kalerkantho


শ্রদ্ধাঞ্জলি

করুণ জীবন, সৃজনশীল উন্মাদ

হানযালা হান

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



করুণ জীবন, সৃজনশীল উন্মাদ

সৃজনশীলতার গভীরে রয়েছে এক মত্ত কল্পনা, যা উন্মাদনার আরেক নাম। যিনি যত বেশি কল্পনাপ্রবণ, তিনি তত বড় শিল্পী।

এ কথা শিল্পের যেকোনো মাধ্যমে সত্য। হোক তিনি নৃত্যশিল্পী, ভাস্কর, আঁকিয়ে, ঔপন্যাসিক বা কবি। কল্পনায় যিনি স্বর্গ রচনা করতে পারেন, সেই সব পেয়েছির দেশের বাসিন্দাদের মনের দুঃখ দরদ দিয়ে বলতে পারেন, তিনিই সত্যিকারের শিল্পী।

জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধের বইয়ের শুরুতে লিখেছেন, ‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে রয়েছে কল্পনা এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা...। ’

এমন লাগামহীন কল্পনাপ্রতিভার উদাহরণ ‘দোন কিহোতি’। এর লেখক মিগেল দে সেরভান্তেস (জন্ম আনুমানিক ২৯ সেপ্টেম্বর ১৫৪৭, মৃত্যু ২২ এপ্রিল ১৬১৬)। তিনি লেখকদের লেখক, উপন্যাসের গুরু। অন্যরা তাঁকে বলেন উইটের (হাস্যরস) রাজপুত্র, আমরা বলব, সর্বকালের সেরা লেখক।

এর বাইরে সেরভান্তেসকে যা না বললে অবিচার করা হবে, তা হচ্ছে—তিনি কল্পনা তৈরির ঈশ্বর।

‘দোন কিহোতি’ ১৫১টি অধ্যায়জুড়ে এক বীরের গল্প। বই পড়ে যাঁর মাথা আউলে গেছে। তিনি বের হয়েছেন অভিযানে। এত দিন যা বইয়ে পড়েছেন, এবার তাই বাস্তবে করছেন। কাহিনি বর্ণনায় অভূতপূর্ব কৌশল অবলম্বন করেছেন লেখক। তিনি ঘটনা ঘটাচ্ছেন। ভবিষ্যতের এক লেখক তাঁর কথা লিখছেন। আবার ওই বইয়ের পাঠকদের সঙ্গে তাঁর কথা হচ্ছে। বীর নাইটের পাগলামি পড়ে আমি বহুবার হেসেছি, কিন্তু একবারের জন্যও তা বানোয়াট মনে হয়নি।

মাঝেমধ্যে অবাক হয়ে ভেবেছি, কী করে অমন বিদঘুটে আজগুবি অভিযানের গল্প তাঁর মাথায় এলো? এমন হাস্যরসপূর্ণ ভাষা তিনি পেলেন কোথায়? এসব প্রশ্ন আমাকে তাঁর সম্পর্কে জানতে আগ্রহী করে তোলো।

সেরভান্তেসের জন্ম স্পেনের আলকালা শহরে। ছিপছিপে গড়ন, মাথাভর্তি লালচে চুল, বড় বড় চোখ ও স্বভাবে চঞ্চল। ছোটবেলায় দুষ্টু স্বভাবের ছিলেন। সাত ভাই-বোনের সংসার। ঘরে অনেক সময় থাকার জায়গা মিলত না। ফলে শৈশবে পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস তাঁর।

গ্রামের একটা স্কুলে ভর্তি হলেন। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকানোর আগেই পরিবারটি গ্রাম ত্যাগ করে চলে গেল মাদ্রিদে। সেরভান্তেসের বয়স যখন উনিশ, সম্রাট দ্বিতীয় ফিলিপ নতুন প্রাসাদ সাজাতে দেশ-বিদেশের শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। রাজানুগ্রহ লাভের আশায় লেখকরাও আছেন। সেরভান্তেস তরুণ কবিদের দলে ভিড়ে গেলেন। এখানকার একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন।

অতিশয় দারিদ্র্য পরিবারটিকে পীড়া দিচ্ছিল। কিছুতে সংসার চলে না। সেরভান্তেসের পড়াশোনা প্রায় বন্ধ। এবারও বিদ্যালয়ের পাঠ চুকাতে পারলেন না। চলে গেলেন ইতালিতে। মাদ্রিদের পোপের দূত হুলিয়া অ্যাকোয়াভাইভার পারিষদে কবি হিসেবে থেকে গেলেন। ভেবেছিলেন, খাওয়া-পরার চিন্তা দূর হলে ইচ্ছামতো লিখতে পারবেন। কিছুদিনের মধ্যে বুঝতে পারলেন, রাজদরবারে লেখার পরিবেশ নেই। তোষামোদই এদের একমাত্র বৃত্তি।

