kalerkantho


যেভাবে লেখা হলো

সেলিম আল দীনের স্বর্ণবোয়াল

স্বকৃত নোমান   

২১ আগস্ট, ২০১৫ ০০:০০



সেলিম আল দীনের স্বর্ণবোয়াল

জন্ম : ১৮ আগস্ট ১৯৪৯মৃত্যু : ১৪ জানুয়ারি ২০০৮

দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের জনক নাট্যকার সেলিম আল দীনের মৌলিক রচনাগুলোর একটি 'স্বর্ণবোয়াল'। বাংলা ভাষায় রচিত মাছ নিয়ে এটি প্রথম নাটক। অর্থাৎ এর আগে মাছ নিয়ে এমন বৃহৎ পরিসরে কোনো উপন্যাস বা নাটক লেখা হয়নি। নাটকটির প্রধান চরিত্র চিরলি গাঙের এক বিশাল মাছ, যার নাম স্বর্ণবোয়াল। চকচকে গায়ের রং তার। নিকারিপাড়ার প্রবাদপুরুষ লিক্কত মাঝি বলেছিল এই মাছের গল্প। মাছটি শিকারের নেশায় জীবন বলি দেয় নাটকের অন্যতম চরিত্র তিরমনের দাদা জনম মাঝি ও বাবা খলিশা মাঝি। জনম মাঝি ৬০ বছর বয়সে কোশা নৌকায় বসে বেউলা বিলের মোহনায় ভোররাতে ছিপ ফেলে বড়শিতে গেঁথেছিল অধরা মাছটিকে, কিন্তু ছোট্ট কোশাসহ মাছটি তাকে টেনে নেয় চিরলির গভীরে।

জনম মাঝির স্বর্ণবোয়াল শিকারের নেশা রক্তের সঙ্গে প্রবাহিত হয় পুত্র খলিশার শরীরে, কিন্তু সেও পারে না মাছটি শিকার করতে। তার পুত্র তিরমন এই অজেয় মাছকে জয় করতে পারবে-এমন স্বপ্ন দেখে সে মৃত্যুসিথানে বসে। বাবার কাছে মাছটির গল্প শুনতে শুনতে তিরমনের ভেতরেও এই মাছ শিকারের নেশা জাগে। বাবাকে মৃত্যুসিথানে রেখে মায়ের নিষেধ উপেক্ষা করে ভাদ্র মাসের এক ঝড়ের রাতে তিতকামারের বড়শি নিয়ে সে যাত্রা করে স্বর্ণবোয়াল শিকারে। প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর বোয়ালটিকে সে নদীতীরের তিরতিরে জলে টেনে আনতে পারলেও শেষ পর্যন্ত মাছটি আবার লাফ মেরে নদীর গভীর জলে চলে যায়। অজেয় মাছ অজেয়ই থেকে যায়।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বিখ্যাত মাছ শিকারের গল্প 'দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সিতে' শিকার ধরা আর শিকার হারানোর চেয়েও প্রধান হয়ে ওঠে শিকারি বুড়ো সান্তিয়াগোর হার না-মানা বা পরাজয় স্বীকার না-করার লড়াকু মনোভাব। হেমিংওয়ে তাঁর উপন্যাসে হার না-মানাকে যেভাবে বড় করে দেখিয়েছেন, সেলিম আল দীন তাঁর এই নাটকে হেমিংওয়ের ধারণার বিপরীত একটা তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। অর্থাৎ হারজিত বলে কিছু নেই। স্বর্ণবোয়ালও হারেনি, তিরমনও হারেনি অথবা দুজনের কেউ-ই জেতেনি। হারজিতহীন এই দর্শন নিয়েই 'স্বর্ণবোয়াল' নাটক।

