kalerkantho


সাংস্কৃতিক উৎসবের বিজয়ীরা

৯ ও ১০ মার্চ নটর ডেম কলেজের কালচারাল ক্লাব আয়োজন করে ‘চতুর্থ নটর ডেম কালচারাল জুবিলেশন’। আর এই উৎসবে বিজয়ীদের মধ্যে সেরা কয়েকজনের খবর জানাচ্ছেন আফরা নাওমী

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সাংস্কৃতিক উৎসবের বিজয়ীরা

অলরাউন্ডার

নওশীন শর্মিলী সুজানা

নওশীন এখন এতই ব্যস্ত যে ইভেন্টে অংশ নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তিন-তিনটি পুরস্কার নিজে উপস্থিত থেকে গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ মাইলস্টোন কলেজের এই এইচএসসি পরীক্ষার্থীর মডেল টেস্ট ছিল ওই দিন। নটর ডেম কালচারাল জুবিলেশনে অংশ নিয়েছিল পাঁচটি বিভাগে। এর মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করে ধারাবাহিক গল্প বলা প্রতিযোগিতায়। ইংরেজি হাতের লেখা প্রতিযোগিতা আর প্রেজেন্টেশনে হয় দ্বিতীয়।

ছোটবেলা থেকেই নাচ-গান ও আবৃত্তিতে আগ্রহ নওশীনের। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে কৌতুক বলা, হামদ-নাত, আবৃত্তি, রচনা প্রতিযোগিতা, ছবি আঁকা ও গল্প বলা প্রতিযোগিতায় পেয়েছে নানা পুরস্কার। বেস্ট ডিবেটরও হয়েছে বিতর্ক করে। মাইলস্টোন স্কুলে ‘অলরাউন্ডার’ খেতাবও পেয়েছে সব শাখায় তাঁর সফল বিচরণের জন্য।

প্রিয় লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। কবিতা আবৃত্তিতে দেবব্রত সিংহের তেজ, যতীন্দ্রমোহন বাগচীর অন্ধ বধূ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাধারণ মেয়ে তার খুব পছন্দ।

মা সুলতানা পারভিন লাকির অনুপ্রেরণায় বিতর্ক, আবৃত্তি, গান, ছবি আঁকা—সবই চালিয়ে যাচ্ছে নওশীন পড়াশোনার পাশাপাশি।

জেএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাসের সঙ্গে সাধারণ বৃত্তিও পেয়েছে সে। সামনে এখন শুধু এইচএসসির চিন্তা!

 

সাহিত্যপ্রেমী সোয়েব আনিয়াদ খান তূর্য

মা-বাবার একমাত্র সন্তান তূর্য পড়াশোনা, গান, আবৃত্তি, ভায়োলিন বাজানো, বিজ্ঞান, ভাষা, সাহিত্য, লেখালেখি—এমন আরো নানা বিষয়ে নিজের গুণের পরিচয় রেখেছে। পড়াশোনা করছে নটর ডেম কলেজে একাদশ শ্রেণিতে। নিজের কলেজের ফেস্টে অংশ নিয়ে জিতে নিয়েছে চার-চারটি পুরস্কার। রচনা লেখা প্রতিযোগিতায় প্রথম, বাংলা বানানে দ্বিতীয়, বুক বেসড কুইজে (নির্ধারিত কয়েকটি বই থেকে কুইজ হয়) দ্বিতীয় ও বাংলা হাতের লেখায় তৃতীয় স্থান লাভ করে তূর্য। ছোটবেলায় বাবার কাছে কবিতা আবৃত্তিতে হাতেখড়ি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতাই তার সবচেয়ে প্রিয়। ‘জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ’ প্রতিযোগিতায় কয়েকবার অংশ নিয়ে একবার জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হয়েছে কবিতা আবৃত্তিতে। ‘প্রথম আলো-এইচএসবিসি ভাষা প্রতিযোগ’-এ বিভিন্ন বিভাগে অংশ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তিনবার। আবার ব্রিটিশ কাউন্সিল আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড বুক ডে বুক রিডিং কম্পিটিশন’-এ টানা তিনবার সেরা দশের মধ্যে থেকে তূর্য ঘরে তুলেছে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অনেক বই ও সনদ। পেয়েছে ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরির সদস্য হওয়ার সুযোগ।

তূর্যের মতে, তার জীবনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন বাংলাবিদদের একজন হতে পারা। বাংলা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ, বানান ও ব্যাকরণের সঠিক ব্যবহার ছড়িয়ে দিতে বাংলা ভাষা বিষয়ক মেধাভিত্তিক টিভি রিয়ালিটি শোটি যৌথভাবে আয়োজন করে ইস্পাহানি মীর্জাপুর চা ও চ্যানেল আই। তূর্য সেখানে রানার-আপ হয়।