এসব ছেড়ে অভিযানে যাওয়া যাবে বলে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন। তুর্কি আক্রমণ প্রতিহত করা তাঁর প্রথম অভিযান। ১৫৭১ সালের ৭ অক্টোবর লেপান্ত উপসাগরে খ্রিস্টান ও তুর্কি বাহিনী মুখোমুখি। এই যুদ্ধে তাঁর দেহে কয়েকটি গুলি লাগে। যুদ্ধ শেষে ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দুজন ইতালি থেকে জাহাজে চড়ে স্পেনের দিকে যাত্রা করলেন। তুর্কি বাহিনী জলপথে আক্রমণ করল। প্রচণ্ড লড়াইয়ে জাহাজের অর্ধেক মানুষ মারা গেল। যারা বেঁচে রইল তারা সব বন্দি হলো। এদের মধ্যে ছিলেন সেরভান্তেস ও তাঁর ছোট ভাই।

যুদ্ধের সম্পত্তি হিসেবে আলজেরিয়ায় দলপতি দালি মামির ভাগে পড়লেন তিনি। অন্ধকার ও নির্জন একটি ঘরে প্রথমে পায়ে শিকল বেঁধে ফেলে রাখা হয়। কোনো খাবার দেওয়া হতো না। দিনের পর দিন না খেয়ে মনে হতো মারা যাবেন বুঝি। একটু বাতাস না হলে, আকাশটা দেখতে না পারলে পাগল হয়ে যাবেন। যখন বন্দির আর পালানোর ক্ষমতা নেই, ষড়যন্ত্র করার উদ্যম নেই, তখন জেল থেকে ছাড়া পেলেন। সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হতো। বিনিময়ে মিলত সামান্য খাবার।

কী করে মুক্তি পাওয়া যায়, এ নিয়ে খুব ভাবতেন। বিদ্রোহ করা যায় কি না, পালিয়ে যাওয়া যায় কি না—এ নিয়ে দুই-একজন বন্দির সঙ্গে কথাও বলতেন। একবার কয়েকজন মিলে পালিয়ে গেলেন। ওরান বন পেরোতে পারলেন না। ফিরে পেলেন শাস্তি। এর মধ্যে একবার বাড়িতে চিঠি লিখে পাঠালেন। তাঁর মা বিধবা পরিচয় দিয়ে (যদিও স্বামী জীবিত) ধনাঢ্যদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাহায্য চাইলেন। বোনেরা কিছু টাকা দিল। পণের টাকা দিয়ে ভাইয়ের মুক্তির ব্যবস্থা করলেন।

আরো দুইবার পালানোর চেষ্টা করে ধরা পড়েন। শাস্তিও পেতে হয়। চার বছর পর যখন মুক্তির আর আশা নেই। পায়ে বেড়ি আর কোমরে শিকল নিয়ে অন্ধকার ঘরে বন্দি। দেহ ও মনে অবসাদ। ১০৮ জন বন্দির সঙ্গে মুক্তি পেলেন সেরভান্তেস। আহ!সে যে কী আনন্দ!

১০ বছর পর ফিরে এলেন মাদ্রিদে। ক্যাটালিনা নামের এক মেয়ের সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে হলেও সংসার টেকেনি। ১৮৫৮ সালে তাঁর বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ হলো। খ্যাতিও পেলেন। কিন্তু এটা বেশি দিন চালাতে পারলেন না। চাকরি নিলেন নৌবাহিনীর খাদ্য সরবরাহ বিভাগে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে খাদ্য সংগ্রহ করতেন। এক চাষি একবার তাঁর বিরুদ্ধে বেশি করে শস্য আদায় করার মিথ্যা অভিযোগ করলেন। বিচারক তদন্ত না করে তাঁকে জেলে পাঠালেন। নিরপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় কিছুদিনের মধ্যে ছাড়া পেলেন। কিছুদিন পর আরেকটি চাকরি পেলেন। অনেকটা হাটে খাজনা আদায়ের মতো। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় তাঁকে জেলে যেতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। এসব ছোটখাটো সময়ের কারাবাসে থাকতেই তাঁর মাথায় এসেছিল ‘দোন কিহোতি’র কাহিনি। জেলে বসেই তিনি লিখে শেষ করেন। এই পাণ্ডুলিপি বগলদাবা করে ১৬০৩ সালে ফিরে এলেন মাদ্রিদে।

প্রকাশক প্রথমে এ বই ছাপতে রাজি হননি। কয়েকটি সাহিত্যের আড্ডায় বইয়ের কিছু অংশ পাঠ করায় লোকমুখে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। শেষে কপিরাইট প্রকাশকের নামে লিখে দিয়ে ছাপার সিদ্ধান্ত হয়। ১৬০৫ সালে প্রকাশিত হয় বইটি। ছাপার পর দ্রুত বিক্রি হলো। নতুন সংস্করণ বের হলো। কিছু টাকাও পেলেন লেখক। সেই সামান্য টাকায়ই তাঁর অপার আনন্দ। মা-বাবা তত দিনে মারা গেছেন।

