kalerkantho


পাকিস্তানকে টপকে গেছে বাংলাদেশ

আবুল কাশেম    

২৭ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০



পাকিস্তানকে টপকে গেছে বাংলাদেশ

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির নানা সূচকে পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে বেশ এগিয়ে ছিল তখনকার পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ। তবে সেই অগ্রযাত্রা থমকে যেতে সময় লাগেনি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ আর বৈষম্যের নীতির কারণে। দিন দিন পেছাতে থাকে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তির সময় শুধু অর্থনীতি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যেই নয়, আর্থসামাজিক নানা সূচকে পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। তবে স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে চিত্র। অগ্রগতি আর উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলে বাংলাদেশ। বিদেশিদের শোষণ-বঞ্চনার নাগপাশ থেকে মুক্তি পেয়ে গত চার দশকে বেশ পুষ্ট হয়ে ওঠে এই দেশ। অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে অনেক এগিয়ে থাকা পাকিস্তানকে অনেক ক্ষেত্রেই পেছনে ফেলে দিয়েছে আজকের বাংলাদেশ। এতে বিস্মিত পাকিস্তানও।
স্বাধীনতার আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নাম উল্লেখ করার মতো একজন ব্যবসায়ীও পাওয়া যেত না। দুই পাকিস্তানের ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা। স্বাধীনতার পর গত ৪৩ বছরে ব্যবসা ও বিনিয়োগে বাংলাদেশ যতটা এগিয়েছে, পাকিস্তান তা পারেনি। রপ্তানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটাই পেছনে পড়েছে পাকিস্তান। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর হিসাবে দেখা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে আর পাকিস্তানের রপ্তানির পরিমাণ ২৪ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় পাকিস্তানের চেয়ে আরো অনেক বেশি হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
কেবল রপ্তানি বাণিজ্যই নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতেও বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা আমদানি-নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়েছে, যতটা পারেনি পাকিস্তান। শিল্পের কাঁচামালের জোগানদাতা ও আমদানি-বিকল্প শিল্প কারখানা বিকশিত হওয়ায় শিল্প খাতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় কমছে। আবার খাদ্য উৎপাদন পাকিস্তান আমলের ৯৬ হাজার টন থেকে বেড়ে তিন কোটি টনে দাঁড়িয়েছে। ফলে খাদ্য আমদানি ব্যয়ও কমেছে। তাই রপ্তানি আয়ে পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানের আমদানির পরিমাণও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। গত অর্থবছরে পাকিস্তান ৪৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। সেখানে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ ৩৪ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয়ে এগিয়ে থাকার পাশাপাশি আমদানি ব্যয় কমে যাওয়ায় সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতিও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের অনেক কম। ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাকিস্তানের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলার। সেখানে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি সাত বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরেকটি বড় খাত হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। সেদিক থেকেও পাকিস্তানকে বহু পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। গত অর্থবছরে প্রবাসীদের কাছ থেকে পাকিস্তান রেমিট্যান্স পেয়েছে ৯ বিলিয়ন ডলার। সেখানে বাংলাদেশের প্রবাসীরা পাঠিয়েছে ১৪ বিলিয়ন ডলার।
এসব সূচকে এত দূর এগিয়ে থাকার প্রভাবটা আরো বেশি স্পষ্ট করে দিয়েছে দুই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। গত ১৭ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ১৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি আমদানি ব্যয়ের দেশ পাকিস্তানের রিজার্ভের পরিমাণ ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, একটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ওই দেশের কমপক্ষে তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান হতে হয়। সেই হিসাবে, পাকিস্তানের রিজার্ভ তার চেয়েও কম। দেশটির তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ ১১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আর বাংলাদেশের তিন মাসের আমদানি ব্যয় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতির কারণে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারও ছাড়িয়ে গেছে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধিকে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.২ শতাংশ আর পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.৬ শতাংশ। পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশ কম-বেশি ৬ শতাংশ হারে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছে। সেখানে পাঁচ বছরে পাকিস্তানের গড় জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বছরান্তে ২.৯ শতাংশ।
