kalerkantho


‘হারং হুরং’ অভিযান

সামিউল্যাহ সমরাট   

১৬ মে, ২০১৬ ০০:০০



‘হারং হুরং’ অভিযান

বিকেল গড়িয়ে গেছে। যাব মালনিছড়া চা বাগানে। উদ্দেশ্য সন্ধ্যার পর বাগানে ঘুরাঘুরি। দিনের আলোয় চা বাগানের রূপসুধা তো অনেক পান করা হলো, এবার রাতের চা বাগানকে আবিষ্কার করা। আমাদের দলটা বেশ ভারি। দেবাশীষ দেবু, প্রত্যুষ তালুকদার, বিনয় ভদ্র, রাজীব রাসেল, গৌতম, দিদার, সুমি, শিমু আগে থেকেই তৈরি ছিল। একেবারে শেষ মুহূর্তে যোগ দিলেন অমিত আর বাতিন ভাই। এই মালনিছড়া চা বাগানের ইতিহাসটা অনেক পুরনো, সেই ১৮৫৪ সালে তৈরি করা হয়েছিল। উপমহাদেশের বাণিজ্যিক চা উত্পাদনের শুরুটা তো এ বাগান থেকেই। অনেকবার এসেছি এই বাগানে আর আকারে বিশাল বলে এই অ্যাডভেঞ্চারের জন্য মালনিছড়াকেই বেছে নিয়েছি।

সিলেট শহরের খুব কাছেই মালনিছড়া। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আম্বরখানা বড়বাজারে একত্র হলাম সবাই। তিনটি মোটরবাইক আর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে বিমানবন্দর সড়ক ধরে এগিয়ে চলেছি। লাক্কাতুরা চা বাগানকে পাশ কাটিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম মালনিছড়া চা বাগানের কারখানার মূল ফটকের সামনে। একটু দাঁড়ালাম কিছু শুকনো খাবার আর পানি নেব বলে। হুট করেই বিনয় ভদ্র নতুন এক প্রস্তাব দিয়ে বসল। ‘হারং হুরং’ নামে বেশ পুরনো এক সুড়ঙ্গ আছে এই বাগানের গহিনে। সেখানে যেতে পারি। গল্প-উপন্যাসে কত সুড়ঙ্গের কথা শুনেছি কিন্তু নিজের চোখে এই পর্যন্ত কোনো সুড়ঙ্গ দেখিনি। সবাই একসঙ্গে ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম। চা বাগানে ইতিমধ্যে আঁধার নেমে এসেছে। আমাদের দলের কেউ হারং হুরং যাওয়ার পথটা চেনে না। সন্ধ্যার আলোয় টিলাময় চা বাগানের ভেতরে অচেনা সুড়ঙ্গ খুঁজে বের করা ভীষণ মুশকিল। হিলুয়াছড়া পেছনে ফেলে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উঁচু-নিচু পথ পেরোলাম। এই সন্ধ্যায়ই গভীর রাতের মতো আবহ। একেবারে সুনসান চার দিক। পথের মাঝে দুই-একজন চা শ্রমিক ছাড়া আর কোনো জনমানব নেই। প্রত্যুষ দা প্রস্তাব দিলেন, পথপ্রদর্শক হিসেবে একজন শ্রমিককেই না হয় সঙ্গে নিয়ে নেই। এখানে চা শ্রমিকরাই একমাত্র ভরসা। বাতিন ভাইয়ের বাইকের পেছনে একজন শ্রমিককে নেওয়া হলো। ওর নাম সুজন। কিছু দূর এগিয়ে সুজন বলল, ‘সামনের পথটুকু হেঁটে যেতে হবে।’

সেকি! আমরা না হয় হেঁটেই গেলাম; কিন্তু এই জঙ্গলে মোটরবাইকগুলোর কি গতি হবে কিংবা কোথায়ই বা রেখে যাব? আমাদের দুশ্চিন্তার হাত থেকে রক্ষা করতে সুজনই এগিয়ে এলো। ওর পরিচিত আরেক শ্রমিককে আমাদের ফেরা পর্যন্ত বাইক পাহারার দায়িত্ব দেওয়া হলো। সিএনজিচালক কিছুতেই থাকবে না। অনেক অনুরোধ আর ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাসে সে রাজি হলো।

