kalerkantho


ফুলের গ্রাম চরখাগরিয়া

জাহাঙ্গীর আলম, সাতকানিয়া   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ফুলের গ্রাম চরখাগরিয়া

ফুলচাষে গ্রামের অনেক কৃষক হয়েছেন লাখপতি। ছবি : কালের কণ্ঠ

সাতকানিয়ার চরখাগরিয়ায় ফুলের বাণিজ্যিক আবাদ হচ্ছে। অন্য ফসলের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় ফুলচাষে ঝুঁকেছেন কৃষক।

এতে পাল্টে গেছে অনেকের দিন। আর্থিক দৈন্যতা কাটিয়ে হয়েছেন লাখপতি। কর্মসংস্থান হয়েছে শত শত নারী-পুরুষের। এখানকার প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে ফুলের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। ইতোমধ্যে ‘ফুলের গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে গ্রামটি।

উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নের চরখাগরিয়ার মেঠোপথে হাঁটা শুরু করলেই চোখে পড়বে ফুলবাগান। চারদিকে লাল, নীল, সাদা, হলুদ, গোলাপি ও খয়েরি রঙের ছড়াছড়ি। যতদূর চোখ যায় রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, গাঁদা, জবা, ডায়মন্ড, গরম ফেনিয়া, রতপুসুটি, টুনটুনি, বেলি, জারবেরা, জিপসি, স্টারকলি বোতাম ফুল, ক্যালেন্ডেলা, ডালিয়া, সূর্যমুখী, স্বর্ণগুঁটি, চেরি, চন্দ্রমল্লিকা ও অলকানন্দাসহ নানান ফুলের সমারোহ। সড়কের দুপাশের বিলজুড়ে দৃষ্টিনন্দন ফুল আর ফুল।

বাতাসে ভেসে আসে ফুলের মোহনীয় গন্ধ। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা নারী, পুরুষ ও শিশুরা ক্ষেতে কাজ করেন। কেউ ফুল ছিঁড়ছেন। কেউ বাগানের আগাছা পরিষ্কারে ব্যস্ত। কেউ বা সার ও কীটনাশক প্রয়োগসহ পরিচর্যা করছেন। আবার অনেকে ছিঁড়ে আনা ফুল নিয়ে বাড়ির আঙিনায় বসে মালা গাঁথছেন। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধ নারীরা বসে ফুলগাঁথা, আঁটিবাঁধার কাজ করেন।

ফুলচাষিরা জানান, পুরো খাগরিয়া ইউনিয়নে কম বেশি ফুলচাষ হয়। তবে চরখাগরিয়ার প্রায় প্রতিটি পরিবার ফুলচাষে জড়িত। এখানকার কয়েক শ পরিবার ফুলচাষ করে। যেসব পরিবার ফুল চাষ করে না তাঁরাও নানাভাবে ফুলের সাথে জড়িয়ে আছেন। এমনকি স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলে মেয়েরাও অবসরে ফুল ছেঁড়া, মালা গাঁথাসহ নানা কাজে সহযোগিতা করে। ফুলচাষ চর খাগরিয়ার মানুষের অভাব দূর করে দিয়েছে। স্বাবলম্বি হয়ে ওঠেছে প্রায় পরিবার।

চরখাগরিয়ার ফুলচাষি আবদুল গফুরের দাবি, ১৯৯১ সালের দিকে তাঁর বড়ভাই আবদুল মোতালেবের হাত ধরে খাগরিয়ায় ফুলচাষের যাত্রা শুরু হয়। তিনি ১৯৮৮ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেন। পরিবারের অভাবের তাড়নায় পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা না করে চট্টগ্রামে একটি নার্সারিতে কাজ নেন। কিন্তু চাকরির বেতন দিয়ে বাবা-মা ও ভাই-বোনসহ ১২ জনের সংসারের চাকা ঘুরছিল না। অভাব লেগেই থাকত। কয়েক বছরের চাকরিতে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে গ্রামে ফিরে নেমে পড়েন ফুলচাষে। মোতালেব মাত্র ২০ শতক জমিতে গাঁদা ফুলের চাষ শুরু করেন। প্রথম বছর ভালো লাভ হয়। পরের বছর থেকে ফুলচাষের পরিমাণ বাড়ান। অন্যান্য ফসলের চেয়ে অধিক লাভজনক হওয়ায় পরিবারের সবাই ফুলচাষের দিকে মনোযোগ দেন। এর পর থেকে আর পেছনে ফিরে থাকাতে হয়নি। ফুলচাষে রাঙিয়ে যায় তাঁদের জীবন। পরিবারের সবাই মিলে ফুলচাষ করে ফিরিয়েছে সুদিন।

