২৬ শতাংশ পোশাক ও পাদুকা, ৮ শতাংশ আলোর পেছনে ব্যয় করত। এখন খাদ্যের পেছনে ব্যয় ৫৯ শতাংশে নেমেছে। অন্যান্য খাতে বেশি ব্যয় করছে গ্রামের মানুষ। এর মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন রয়েছে। এমনকি গ্রামের মানুষের ব্যয়ের একটি বড় খাত এখন মোবাইল ফোন। গ্রাম থেকে কুঁড়েঘর বিদায় নেওয়ার পথে। বেশির ভাগ ঘরই এখন টিনের। এর পাশাপাশি কিছু কংক্রিটের ছাদওয়ালা বাড়িও গড়ে উঠেছে। খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১০ অনুযায়ী, গ্রামের ৮৬.৩৮ শতাংশ ঘরের ছাদই এখন টিনের তৈরি। ৩.৬৫ শতাংশ বাড়ির ছাদ কংক্রিটের। প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই আছে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা। গ্রামের মাত্র ৫.৭৩ শতাংশ মানুষকে এখন খোলা আকাশের নিচে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হয়। ৯৫ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছানো গেছে বিশুদ্ধ পানি।

সামগ্রিক অর্থনীতিতে গ্রামীণ অর্থনীতির ভূমিকা বেড়েছে। অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ অনুযায়ী, ২০০৩ সালে সামগ্রিক অকৃষিমূলক অর্থনীতির মধ্যে পল্লী এলাকার অবদান ছিল ৬২.৬১ শতাংশ। বর্তমানে এ হার বেড়ে হয়েছে ৭১.৪৮ শতাংশ।

গ্রামের অর্থনীতির পরিবর্তনটি চোখে পড়ে বাজারের কোনো মুদি দোকানে গেলেই। সেখানে এখন শুধু চাল, ডাল আর কেরোসিন তেলই নয়, বিক্রি হয় শ্যাম্পু, সুগন্ধি সাবানসহ প্রসাধন সামগ্রীও। গ্রামের মানুষ এখন আর কাঠকয়লা দিয়ে দাঁত মাজে না, মাজে টুথপেস্ট কিংবা নিদেনপক্ষে টুথ পাউডার দিয়ে। চিপস, পানীয়, ফ্রুট ড্রিংক—এমনকি মিনারেল ওয়াটারও পাওয়া যায় গ্রামের বাজারে। বাড়িতে বাড়িতে এখন মোটরসাইকেল। ১৩ কোটি মোবাইল ফোন গ্রাহকের বড় অংশ গ্রামের মানুষ। তাদের কেউ কেউ স্কাইপ ব্যবহার করতেও শিখে গেছে। বিদেশে থাকা স্বজনরা এখন আর টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করে নিজের গলার আওয়াজ পাঠায় না। গ্রামের অল্পশিক্ষিত অনেক তরুণ-তরুণীরও এখন ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট আছে। গ্রামের মানুষ এখন ইন্টারনেট ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বড় গ্রাহক। প্রায় এক কোটি কৃষকের আছে নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষ এখন বিদ্যুতের আওতায়। ৮০ লাখ পরিবার সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে সৌর বিদ্যুত্ ব্যবহার করে, যা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি। দেশে সৌর বিদ্যুত্ উত্পাদিত হয় ৩৩০ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের সঙ্গে গ্রামে গেছে টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটরসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সামগ্রীও।

গত চার দশকে কৃষিতে বিপ্লব এসেছে। ধান উত্পাদন বেড়েছে তিন গুণ, অন্যান্য ফসলের উত্পাদন বেড়েছে ব্যাপকভাবে। কৃষি এখন শুধু ধান-পাট আর ডালে সীমাবদ্ধ নেই। মাছ উত্পাদনে বাংলাদেশ চলে এসেছে শীর্ষ পাঁচে। গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে পোল্ট্রি খামার। মানুষ নিজের পালিত মুরগির চেয়ে বাজার থেকে কেনা ‘ব্রয়লার’ মুরগিই বেশি খায়। শুধু আম-কাঁঠাল নয়, গ্রামে এখন ফলে বাউকুল, স্ট্রবেরির মতো নতুন নতুন অনেক ফল। শুধু লাউ-কুমড়া নয়, গ্রামের কৃষক এখন ক্যাপসিকাম, গ্রীষ্মের টমেটো ফলানোর মতো নতুন নতুন কৃষি-প্রযুক্তি আয়ত্তে এনেছে। শুধু কাস্তে দিয়ে নয়, ধান কাটতে যন্ত্রের ব্যবহারও শুরু হয়েছে কৃষিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। পরিবর্তন এসেছে দারিদ্র্যের ধরনেও। না খেয়ে থাকা মানুষ এখন আর নেই বললেই চলে। উত্তরবঙ্গ থেকে মঙ্গাও বিদায় নিয়েছে। গ্রামে মানুষের পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। গ্রামের বাজারে এখন প্রক্রিয়াজাত ভোগ্যপণ্য পাওয়া যায়। অনেক গ্রামে ডিশ সংযোগ চলে গেছে। গ্রামে গ্রামে এখন রেফ্রিজারেটরের ব্যবহার শুরু হয়েছে। তিনি আরো বলেন, গ্রামে কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। এর পরও ভরা মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এর মানে হলো—তাদের এখন বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

গ্রামীণ অর্থনীতির এই পরিবর্তনের পেছনে রেমিট্যান্স, গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নতি, কৃষির বহুমুখীকরণ ও পোশাক খাতের মতো শ্রমনির্ভর খাত ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। এর পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ গ্রামে অর্থের প্রবাহ বাড়িয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘সার্বিকভাবে গ্রামীণ জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে যে জায়গায় আমরা যেতে চাই সেখানে যেতে অনেক কাজ করতে হবে। ’

 


মন্তব্য