এই অন্ধকার পথে মোবাইলের আলো আর ছোট টর্চলাইটই ভরসা। ২০ মিনিট হাঁটার পর সুজনকে বেশ দ্বিধাগ্রস্ত মনে হলো। জানালো পথ হারিয়েছে সে। বাগানের এই অংশে আমাদের আসা হয়নি এর আগে কখনো। তাই বেশ মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সুড়ঙ্গটা বোধহয় আর দেখা হলো না। একই সঙ্গে চা বাগানে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছাটাও উবে গেল এক নিমেষে। কি আর করা, সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হলো আগামীকাল সকালে আবার হারং হুরং অভিযান শুরু হবে। সুজনের সহযোগিতায় পথ হাতরেই ফিরতে হলো আমাদের।

পরদিন সকালে আরো চারজন যোগ দিল আমাদের দলে। পিয়াল, শুভ, মাসুক আর বাবর। আজও সুজন আছে আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে। দিনের আলোয় এবার আর পথ চিনতে তেমন একটা সমস্যা হলো না। হিলুয়াছড়ার ১৪ নম্বর সেকশনে এই সুড়ঙ্গ। সিলেট অঞ্চলে জনশ্রুতি আছে, ১৩০৩ সালে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সিলেটে আগমনের খবর পেয়ে রাজা গৌড় গোবিন্দ তাঁর সৈন্য-সামন্তসহ একটি সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালিয়ে যান। আর হারং হুরংই নাকি সেই সুড়ঙ্গ। সিলেটী শব্দ ‘হুরং’ অর্থ ‘সুড়ঙ্গ’। ছোট পাহাড়ঘেরা এক খণ্ড ফাঁকা জায়গা। এরই এক পাশে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ। বাইরে থেকেই বেশ বোঝা যাচ্ছে ভেতরটা খুবই অন্ধকার। সাবধানে কয়েক পা এগিয়ে বোঝা গেল ভেতরের পথ সংকুচিত হয়ে এসেছে। এত ছোট সুড়ঙ্গ দিয়ে কিভাবে  সেনাদের পুরো একটি বাহিনী চলে গেল, তা বোধগম্য হলো না। জিজ্ঞেস করতেই সুজন জানাল, ‘সুড়ঙ্গটি আগে বেশ বড়ই ছিল। নানা কারণে ধীরে ধীরে এটি ছোট হয়ে এসেছে। এই সুড়ঙ্গ দিয়ে নাকি জৈন্তা রাজবাড়িও যাওয়া যেত।’

সুড়ঙ্গটা প্রচণ্ড স্যাঁতসেঁতে, দেয়ালে শ্যাওলা। মোবাইলের আলোয় সুড়ঙ্গের অন্ধকার ভেদ করা গেল না। ভেতরে যাওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হলো। এমন জায়গায় বিষাক্ত সাপ, পোকামাকড় থাকাটা তো খুবই স্বাভাবিক। হয়তো অনেক রহস্যও লুকিয়ে রয়েছে এখানে। তবে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে এলে হয়তো এর ভেতরটা দেখা যেতে পারে। যদিও তেমন দুঃসাহস এখন পর্যন্ত কেউ করেনি।

 

কিভাবে যাবেন

ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, রাজারবাগ ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রিনলাইন, শ্যামলী, সৌদিয়া, এস আলম, এনা, হানিফ বা বিআরটিসি বাসে সিলেট (এসি বাস ৮০০, নন-এসি ৪৮০ টাকা ভাড়া)। শহর থেকে মালনিছড়া চা বাগান যেতে পারেন। ভাড়া রিকশায় ৩০ টাকা, সিএনজি অটোরিকশা ৬০-৮০ টাকা। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালে আন্তনগর পারাবাত, দুপুরে জয়ন্তিকা ও কালনী এবং রাতে উপবন সিলেটের পথে ছোটে। নন এসি-এসি ভাড়া ১৫০ থেকে ১০১৮ টাকা। সিলেটের আম্বরখানা থেকে অটোরিকশায় সেখানে যাওয়া যায়। গাইড হিসেবে একজন চা শ্রমিক সঙ্গে নিলে ভালো হয়।

 



মন্তব্য