kalerkantho


সদরঘাটের মাঝিদের দিনকাল

নৌকা চলে তো জীবন চলে না!

মো. জহিরুল ইসলাম   

১৯ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



নৌকা চলে তো জীবন চলে না!

ছবি : লুৎফর রহমান

পুরান ঢাকার সদরঘাট, ওয়াইজঘাট, শ্যামবাজারসহ বিভিন্ন ঘাটে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় দুই হাজার মাঝি। জীবিকার তাগিদে ভোরের আলো জেগে ওঠার আগেই মাঝিরা বুড়িগঙ্গার বুকে ভাসিয়ে দেন নৌকা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের উপার্জন কমছে। মুখে নেই হাসি, কণ্ঠে হতাশার সুর! তার পরও বুড়িগঙ্গার বুকে নৌকা চালিয়ে এখনো বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন তাঁরা। ইজারাদারের টাকা, মালিকের টাকা, পাহারা ও সিরিয়ালের টাকা—সব দাবি মিটিয়ে যা থাকে, তা দিয়ে বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে নৌকা চলে তো জীবন চলে না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি নৌকা বাঁধা আর মাঝিরা তাকিয়ে যাত্রীর জন্য। কেউ কেউ ডাকছেন, ‘আহেন আহেন মামা, উডেন আমার নায়ে উডেন। ’ প্রতিদিন এই ঘাটসহ তিনটি ঘাটে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন শত শত মাঝি। কোনোমতে পেটে-ভাতে চলছে তাঁদের জীবন, নেই কোনো পরিবর্তন। দিনে যা আয় করেন, তার বেশির ভাগই বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়ে যায়। দিন শেষে সঞ্চয় বলে আর কিছু থাকে না।

বেশির ভাগ মাঝির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারা দিন নৌকা চালিয়ে একজন মাঝি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেন। বিভিন্ন মহলকে দিয়ে এবং নিজে খরচ করে দিন শেষে সামান্যই থাকে, যা দিয়ে জীবন চলা ভার। যেমনটা জানালেন সদরঘাটের একজন মাঝি আবদুর রহমান, ‘সারা দিন নাও চালাইয়া ৭০০-৮০০ কামাই করি। এহান থেইকা ৯৫ টাকা ইজারাদারদের দিতে হয়, মালিককে ৭৫, পাহারা ও সিরিয়াল ১৫ টাকা, নাশতা-পানি বেবাক মিল্লা আরো ২০০ টাহা খরচ। দিন শেষে ৩০০ টাহার মতো থাকে। ’ বুড়িগঙ্গার নৌকার মাঝিদের নিয়ে সদরঘাট এলাকায় রয়েছে ঢাকা নৌকা মাঝি বহুমুখী সমবায় নামের একটি সমিতি। এ বিষয়ে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মন্টু মিয়া বলেন, ‘সময়ের বিবর্তনে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, নানা অজুহাতে পাবলিক পরিবহনের ভাড়াও বেড়েছে, তার পরও ভাড়া বাড়াননি মাঝিরা। একজন লোক পার করলে আগে নিতেন পাঁচ টাকা। এখনো সেই টাকাই নেন তাঁরা। আমাদের সংগঠনটি জাতীয় শ্রমিক লীগের একটি সংগঠন, কিন্তু এখানে কোনো মূল্যই নেই। এর আগে ঘাটের দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়ার জন্য কয়েকবার দরখাস্ত করেছিলাম। সম্প্রতি আবারও করি, কিন্তু এখনো কোনো খবর নেই। ’ মাঝিরা মানবেতর জীবন যাপন করলেও স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই মাঝিদের কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি—এমন অভিযোগ সমিতি ও মাঝিদের।

