kalerkantho


চট্টগ্রামে সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল কবে হবে?

নূপুর দেব   

৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



চট্টগ্রামে সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল কবে হবে?

... চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও চিকিৎসাসেবায় অনেক পিছিয়ে আছে। সরকারিভাবে ঢাকায় বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকলেও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে একটিও নেই।

এখানে কার্ডিওলজি, অর্থোপেডিক, মা ও শিশু, কিডনি, বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি, মানসিক রোগসহ কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে...

 

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে। এই বন্দর দেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ডও। মোট আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগই বৃহত্তম এ বন্দর দিয়ে অর্জিত হয়। বন্দর ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হওয়ায় বন্দরনগরী চট্টগ্রাম বাংলাদেশের রাজস্বের অন্যতম জোগানদাতাও। সাগর-নদী-পাহাড় ঘেরা নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আধার বন্দরনগর চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এই নগরকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।

রাজধানী ঢাকার পর চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করা হলেও এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠী চিকিৎসাসেবায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। সরকারিভাবে ঢাকায় অনেকগুলো বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকলেও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই। সরকারের কাছে একাধিক বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপনের দাবি বিভিন্ন মহল থেকে ওঠলেও তা যে তিমির সে তিমিরেই রয়েছে। দাবিগুলো আলোর মুখ দেখছে না।

চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস। বিভাগের একমাত্র বৃহৎ সরকারি হাসপাতাল চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। ৫০০ শয্যার অবকাঠামোতে একের পর এক শয্যা বাড়তে বাড়তে বর্তমানে ১৩১৩ তে পৌঁছেছে। বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে রোগীরা সরকারি এ হাসপাতালে আসেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৩১৩ শষ্যা হলেও প্রতিদিন ওয়ার্ডে ভর্তি থাকে গড়ে ২৮শ রোগী। এছাড়া আউটডোরে চিকিৎসা নেন কয়েক হাজার রোগী। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি হন। এতে হিমশিম খান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রয়েছে মাত্র ১২ শয্যার আইসিইউ। বিশেষায়িত হাসপাতাল না থাকার কারণে চমেক হাসপাতালে রোগীর এই অত্যধিক চাপ।

শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি পর্যায়েও বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই। বিশেষায়িত হাসপাতালের অভাবে এখানকার রোগী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন। আবার অনেকে দেশের বাইরেও যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামে কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল খুবই জরুরি। সবার তো আর্থিক অবস্থা ভালো নেই। টাকার অভাবে অনেকে চিকিৎসা করাতে পারেন না। তাই সরকারিভাবে চট্টগ্রামে কার্ডিওলজি, অর্থোপেডিক, মা ও শিশু, শিশু, কিডনি, বার্ন অ্যান্ড প্লাষ্টিক সার্জারি, মানসিক রোগসহ কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল অত্যন্ত জরুরি। অনেক বিলম্ব হয়েছে। আর সময়ক্ষেপণ না করে জরুরিভিত্তিতে বিশেষায়িত হাসপাতাল করলে এই অঞ্চলের মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে না।

অবশেষে বিশেষায়িত হাসপাতাল না থাকার বিষয়টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নজরে আসলে তা শুনে তিনি বিস্মিত হন। গত রবিবার দুপুরে নগরীর সার্কিট হাউসে চট্টগ্রাম বিভাগের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাগণের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনায় এই কথা শোনেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

এ সময় মোহাম্মদ নাসিম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশেষায়িত হাসপাতাল করতে কখনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি! এটা দ্বিতীয় রাজধানী, বাণিজ্যিক রাজধানী বলে। এসব (বিশেষায়িত হাসপাতাল) করতে হলে আমাদের আরেক মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে হবে। ’

বিএমএ চট্টগ্রামের নেতাদের উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এটা আপনাদের ব্যর্থতা। বিশেষায়িত হাসপাতালের কথা এতদিন বলেননি কেন? শিশু হাসপাতালের জন্য টাকা বরাদ্দ হয়েছে। দ্রুত জমি বের করে দেন। ’