এ ছাড়া অংশ নিয়েছে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ল্যাঙ্গুয়েজ ফেস্ট, বিজ্ঞান মেলা, কালচারাল ফেস্ট, গণিত অলিম্পিয়াডসহ বার্ষিক নানা উৎসবে। প্রতিবছরই আলমারির তাক ভারী করে তুলছে তার নানা পুরস্কার। এখন তূর্য ভায়োলিন শিখছে ছায়ানটে। ছোটবেলায় গান শেখা হলেও, তা বেশিদূর এগোয়নি। তবে গান সে খারাপ গায় না বলে দাবি তার বন্ধুদের। ‘বই পড়া প্রায় নেশার মতো আমার।’ জানায় তূর্য। সত্যজিৎ রায় তার প্রিয় লেখক আর প্রিয় বইয়ের তালিকায় আছে শার্লক হোমস, ফেলুদা ও ব্যোমকেশ সমগ্র। স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার; কিন্তু সাহিত্য পাশে রাখতে চায় তখনো।

 

গানের ভুবনের রাইয়ান বিনতে হাবীব

শাড়ি পরতে ভালোবাসা এই ছোট্ট মেয়েটি গানকে আপন করে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছে। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লোকগীতি, দেশাত্মবোধক গান এবং আবৃত্তিতে অংশ নিয়ে রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলগীতিতে প্রথম আর লোকগীতিতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছে রাইয়ান।

সাড়ে চার বছর বয়সেই গান গাওয়া শুরু। শিশু একাডেমিতে গানের তিন বছরের কোর্স শেষ করেছে। এখন দুই বছরের ডিপ্লোমা করছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে উচ্চাঙ্গসংগীতের ওপর। প্রথম বছরের পরীক্ষায় আবার প্রথম হয়ে দ্বিতীয় বছরে উত্তীর্ণ হয়। গান শিখছে শামসুল হুদা স্যারের কাছে। ছায়ানটে শিশু কোর্স শেষ করে এখন নজরুলগীতিতে মনোযোগ দিয়েছে রাইয়ান। জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা ২০১৪তে রবীন্দ্রসংগীতে থানা ও জেলা পর্যায়ে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছে। ছায়ানটে একবার একক গান পরিবেশনার সুযোগও হয়েছিল রাইয়ানের। গানের পাশাপাশি আবৃত্তি, অভিনয়, ছবি আঁকা, উপস্থাপনা ইত্যাদি সচল রেখেছিল রাইয়ান। শিশু অধিকার সপ্তাহ ২০১৩তে ওসমানী মিলনায়তনের অনুষ্ঠানে নাটিকায় প্রধান চরিত্রে অভিনয়ও করেছে। এ ছাড়া স্কুলের সব উৎসবে অংশ নেয়। আর পড়ালেখার পাশাপাশি এ ধরনের কাজে সব ধরনের অনুপ্রেরণা পায় মা ও বাবার কাছ থেকে। রুনা লায়লা ও নীলুফার ইয়াসমিনের গান পছন্দ। খুব বেশি ঘোরার সুযোগ না পেলেও ভ্রমণে আগ্রহ আছে খুব। অবসরের প্রিয় সঙ্গী ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের বইগুলো। বড় হয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ (চিকিৎসক) হতে চায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণিতে পড়া রাইয়ান। শিশুদের খুব ভালোবাসে, তাই শিশুদের জন্য কিছু করতে চায় রাইয়ান।

 

নটর ডেম কালচারাল জুবিলেশন

‘ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য বাংলার সংস্কৃতি জীবন ও হৃদয়ে ধারণ করা। নিজস্ব সংস্কৃতি জানা, আরো বেশি বেশি চর্চা করা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া।’ বলেন ক্লাবের সাবেক জেনারেল সেক্রেটারি নীলেশ কুমার রায় ও বর্তমান সেক্রেটারি প্রান্ত রায়। ৫৫টি স্কুল-কলেজের এক হাজারের বেশি ছাত্র-ছাত্রী অংশ নেয় নটর ডেম কলেজের অডিটরিয়াম ও মুক্তমঞ্চে আয়োজিত এই উৎসবে। ঢাকার বিখ্যাত সব স্কুল, কলেজ ছাড়াও এতে অংশ নেয় নটর ডেম কলেজ ময়মনসিংহ শাখা, সিলেট ক্যাডেট কলেজ ও মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অনেক শিক্ষার্থী। স্কুল ও কলেজ ক্যাটাগরিতে বিভক্ত ছিল ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণ। এই সাংস্কৃতিক উৎসবে সেগমেন্ট ছিল আঠারোটি। এই বিভাগগুলোতে ৩৪টি ভাগে পুরস্কৃত হয়েছে প্রায় ১০২  জন । অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও সিএসসি, ভাইস প্রিন্সিপাল ড. শঙ্কর লেনার্ড ডি রোজারিও সিএসসি, ক্লাব মডারেটর ফয়সাল আজিজসহ নটর ডেম কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং আরো অনেক অতিথি। 

একেকজন শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ পাঁচটি সেগমেন্ট বা বিভাগে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল। এদের মধ্যে কেউ কেউ তিন-চারটি পুরস্কার তাদের ঝুলিতে ভরে নিয়েছে।



মন্তব্য