kalerkantho


শিক্ষার্থীদের হাঁসফাঁস

মোখলেছুর রহমান মনির, ভালুকা (ময়মনসিংহ)   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



শিক্ষার্থীদের হাঁসফাঁস

ভালুকার রামপুর উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মেদুয়ারী ইউনিয়নের রামপুর উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টিনের ছাপরাঘরে পাঠদান করা হয়। দুপুরে সূর্যের তাপে শ্রেণিকক্ষ গরমে তেতে ওঠে। জায়গার অভাবে শিক্ষার্থীদের প্রতি বেঞ্চে পাঁচ-ছয়জন মিলে গাদাগাদি করে বসতে হয়। ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের বেঞ্চের ওপর খাতা রেখে লিখতে সমস্যা হয়। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বইয়ের ব্যাগ বেঞ্চের ওপর রাখা যায় না। গরম পড়লে গাদাগাদি করে বসতে কষ্ট হয়। কখনো কখনো বই-খাতা ঘামে ভিজে যায়।

রামপুর উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এভাবেই তাদের স্কুলের চিত্র উপস্থাপন করল। বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিন, সামিউল ও তানজিনা অভিযোগ করে বলে, এভাবে লেখাপড়া করতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। তাই শিগগিরই এ স্কুলে পাকা ভবন নির্মাণের দাবি জানায় তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রামপুর উত্তরপাড়াসহ আশপাশের গ্রামের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য রামপুর গ্রামের শিক্ষানুরাগী শামছুদ্দিন সরকার ৫৪ শতাংশ জমি দান করেন। পরে উপজেলার বরাইদ গ্রামের শিক্ষক মনির উদ্দিন মাস্টার, শাছুদ্দিন সরকার ও স্থানীয় আলতাব আলী সরকার মিলে ওই জমিতে ১৫ ফুট প্রস্থের ৭০ ফুট লম্বা একটি টিনের ছাপরাঘর নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে রামপুর উত্তরপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৯১ সালে শুরুর পর ১৯৯৬-৯৭ সালে বিদ্যালয়টি স্থাপন ও চালুর সরকারি অনুমতি মেলে। এ অবস্থায় ১৯৯৮ সালে ঝড়ে বিদ্যালয়ের ছাপরাঘরটি ভেঙে পড়ে। পরে সরকারি সাহায্য ছাড়াই শিক্ষকদের অর্থে টিনের বেড়া দিয়ে ঘর নির্মাণ করা হয়। ২০১১ সালে বিদ্যালয়টি বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে সরকারি তালিকাভুক্ত হয়। ২০১২ সালে কাজিম উদ্দিন আহাম্মেদ ধনু উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে শিশু শ্রেণির জন্য টিনের আরেকটি ছাপরাঘর নির্মাণ করে দেন। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় বিদ্যালয়টি সরকারীকরণ হয়। বর্তমানে এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৬৫ জন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানও যথেষ্ট ভালো বলে জানায় স্থানীয়রা। তবে ভবন, বেঞ্চ, আসবাবসহ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত বিদ্যালয়টি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিশু শ্রেণি ছাড়াও ১৫ ফুট প্রস্থ ও ৭০ ফুট দৈর্ঘ্যের ওই বিদ্যালয়ে চারটি কক্ষের তিনটিতে পাঠদান চলছে। কক্ষের প্রতিটি বেঞ্চে গাদাগাদি করে বসেছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে কোনো আসবাব নেই। ছোট্ট একটি টেবিলের চারপাশে নড়বড়ে চারটি চেয়ারে বসেন শিক্ষকরা।

বিদ্যালয়টি শুরুর ২৭ বছর ও বেসকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে সরকারি তালিকাভুক্ত হওয়ার সাত বছর হতে চললেও একটি টিনের ছাপরাঘর ছাড়া তেমন কোনো সরকারি সাহায্য পায়নি বিদ্যালয়টি। তা ছাড়া এত দিনেও নির্মিত হয়নি পাকা ভবন। শিক্ষার্থীদের জন্য মাঠের কোণে একটি টিউবওয়েল থাকলেও বছরের ৯ মাসই তাতে পানি পাওয়া যায় না।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোহুল আমীন বলেন, ‘সরকারীকরণ হওয়ার আগ পর্যন্ত এখানকার শিক্ষকরা বিনা বেতনে বছরের পর বছর পাঠদান করেছেন; কিন্তু এখনো সরকারি নীতি অনুসারে সব অধিকার বুঝে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে বিদ্যালয়টি নানা সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষ করে পাকা ভবন নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহীদুজ্জামান বলেন, রামপুর উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালটির শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সন্তোষজনক। ওই বিদ্যালয়ে পাকা ভবন নির্মাণের জন্য উপজেলা শিক্ষা কমিটির রেগুলেশনসহ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে একাধিকবার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি শামছুদ্দিন সরকার জানান, অজপাড়াগাঁয়ে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কষ্ট করে বছরের পর বছর ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন। এখন বিদ্যালয়টিতে পাকা ভবন নির্মাণসহ অন্য সমস্যাগুলো জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করা প্রয়োজন। ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তাই আশ্বাসে আর বিশ্বাস নেই কারো। অচিরেই পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিয়ে এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করে দিতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।


মন্তব্য