অন্যান্য সূচকেও অনেক ক্ষেত্রেই পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে মাথাপিছু সঞ্চয়ের হার প্রায় ২৮ শতাংশ, সেখানে পাকিস্তানের মাত্র ১৫ শতাংশ। সঞ্চয় কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই একটি দেশের জাতীয় মূলধন বিনিয়োগও কমে যায়। আর এর প্রভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার কমাটাও স্বাভাবিক।
পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও পাকিস্তানকে হার মানিয়েছে বাংলাদেশ। ‘পাকিস্তান ইকোনমিক সার্ভে ২০১২-১৩’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশটির ১০ বছরের বেশি বয়স্কদের মধ্যে শিক্ষিতের হার ৫৮ শতাংশ। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশে শিক্ষিতের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। ১০ বছরের বেশি বয়স্কদের হিসাব নিলে এ হার আরো বাড়বে।
বাংলাদেশের এই অগ্রগতিতে বিস্মিত পাকিস্তানও। গত ১৬-১৭ জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘পঞ্চম সার্ক বিজনেস লিডারস কনক্লেভ’-এ বাংলাদেশের এ রকম বিস্ময়কর অগ্রগতির কারণ সম্পর্কে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের কাছে জানতে চান পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খুররাম দস্তগীর খান।
তাঁদের ওই সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। তাদের রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমাদের রপ্তানি আয় অনেক বেশি। ওদের চেয়ে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্বিগুণ। কেবল তা-ই নয়, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সামাজিক বিভিন্ন সূচকেও বাংলাদেশ পাকিস্তানকে পেছনে ফেলছে। পাকিস্তানের বিস্মিত বাণিজ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের এই অগ্রগতির রহস্য জানতে চেয়েছেন খাওয়ার টেবিলে বসে।’ তিনি আরো বলেন, কেবল পাকিস্তান নয়, বিশ্বের অনেক দেশই বাংলাদেশের অগ্রগতিতে বিস্ময় প্রকাশ করছে। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ অন্য বাধাগুলো দূর করতে পারলে অগ্রগতি আরো ত্বরান্বিত হবে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ওয়েবসাইটে ‘দুই অর্থনীতির গল্প ১৯৭১-বর্তমান বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের তুলনা’ শিরোনামে ১৯৮০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই সব সূচকের আগামী কয়েক বছরের সম্ভাব্য অগ্রগতি ও পতনের দিকনির্দেশনাও রয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনীর ওয়েবসাইটটিতে। তুলনামূলক চিত্রে দেখানো হয়েছে যে বিভিন্ন সূচকে পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের চেয়ে নিম্নমুখী। ওয়েবসাইটটিতে দুই দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার, জিডিপি অনুপাতে সামষ্টিক বিনিয়োগ, সঞ্চয়ের গতি-প্রকৃতি, মূল্যস্ফীতির হার তুলে ধরা হয়েছে। এসব সূচকের প্রতিটিতে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের এই অগ্রগতি ও পাকিস্তানের পতনের কারণ সম্পর্কে সাইটটিতে সাধারণ মানুষের মন্তব্য চাওয়া হয়েছে।
একজন তার মতামতে বলেছে, এখন পাকিস্তানের তুলনা হওয়ার কথা ইরান, তুরস্ক, মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকোর সঙ্গে। আর বাংলাদেশের তুলনা হতে পারত শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামের সঙ্গে। কারণ পাকিস্তানের রয়েছে বিশাল ভূখণ্ড ও বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, যা বাংলাদেশের নেই। তবে পশ্চিমাদের কাছ থেকে বাণিজ্য সহায়তা পাওয়ার কারণে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
কারান নামের এক পাকিস্তানি মতামত দিতে গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ শিগগিরই পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে পেছনে ফেলবে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ‘নতুন প্রিয় দেশ’ (নিউ ডার্লিং) হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের আগ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ আর শাসনের কারণে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি। মূলত পূর্ব পাকিস্তানের আয় পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নকাজে ব্যয় করা হতো। ফলে তখন পশ্চিম পাকিস্তান দ্রুত উন্নত হলেও পূর্ব পাকিস্তান নাজুক হয়ে পড়ছিল। ওই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্যই আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। এখন অন্য কারো শোষণ-বঞ্চনা নেই। নিজেদের কর্মকাণ্ডের সুফল আমরা পাচ্ছি। ফলে কেবল পাকিস্তানই নয়, অনেক উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে বাংলাদেশ নানা দিক দিয়ে ভালো করছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ভারতের প্রবৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে।’


মন্তব্য