kalerkantho


এসএসসি প্রস্তুতি : বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

সৃজনশীল প্রশ্ন

শামীমা ইয়াসমিন, প্রভাষক, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, উত্তরা, ঢাকা   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



এসএসসি প্রস্তুতি : বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

প্রশ্ন ১ : উদ্দীপকটি পড়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :

রুমা ছাত্রী হিসেবে খুব ভালো ছিলেন। সদ্য বিএ পাস করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন।

অফিসে তাঁর সহকর্মীদের দুই-একজন তাঁকে অশ্লীল কথাবার্তা বলে। তাঁর স্বামী শহিদুল দেশের বাইরে থাকায় প্রায়ই শ্বশুর, শাশুড়ি ও ননদ কর্তৃক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। পাশাপাশি রাস্তায়, বাসে ও পথচারী দ্বারা বিভিন্নভাবে হেনস্তা হন।

ক. বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের একটি বিরাট অংশ কোন শিল্পে কাজ করে?

খ. এইডস রোগ ছড়ানোর একটি উপায় ব্যাখ্যা করো।

গ. উদ্দীপকের আলোকে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃতি ব্যাখ্যা করো।

ঘ. রুমার মতো মেয়েদের সহিংসতার হাত থেকে রক্ষা করা সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য—বিশ্লেষণ করো।

 

উত্তর :

ক. বাংলাদেশের নারী শ্রমিকের একটি বিরাট অংশ পোশাকশিল্পে কাজ করে।

খ. এইডস রোগ একটি মারাত্মক ব্যাধি, যা এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমণের মাধ্যমে রোগীর দেহে প্রবেশ করে। এইডস রোগটি ছড়ানোর বিভিন্ন উপায় থাকলেও এর অন্যতম একটি উপায় হচ্ছে যৌনমিলন।

অর্থাৎ এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমিত পুরুষ বা মহিলার সঙ্গে যৌনমিলনে এ রোগ ছড়াতে পারে।

গ. উদ্দীপকে লক্ষ করা যায়, রুমাকে তাঁর দুই-একজন সহকর্মী অশ্লীল কথাবার্তা বলে। শ্বশুর, শাশুড়ি ও ননদ কর্তৃক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এমনকি রাস্তায় বের হলে পথচারী দ্বারাও বিভিন্নভাবে হেনস্তা হন। উদ্দীপকে রুমার প্রতি যে আচরণ লক্ষ করা যায়, তা সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃতির একটি স্বরূপ মাত্র। শুধু রুমা নয়, বাংলাদেশের বেশির ভাগ নারীই বিভিন্নভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃতি বিভিন্ন রকম। যেমন—স্বামী, শাশুড়ি, ননদ ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য দ্বারা নির্যাতনের শিকার। স্ত্রী প্রহার, যৌতুক সম্পর্কিত নির্যাতন, শিক্ষা-বঞ্চনা, সম্পত্তির উত্তরাধিকারের বঞ্চনা, বাল্যবিয়ে, অত্যধিক কাজে বাধ্য করা, কন্যাশিশুকে মারধর করা, গৃহপরিচারিকা নির্যাতন, যৌন নির্যাতন প্রভৃতি। এদের মধ্যে যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও ধর্ষণ হলো নারীর প্রতি বর্বর, নির্মম ও পাশবিক সহিংসতা। এটি অপরাধের মধ্যে নিকৃষ্টতম। এগুলো ছাড়া নারীর প্রতি যেসব সহিংস ঘটনা ঘটে তা হলো—ফতোয়া প্রদান, গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মনগড়া আইনের মাধ্যমে বিচারকার্য পরিচালনা করা, নারীদের এসিড নিক্ষেপ করা, যুবতী ও কন্যাশিশুদের পতিতাবৃত্তির মতো জঘন্য কাজে বাধ্য করা, পাচার করে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া।

