kalerkantho


বিশেষ নিবন্ধ

উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জয় আজ আরো কঠিন

আলিসা আয়ার্স   

৫ এপ্রিল, ২০১৫ ০০:০০



উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জয় আজ আরো কঠিন

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ছুরিকাঘাতে আরো একজন 'নাস্তিক (এথিস্ট) ব্লগার'-এর মৃত্যু হলো ৩০ মার্চ। পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ব্লগারদের ওপর হামলা হলো এবং দুই বছরে ছুরিকাঘাতে নিহত ব্লগারের সংখ্যা বেড়ে তিনে দাঁড়াল।

ভাষা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অপরিহার্যতা থেকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম। দেশের ভেতরই এখন এ ধরনের উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটছে। এ থেকে বাংলাদেশের চেতনাবিরোধী ভয়ংকর ইসলামী অসহিষ্ণুতার আশঙ্কা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, যা উদার, মানবতাবাদী বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ভিন্নমতের মূল্যবোধ এবং মতপার্থক্যের সহাবস্থানের সুযোগ দিতে অসমর্থ দৃঢ় বিশ্বমতের মধ্যে নতুন এক ফ্রন্ট খুলবে।

ভাষা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অবস্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের কেন্দ্রে এবং এটি অনেক পুরনো। এ এমন এক দেশ যে তার ভাষা, সাহিত্য ও ভাবপূর্ণ ঐতিহ্যকে ভালোবাসে। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে রক্ত দিয়ে লড়েছে। জাতীয় রাজধানী থেকে হাজার মাইল দূরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতায় নিঃসন্দেহে ভূমিকা রেখেছিল রাজনীতিতে কম প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক অসাম্য ও দূরত্বজনিত সমস্যা। চার দশকেরও বেশি সময় পরে এখন সেই সংগ্রামের স্মৃতি মূলত প্রতীকীভাবে ভাষাকে কেন্দ্র করেই। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় শহীদদের স্মরণ করা হয়। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষাপ্রিয় জনগোষ্ঠীর ওপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তাঁরা নিহত হন।

'স্পিকিং লাইক অ্যা স্টেট' গ্রন্থে আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, পাকিস্তানের যে অংশটি পড়ে বাংলাদেশ হয়েছে তার ভাষা আন্দোলনকারীরা পশ্চিম পাকিস্তানের চাপিয়ে দেওয়া বিভেদ সৃষ্টিকারী ধারণা- বাংলা ভাষা অনৈসলামিক এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের জন্য উর্দুই একমাত্র যথার্থ ভাষা- এ মতবাদ প্রত্যাখ্যান করেছে। এভাবেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের নতুন নাগরিকরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী ভাষা ব্যবহারের স্বাধীনতা পেয়েছে। উল্লেখ্য, সরকারিভাবে ইসলামী ও ধর্মনিরপেক্ষ এ দুই অবস্থান সত্ত্বেও বাংলাদেশ আগেভাগেই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি অঙ্গীকার করেছে।

ভয়ংকর বিদ্রূপের বিষয় হলো, এ দেশ নিজের ভাষায় নিজের মত প্রকাশের জন্য সংগ্রাম করেছে এবং এ দেশেই অসহিষ্ণুতার নতুন মাত্রা হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষ (সেক্যুলার) মত প্রকাশের বিরুদ্ধে ধর্মীয় গোঁড়ামির উদ্ভব হচ্ছে। আহমেদ রাজীব হায়দার (২০১৩), অভিজিৎ রায় (২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি) ও ওয়াশিকুর রহমান (২০১৫ সালের মার্চ) হত্যা যে বার্তা দেয় তা হলো, কিছু বাংলাদেশি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শকে ধারণ করছে না। সরকার উৎখাত বা জনগণকে স্তব্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনার মতো যে ধরনের সন্ত্রাসবাদ বাংলাদেশ অতীতে মোকাবিলা করেছে, সেগুলোর চেয়ে নাস্তিকতার জন্য ব্যক্তিবিশেষকে স্তব্ধ করে দেওয়ার এ ঘটনাগুলো দৃশ্যত সেগুলোর চেয়ে অনেক আলাদা। ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে ধ্বংস করতে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে।