দেখা যায়, ঘাটের মাঝিরা দলগতভাবে, এককভাবে অথবা ঘণ্টা হিসেবে সাধারণত পারাপার করে থাকেন। দলগতভাবে ৮-১০ জন যাত্রী থাকে, নেওয়া হয় পাঁচ টাকা করে। একক হলে ২৫-৩০ টাকা আর ঘণ্টা হিসেবে দরাদরির মাধ্যমে ভাড়া ঠিক হয়। কিছু আছেন, যাঁরা নোঙর করা লঞ্চে যাত্রী ওঠিয়ে দেন। কথা হলো ৭৫ বছর বয়সী মান্নান মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এরশাদের আমল থেইক্কা নৌকা চালাই। সে সময় রোজগার ভালা আছিল, সংসারে কোনো অভাব আছিল না। বাবা, অহন বড় দুঃখে আছি, ৭৫ বছর বয়স, অহনো নৌকা বাইয়া সংসার চালাই। যেই থেইক্কা নৌকা চালাই—ভাড়া আর চাঁদা না দিলে ডাহায় মোর একটা বাড়ি থাকত। মালিকরা ডাহাইত, নৌকা কিনতে দেয় না, আমরা মাঝিরা হয়া গেছি বুড়িগঙ্গার দাস। ’ সদরঘাটে প্রায় এক হাজার ২০০ মাঝি প্রতিদিন নৌকার বৈঠা হাতে নামেন বুড়িগঙ্গায়। মোট মাঝির সংখ্যা হবে প্রায় দুই হাজার। অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে যিনি এক দিন চালান, তিনি আর পরের দিন বৈঠা হাতে নেওয়ার শক্তি পান না। তবে এত কষ্টের আয়ের বেশির ভাগ অর্থ থাকছে না মাঝিদের হাতে। ইজারাদার বলছেন, ‘আমরা ইজারা নিই না! তবে টেন্ডারের একটা বিষয় তো আছেই। ’ নিউভিশন ইকোসিটির পরিচালক মো. শিপু আহমেদ বলেন, ‘আমি কোনো ইজারাদার নই। তবে বিশেষ ক্ষমতা বলে ঘাট কমিটির সহযোগিতায় দেখাশোনা করছি! বিআইডাব্লিউটিএ কর্মচারী ইউনিয়ন এবং ঘাট শ্রমিক যৌথভাবে এটি চালাচ্ছে। আমরা মূলত শ্রমিক দিয়ে থাকি। ’ মাঝিদের কাছ থেকে নেওয়া টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এত মনে হয় নেওয়া হয় না। এটি আসলে টেন্ডার হয়ে থাকে, যার রাজস্ব বিআইডাব্লিউটিএও পায়। কিসের টাকা তুলছে, কে নিচ্ছে—এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। ’

যে বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে ঘুরেছিল হাজারো মাঝির জীবিকার চাকা, সেই বুড়িগঙ্গা আজ হারাতে বসেছে তার যৌবন। দুই তীর দখল করে গড়ে উঠেছে কল-কারখানা। পানি হয়েছে ব্যবহারের অনুপযোগী। আগে যে পানি দিয়ে গোসল করা যেত, মেটানো হতো তৃষ্ণা, সেই পানি দেখলে এখন শরীর শিউরে ওঠে। আর যাঁদের চোখের সামনে ধীরে ধীরে স্বচ্ছ পানি হারিয়েছে তার প্রকৃত রূপ, সেই মাঝিদের পরিশ্রমেরও নেই মূল্যায়ন। সারা দিন নৌকা চালিয়ে এমনও হয়, দিন শেষে পকেটে কানাকড়িও থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে বিআইডাব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, ঘাটের কোনো ইজারাদার নেই! কিন্তু কে বা কারা প্রতিদিন নিয়মবহির্ভূতভাবে টাকা নিচ্ছে, সে বিষয়েও তারা অবগত নয়। এ বিষয়ে বিআইডাব্লিউটিএ ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক গুলজার আলী বলেন, ‘মানুষ টার্মিনালে ঢোকার সময় দুই ধরনের হিসাব করে টাকা নেওয়া হয়। এক. মানুষের সঙ্গে লাগেজের এবং দুই. যদি আলাদা ভারী মালামাল থাকে তার জন্য। আর গেটমানি সরাসরি তোলা হয়, যা বিআইডাব্লিউটিএর অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে থাকে। আর এখানে দুই ধরনের শ্রমিক কাজ করে, সরকারি শ্রমিক আর ইজারাদারদের শ্রমিক। ’ ঘাট শ্রমিকের কার্ড কারা দিয়েছে এবং মাঝিদের কাছ থেকে টাকা তোলার কোনো নিয়ম রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কার্ড আমরা দিইনি; আর মাঝিদের কাছ থেকে টাকা কারা তুলছে, সেটা যারা ঘাট চালাচ্ছে তারা বলতে পারে। বিশেষ ক্ষমতায় কাউকে ঘাটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে হবে। ’


মন্তব্য