ঘ. উদ্দীপকে লক্ষ করা যায়, রুমা তাঁর অফিসে দুই-একজন সহকর্মী, বাসায় শ্বশুর, শাশুড়ি ও ননদ কর্তৃক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন; এমনকি রাস্তায় বের হলে পথচারী দ্বারাও বিভিন্নভাবে হেনস্তা হতে দেখা যায়। উদ্দীপকের রুমার মতো অসংখ্য নারী প্রতিদিন কোনো না কোনো উপায়ে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় কিংবা টিভির পর্দায় চোখ রাখলেই দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন গ্রামগঞ্জ ও শহর-বন্দরে নারীরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এসব সহিংসতার মধ্যে রয়েছে—নারীদের গায়ে এসিড নিক্ষেপ, ফতোয়ার অজুহাতে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা, যৌন হয়রানি, নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, বাল্যবিয়ে, অত্যধিক কাজে বাধ্য করা, কন্যাশিশুকে মারধর করা, গৃহপরিচারিকা নির্যাতন, যুবতী ও কন্যাশিশুদের পতিতাবৃত্তির মতো জঘন্য কাজে বাধ্য করা প্রভৃতি।

নারীদের এসব সহিংসতার হাত থেকে রক্ষা করা সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। কারণ নারীরাও মানুষ, নারীরা মায়ের জাত। পরিবার, সমাজ ও দেশের সব কাজে নারীদের অপরিসীম অবদান রয়েছে। যা কিছু কল্যাণকর তার অর্ধেক করেছে নারী আর অর্ধেক করেছে নর। মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর সন্তানের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নির্ভরশীল। এ থেকে বোঝা যায়, নারীরা ও পুরুষেরা এক অপরের পরিপূরক, যেন একই বৃন্তে ফোটা দুটি ফুল। সমাজে নারী বাদে পুরুষ কল্পনা করা যায় না। নারীকে নির্যাতন করার ফল শেষ পর্যন্ত পুরুষকেই ভোগ করতে হয়। কারণ নির্যাতনের শিকার কোনো নারী কারো বোন, না হয় মা, না হয় খালা বা দাদি। সে কারণে কোনো পুরুষ যখন কোনো নারীকে নির্যাতন করে, সে আসলে এর দ্বারা নিজকেই নির্যাতন করল। তাই সার্বিক সমাজব্যবস্থার সুস্থতার জন্য মেয়েদের সহিংসতার হাত থেকে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

 

প্রশ্ন ২ : উদ্দীপকটি পড়ে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :

সুমার বান্ধবী রিনা। রিনা কিছুদিন বিদেশে ছিল। সেখান থেকে ফিরে আসার পর বান্ধবীর ব্যাপক পরিবর্তনে রিনা বিস্মিত হয়। সুমা যদিও রিনার মতো উচ্চশিক্ষিত ছিল না, তবুও সে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নেয়, যা তাকে আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করে। পরবর্তী সময় সে একজন সফল ব্যবসায়ী হয়। তার এ সাফল্যের পেছনে সামাজিক পরিবর্তনের কিছু উপাদান কাজ করেছে।

ক. জনসংখ্যার ঘনত্ব সামাজিক পরিবর্তনের কোন উপাদান?

খ. সামাজিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের কারণ কী?

গ. সুমার এ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শহরায়ন ও শিল্পায়নের প্রভাব কী? বর্ণনা করো।

ঘ. ‘সামাজিক পরিবর্তনে নারীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে’—ব্যাখ্যা করো।

 

উত্তর :

ক. জনসংখ্যার ঘনত্ব সামাজিক পরিবর্তনের জৈবিক উপাদান।

খ. সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে নানা কারণে। সামাজিক পরিবর্তন, ন্যায়বিচারের অভাব, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, মানুষের সহনশীলতার অভাব, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ইত্যাদি কারণে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে। এ ছাড়া অপসংস্কৃতির প্রভাব, শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি, অপরাধপ্রবণতা, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, বঞ্চনা, শোষণ ইত্যাদি থেকেও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে।