প্রায় ১৬ কোটি নাগরিকের দেশ বাংলাদেশে ৯০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলমান। তারা পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়নি। তারা মানব উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগের চেয়ে (শ্রীলঙ্কা ছাড়া) ভালো করেছে। ইসলামী সন্ত্রাসবাদ বিশেষ করে জামা'আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজি-বি) নিয়ে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হলেও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সৃষ্টি ঠেকাতে মোটামুটি সফল হয়েছে দেশটি। ২০০৫ সালের আগস্ট মাসে সারা দেশে জেএমবির সংঘটিত হামলার মতো দিন চলে গেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্ত্রাস মোকাবিলা। ভারতের সঙ্গেও তাই। তবে বাংলাদেশের কোনো সমস্যা নেই এমনটি কেউ ধারণা করবেন না। তিন মাস ধরে রাজনৈতিক সহিংসতা সড়কগুলোকে স্থবির করেছে, বড় দুই দলের মধ্যে চরম অচলাবস্থায় অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে এবং জেএমবির পুনরুজ্জীবিত হওয়ার কিছু ভয় আছে। বাংলাদেশের অগ্রগতির অন্যতম বিষয় হলো উন্নয়ন সাফল্য ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

তবে মতাদর্শগত হত্যার উদ্ভব দেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাবে। ঢাকার শাহবাগ চত্বরে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শান্তিপূর্ণ জনসমাগম থেকে হাই প্রোফাইল যুদ্ধাপরাধের বিচারে জামায়াতে ইসলামীর একজন সদস্যের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দাবি করা হয়েছিল। এরপর তরুণ ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে ঢাকায় তাঁর বাড়ির সামনে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। পুলিশ পাঁচ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীরা বলেছে, শাহবাগ আন্দোলনকে সমর্থন ও লেখালেখির কারণে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠনের এক নেতার নির্দেশনায় আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হয়।

এর কিছুদিন পরই চট্টগ্রাম থেকে কট্টর ইসলামী গ্রুপ হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবি জানায়। ওই দাবিতে শাহবাগে আন্দোলনকারী এবং 'নাস্তিক... ব্লগার ও ইসলামবিরোধীদের' শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হয়। তারা ওই বছরের ৬ এপ্রিল মহাসমাবেশের ডাক দিয়ে ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ শুরু করে। ওই সমাবেশে ইসলামীদের জনসমুদ্র থেকে মহানবীকে অবমাননাকারী 'নাস্তিক ব্লগারদের' ফাঁসি ও ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়।

প্রকৃত নাস্তিক ব্লগারকে হত্যার প্রায় দুই বছর পর এখন ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগারদের ওপর নতুন নতুন হামলার ঘটনা দেশ কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক শিরোনামে স্থান করে নিয়েছে। ২০১৩ সালে হায়দারের বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সতর্কবার্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে সেটি অনুকরণীয় ঘটনা ছিল না। গত ফেব্রুয়ারিতে অভিজিৎ রায়ের হত্যাকে কট্টর হিংস্র শিকারিদের বিলম্বিত হামলা হিসেবে অভিহিত করা যায়। তবে তৃতীয় হামলা একটি ছকের রূপরেখা তুলে ধরেছে। এগুলো জেএমবি বা অন্য কোনো বড় সংগঠনের সংঘবদ্ধ হামলা নয়, বরং এগুলো চাপাতির মতো অস্ত্রধারী কট্টর মৌলবাদী ছোট ছোট দলের কাজ।

আর এ কারণেই এসব হত্যাকাণ্ড এত ভয়ংকর। তারা এমন একটি স্থানে চরম ও জটিল সহিংসতা চালাল, যে অঞ্চলটি আধুনিক ও উদার মানবতাবাদের জন্য অধিকতর পরিচিত। তাদের নিছক সারল্য বাংলাদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য তাদের চিহ্নিত ও হামলার ঘটনা ঘটার আগেই ঠেকানো কঠিন করে তুলেছে। এসব হামলা বাংলাদেশের সব কিছুর বিরুদ্ধে। এগুলো এ দেশে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। কট্টর ইসলামী সহিংসতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশ জয়ী হচ্ছে- দুই মাস আগেও এমন আশা করা সহজ ছিল। আজ এমন আশা করা আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আলিসা আয়ার্স : যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর সাবেক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী (২০১০ থেকে ২০১৩)। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক অন্যতম নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো। সিএফআরের ওয়েবসাইটে গত শুক্রবার 'মার্ডারিং দ্য আইডিয়া অব বাংলাদেশ' শীর্ষক নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়।

অনুবাদ : মেহেদী হাসান


মন্তব্য