একবার ঘরের দরজায় এক যুবক আরেক যুবককে আহত করল। সেরভান্তেস তাঁকে ঘরে এনে সেবা করলেন। কিন্তু আহতকে বাঁচাতে পারলেন না। এই মৃত্যুর জন্য তাঁকে দোষী করা হলো। এবার তাঁর সঙ্গে দুই বোনকেও আটক করা হলো। শহরের ভেতর দিয়ে যখন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, কেউ টুঁ শব্দ করেনি। এক বোনের মৃত্যুর পর সৎকারের টাকা ছিল না। তিনি জীবিত থাকতেই বইটি ফরাসি, জার্মান, ইতালিয়ান ও ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ হয়। তাঁর বই হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। কপিরাইট না থাকায় তিনি কানাকড়িও পাননি।

টাকা পাননি, তাতে কী? ‘দোন কিহোতি’ আধুনিককালের প্রথম উপন্যাস। বালক হাইনরিখ হাইনে এ বই পড়ে কেঁদেছেন। মার্ক টোয়েন ‘অ্যাডভেঞ্চার অব হাকলবেরি ফিন’য়ে এবং মারিও ভার্গাস য়োসা ২০১০ সালে তাঁর নোবেল পুরস্কার বক্তৃতায় সেরভান্তেসের নাম উল্লেখ করেছেন। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্য মতে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ বই ৬০টিরও বেশি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।

কবি সৈয়দ শামসুল হক তাঁর ‘মার্জিনে মন্তব্য’ বইয়ের ‘প্রেমপত্র’ অধ্যায়ে লিখেছেন, “বস্তুত যেকোনো শব্দই যে নিতান্ত ধ্বনি মাত্র, অভিপ্রায়ই সব—শুধু কবি নয়, সবার উচ্চারণেই—এটি আমি প্রথম জেনেছিলাম সেরভান্তেসের উপন্যাস ‘দোন কিহোতি’ থেকে। শব্দ সম্পর্কে গভীর একটা ধারণা তিনি আমাদের দিয়েছেন আপাত লঘুচালে। ”

১৮১৮ সালে মেরি শেলির (কবি পার্সি বিশি শেলির স্ত্রী) লেখা ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ একটি হরর উপন্যাস। বিজ্ঞান যে মানবজাতির প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে, তা এ বইয়ে প্রথম দেখানো হয়। একজন বিজ্ঞানী একটি দৈত্য তৈরি করেন। সেই দৈত্য তাঁকে হত্যা করতে চায়। জাপানি চলচ্চিত্র সিরিজ ‘গডজিলা’ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন, পরমাণু বোমা মানবজাতি তথা প্রাণ-প্রকৃতির জন্য কতটা হুমকি হতে পারে।

আশ্চর্যের কথা এই যে সেরভান্তেস সেই সময়ে এই প্রযুক্তিদৈত্যের হুমকিটা বুঝতে পেরেছিলেন। ‘দোন কিহোতি’র অষ্টম অধ্যায়ে রয়েছে, সহযোগী সাঞ্চো পাঞ্জাকে নিয়ে প্রথম দিন অভিযানে বের হওয়ার পথে উইন্ডমিলের সারি চোখে পড়ে। দোন কিহোতি হুংকার দিয়ে ওঠেন, ‘বন্ধু সাঞ্চো পাঞ্জা, দেখেছ ওই যে? কী বিরাট দৈত্য? ... ওরা পৃথিবীর শত্রু। ’ কিন্তু না। শেষ পর্যন্ত তিনি দৈত্যগুলোকে শায়েস্তা করতে পারেননি। উল্টো আঘাত পেয়ে আহত হয়েছেন।

এভাবে সেরভান্তেস কল্পনার খাদ থেকে চূড়ায় উঠানামা করেছেন অবলীলায়। কোথাও এতটুকু ছেদ পড়েনি। নিজের জীবনটাকেও এ বইয়ের গল্পে ঢুকিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ করে বন্দিজীবনের বঞ্চনা, নির্যাতন, স্বপ্ন কোনো কিছু বাদ পড়েনি। বইটি কিহোতির সমাধিফলকে লেখা এপিটাফের মাধ্যমে শেষ হয়েছে, ‘মৃত্যুকে তিনি জয় করেছিলেন। ’ আমি জানি না, এ কথাগুলো সেরভান্তেসের এপিটাফ কি না। মৃত্যুর ৪০০ বছর পর এসে তাঁর বই পাঠে যে আবেদন, তাঁকে জানার যে কৌতূহল, এ লেখা তারই তর্পণ।


মন্তব্য