গ. উদ্দীপকে সুমা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নেয়, যা তাকে আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করে। পরবর্তী সময় সে একজন সফল ব্যবসায়ী হয়। তার এ পরিবর্তনের পেছনে সামাজিক পরিবর্তনের কিছু উপাদান কাজ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শহরায়ন ও শিল্পায়ন। শহরায়ন বা নগরায়ন হচ্ছে শিল্পায়নের ফল। ব্যাপক শিল্পায়নের ফলে গ্রামীণ জীবন ছেড়ে নগর জীবনপদ্ধতি গ্রহণের প্রক্রিয়াই হচ্ছে শহরায়ন বা নগরায়ন। আর শিল্পায়ন হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কৃষি ও হস্তশিল্পভিত্তিক অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থা যান্ত্রিক শিল্পভিত্তিক, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও সমাজে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশে স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পের প্রসার ঘটেছে। এর মধ্যে পোশাক, ওষুধ, চা, চিনি, সুতা, কাগজ, তামাক, বিস্কুট, প্রসাধনী, সাবানশিল্প ইত্যাদি প্রধান। শিল্পায়নের ফলে এ দেশের কর্মসংস্থান, উৎপাদন, মাথাপিছু ও জাতীয় আয় ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়েছে। তা ছাড়া, যাতায়াত ও যোগাযোগব্যবস্থারও যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটেছে।

নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে দেশব্যাপী গড়ে উঠেছে বিভিন্ন কারিগরি ও প্রশিক্ষণ একাডেমি। এ প্রশিক্ষণ একাডেমিগুলোয় অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত সবাই হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে। উদ্দীপকের সুমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ একাডেমি থেকে গৃহীত প্রশিক্ষণকে সে খুব সহজেই কাজে লাগাতে পেরেছে। এ ক্ষেত্রে শহরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট উন্নত যোগাযোগ ও যাতায়াতব্যবস্থা তাকে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে। অর্থাৎ উদ্দীপকের সুমার পরিবর্তনে শহরায়ন ও শিল্পায়নের প্রভাব অনস্বীকার্য।

ঘ. সামাজিক পরিবর্তনে নারীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। একসময় নারীরা শুধু গৃহস্থালি কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে নারীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত আছে। আজ নারীরা বাংলাদেশের শহর এলাকায় পোশাকশিল্প, ওষুধ তৈরির কারখানা, টেলিফোন ও টেলিযোগাযোগ শিল্প, পাট, চা, কাগজশিল্প, স্থাপত্যশিল্প ইত্যাদি শিল্প-কারখানায় চাকরি করছে। তা ছাড়া শিক্ষিত নারীরা বিভিন্ন পেশা যেমন—চিকিৎসা, আইন, শিক্ষকতা, পুলিশ, বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। সরকারি চাকরিতে প্রশাসন, পুলিশ, ডাক, সমবায়, আনসারসহ প্রায় সব ক্যাডারে নারীদের বিরাট একটা অংশ চাকরি করছে। আমাদের গ্রামপর্যায়ে নারীরা সরকারি সংস্থা কিংবা বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এ কর্মসংস্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে বৃক্ষরোপণ, নার্সারি, গরু মোটাতাজাকরণ, ছাগল পালন, টেইলারিং, ফলমূলের ব্যবসা প্রভৃতি। তাদের আয়ে সংসার চলছে, সন্তানাদি পড়াশোনা করছে, পরিবারের সদস্যরা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। অধিক হারে উৎপাদন বৃদ্ধি, মাথাপিছু ও জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আবার এসব নারী পুরুষের পাশাপাশি বহু সামাজিক দায়িত্বও পালন করছে। এভাবে নারীদের দায়িত্বসুলভ কর্মকাণ্ডের ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় জীবনেও পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে। সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি, সামাজিক পরিবর্তনে নারীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে।


মন্তব্য