আবদুল গফুর বলেন, ‘শুরুর দিকে ফুল বিক্রির জন্য চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে যেতে হত। অনেক সময় সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হতাম। ফলে এভাবে কয়েক বছর যাওয়ার পর খাগরিয়ায় উৎপাদিত ফুলকে পুঁজি করে চট্টগ্রামের চেরাগী পাহাড়ের মোড় এলাকায় নিজেরাই স্টার পুষ্প বিতান নামে একটি দোকান দেই। আমাদের উৎপাদিত ফুলের পাশাপাশি অন্য জায়গা থেকে ফুল এনে ব্যবসা শুরু করি। বছরের পর বছর ফুলচাষ বাড়াতে থাকি। পরে আরো একটি দোকান দেই। ’ ‘কেটে গেছে আমাদের দুর্দিন। এক সময় অভাবের তাড়নায় ঠিকভাবে লেখাপড়া করতে পারিনি। এখন আর অভাব নেই। ফুলচাষ পুঁজি করে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি। এখন পাকাবাড়ি, গাড়ি, জমি সব হয়েছে। সব ভাই-বোনের বিয়ে হয়েছে। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছি। ’ যোগ করেন গফুর। তিনি জানান, চলতি বছর তাঁরা প্রায় ২০ কানি জমিতে ফুলচাষ করেছেন। ভবিষ্যতে আরো জমিতে ফুলচাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। জানা গেছে, বর্তমানে সাতকানিয়ার চরখাগরিয়া এবং চন্দনাইশের জাফরাবাদে প্রায় ৩০০ কানি জমিতে ফুলচাষ হয়।

চরখাগরিয়ার ওয়ালিপাড়ার সিকদারবাড়ির ফুলচাষি জাহাঙ্গীর আলম জানান, আট বছর বয়সে তাঁর মা মারা যান। বাবা আরেকটি বিয়ে করেন। সৎ মায়ের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে প্রথমে নার্সারিতে, পরে ফুলের দোকানে চাকরি নেন। আট বছর আগে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়ির পাশে খাজনা দিয়ে জমি নিয়ে ফুলচাষ শুরু করেন তিনি। প্রথম বছর মাত্র আট শতক জমিতে ফুলচাষ করে প্রায় ৪০ হাজার টাকা লাভ হয়। পরে ফুলচাষ বাড়াতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘এ বছর দুই কানি জমিতে ফুলচাষ করেছি। ফলনও খুব ভালো হয়েছে। ’

এলাকাবাসী জানান, চরখাগরিয়ার অন্তত কয়েক শ পরিবার ফুলচাষে জড়িত।

ফুলচাষিরা জানান, এখন ফুল বিক্রি করতে কোনো সমস্যা হয় না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফুল ছিঁড়ে, মালা গেঁথে তৈরি করে রাখা। রাতে ও ভোরে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে এসব ফুল শহরে নিয়ে যায়। এলাকার মহিউদ্দিন, রফিক আহমদ, হেলাল উদ্দিন, মোহাম্মদ শফি, আবদুস ছবুর, মোহাম্মদ ইলিয়াছ, কামাল উদ্দিন ও মোহাম্মদ ইকবালসহ অনেক যুবক ফুলচাষ করে পাল্টে নিয়েছেন নিজেদের ভাগ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে এখানকার ফুলের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। পহেলা বৈশাখ, থার্টি ফার্স্ট নাইট, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় ও বিশেষ দিবসে ফুলের দাম খুব ভালো পাওয়া যায়।

তবে চাষিরা জানান, গত কয়েক বছর বিদেশ থেকে প্লাস্টিকের ফুল আমদানি হওয়ায় কাঁচা ফুলের দাম একটু কমে গেছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাঁচা ফুলের পাশাপাশি প্লাস্টিকের ফুলও ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁরা বলেন, প্লাস্টিকের ফুল আমদানি কমিয়ে সরকার ফুলচাষে পৃষ্ঠপোষকতা করা দরকার।

সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শোয়েব মাহামুদ জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কম বেশি ফুলচাষ হয়। তবে খাগরিয়ায় ব্যাপকভাবে ফুলচাষ হচ্ছে। চরখাগরিয়ার কয়েক শ কৃষক ফুলচাষে জড়িত। এখানকার কৃষক চন্দনাইশের জাফরাবাদ এলাকায়ও ফুলচাষ করেন।

তিনি বলেন, ‘ফুলচাষ করে কৃষক বেশ লাভবান হচ্ছেন। শুধু ফুলচাষ করেই অনেক কৃষকের পাল্টে গেছে জীবন। অনন্য ফসলের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় কৃষক দিনদিন ফুলচাষে ঝুঁকে পড়ছেন। এখানে বিভিন্ন জাতের ফুলচাষ হয়। ’


মন্তব্য