সেলিম আল দীন যখন তাঁর বিখ্যাত নাটক 'কেরামতমঙ্গল' ও 'হাতহদাই' লিখছিলেন, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন শামসুল হক। সেলিম আল দীনকে তিনি প্রায়ই তাঁর মাছ শিকারের বিচিত্র সব কাহিনী শোনাতেন। তখন থেকেই মূলত জলবাসী গহিন স্বভাব মাছেদের নিয়ে কিছু একটা লেখার কথা ভাবতে শুরু করলেন সেলিম আল দীন।

মাছ ছিল সেলিম আল দীনের অত্যন্ত প্রিয়, মাছ খেতে তিনি খুব ভালোবাসতেন। একেকবার বাজারে গেলে পাঁচ-ছয় হাজার টাকার মাছ একসঙ্গে কিনে নিয়ে আসতেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরেই ধামরাই থানার ইসলামপুর নয়ারহাট বাজার। একদিন এই বাজার থেকে একটি মাছ কিনলেন তিনি, যেটির গায়ের রং সোনার মতো চকচকে ও হলদে রাঙা।

কয়েক দিন পরের কথা। রাতে সেলিম আল দীন তাঁর বেডরুমে শুয়ে আছেন। হঠাৎ তাঁর কল্পনার চোখে বাজার থেকে কেনা সেই স্বর্ণবর্ণ বোয়াল মাছটি দ্যুতির সজীবতায় জীবন্ত হয়ে উঠল। একটা প্রবল হারজিতহীন শিকার দর্শনে তাঁকে প্ররোচিত করল কল্পনার সেই স্বর্ণবোয়ালটি।

এ ঘটনার কয়েক দিন পরই তিনি 'স্বর্ণবোয়াল' নাটকটি লিখতে শুরু করলেন। তাঁর বিখ্যাত নাটক 'চাকা' লিখেছেন মাত্র পাঁচ দিনে, 'স্বর্ণবোয়াল' লিখলেন মাত্র ২০ বা ২৩ দিনে। লেখা শেষ হওয়ার পর নাটকটি ছাপা হয় সাপ্তাহিক '২০০০'-এর ঈদ সংখ্যায়। ২০০৬ সালে আমি সেলিম আল দীনের একান্ত সচিব হিসেবে যোগ দিই। তিনি আমাকে ধরিয়ে দিলেন 'স্বর্ণবোয়ালের' হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিটি। তাঁর হাতের লেখা ছিল প্রায় দুর্বোধ্য, তবু কম্পোজ শেষ করতে খুব বেশি সময় লাগল না। পাণ্ডুলিপির একটা প্রিন্ট দেওয়ার পর তিনি আবার সম্পাদনা শুরু করলেন। দুই মাসে পাণ্ডুলিপিটি প্রায় তিনবার সম্পাদনা করলেন তিনি।

যাই হোক, আঙ্গিকগতভাবে স্বর্ণবোয়াল দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পেরই অন্তর্ভুক্ত। সমগ্র মধ্যযুগে এবং প্রায় এক হাজার বছর ধরে বাঙালি জনপদের কৃত্যে ও শিল্পে একের মধ্যে শিল্পের বহু বিভাজনকে লীন করে দেওয়ার যে দর্শন, তারই ধারায় রচিত এই 'স্বর্ণবোয়াল' নাটক। সেলিম আল দীন শিল্পের কোনো জেনর মানতেন না। তাই স্বর্ণবোয়ালকে তিনি কোথাও বর্ণনাত্মক ধারার নাটক বলেছেন, কোথাও উপাখ্যান বলেছেন আর কোথাও বা বলেছেন কবিতা। মূলত তিনি বাঙালির পাঁচালির ধারাটাকে আধুনিকের সমমানতায় পৌঁছে দিতে চেয়েছেন বলে এ নাটকের গঠনগত বিষয়টাকে গদ্যের ছদ্মবেশে কাব্যে এবং এর মানবভাবনার আদর্শগত দিকটিকে আধুনিককালের স্থলে ন্যাস করতে চেয়েছেন।



মন্তব্য