মন্ত্রীর বক্তব্যের আগে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের পাঁচ শ বেডের হাসপাতাল। ১৩১৩ শয্যার অনুমোদন আছে খাবার আর বরাদ্দের জন্য। কিন্তু এখানে রোগী পাবেন তিন হাজার। স্থানের স্বল্পতার জন্য রোগী ফ্লোরে, বারান্দায় এমনকি সিঁড়িতে পর্যন্ত রেখেছি। স্থানাভাব দূর করার প্রস্তাব দিয়েছি। ২০১৬ সালে পিইসি সভা হয়েছে। একনেকে মিটিংও হয় হসপিটাল-২ করার জন্য, হয়নি। রোগীর স্থান সংকুলানের জন্য এক হাজার শয্যা ধারণক্ষমতার একটি ১৪তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেন পরিচালক। ওই ভবন হলে এক হাজার জনের ব্যবস্থা হবে। আর দেড় হাজার জনের দায়িত্ব কমিয়ে ফেলব। ’ তিনি আরও বলেন, ‘তিন হাজার জনের মধ্যে ছয়শটি শিশু রয়েছে, নগরীতে একটি শিশু হাসপাতাল করা গেলে সেই চাপ কমবে। একটি কার্ডিয়াক হাসপাতাল করা গেলে কমবে আরও সাড়ে তিনশ রোগী। ট্রমা হাসপাতাল করলে কমবে আরও পাঁচশ রোগী। ’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জালাল উদ্দিন বলেন, ‘সাংবাদিকরা আমাকে বলে-ঢাকায় একাধিক বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে। চট্টগ্রামে একটাও নেই। চট্টগ্রামের বিষয়ে কি আমরা তাহলে শীতল?’

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি অধ্যাপক ডা. মজিবুল হক খান গত সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজধানী ঢাকার পর চট্টগ্রামের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও বিশেষায়িত চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। দেশ স্বাধীনের এতো বছর পরও একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল চট্টগ্রামে না থাকাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আগের কোনো সরকার বিশেষায়িত হাসপাতাল করার দিকে নজর দেয়নি। বর্তমান সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। তা যেন আলোর মুখ দেখে সরকারের কাছে আমরা সেই দাবি জানিয়েছি। ’

চমেক হাসপাতালের নাক কান গলা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মুজিবুল হক খান আরও বলেন, ‘বিশেষায়িত হাসপাতাল যে কতো প্রয়োজন চট্টগ্রাম মেডিক্যালে গেলে তা বোঝা যায়। চট্টগ্রাম বিভাগের এমন কোনো জায়গা নেই যেখান থেকে রোগী আসছে না। কিন্তু রোগীর অধিক চাপের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া কষ্ট হয়ে যায়। এই কারণে আমরা বিএমএ থেকে বারবার দাবি জানিয়ে আসছি চট্টগ্রামে কার্ডিওলজি, বার্ন, ট্রমা ও শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল করার জন্য। শিশু হাসপাতালের জন্য সরকার অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। আমরা দুটি জায়গা চিহ্নিত করেছি। ’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘‘চট্টগ্রামকে ‘গ্রাম’ হিসেবে দেখলে হবে না। অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের গুরুত্ব থাকলেও চিকিৎসা ক্ষেত্রে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল না হওয়াটা আমাদের জন্য দুঃখজনক। ঢাকায় বক্ষব্যাধি, হৃদরোগ, কিডনি, শিশুসহ আরও বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল আছে। কিন্তু দেশের ২য় বৃহত্তম চট্টগ্রাম মহানগরে একটিও নেই বিশেষায়িত হাসপাতাল। বর্তমান সরকার প্রথমবারের মতো ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশেষায়িত একটি শিশু হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এটা চট্টগ্রামবাসীর জন্য সুখবর। এখানে সরকারিভাবে একটি চক্ষু হাসপাতালও খুবই জরুরি। ’’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের ডিন ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিভাগের প্রায় সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যা হলেও বিশেষায়িত হাসপাতালের অভাবে এই অঞ্চলের মানুষকে অন্যত্র যেতে হচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যালে রোগীর যে চাপ তা কমানোর জন্য এই মুহূর্তে অন্তত ৪/৫টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রয়োজন। নগরের কোনো একটি স্থানে ২৫/৩০ একর জায়গায় কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল করা যাবে। এতে করে রোগীদেরও সুবিধা হবে। কোনো জটিল রোগের জন্য তাত্ক্ষণিক মেডিক্যাল বোর্ডও করা যাবে। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে এক সঙ্গে করা না গেলে আলাদাভাবেও বিশেষায়িত হাসপাতাল করার। বিশেষায়িত হাসপাতাল হলে চিকিৎসা সেবার মান আরও বাড়বে। ’

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. মোহাম্মদ শরীফ বলেন, ‘সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোর মধ্যে দেশে একমাত্র কার্ডিয়াক সার্জারির ইউনিটটি চট্টগ্রামেই আছে। অন্য কোথাও নেই। বর্তমান সরকারের আমলে চট্টগ্রামে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তুর করার কথা আছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে সরকারের অনেক সাফল্য থাকলেও চট্টগ্রামে বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই। বিশেষায়িত হাসপাতালের জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিএমএ থেকে দাবি জানিয়ে আসছি। বিশেষায়িত হাসপাতাল হলে রোগীরা আন্তর্জাতিকমানের চিকিৎসাসেবা পাবেন। ’ তিনি জানান, চট্টগ্রামে বিশেষায়িত হাসপাতাল হলে ঢাকার সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতেও চাপ কমে যাবে।


মন্তব্য