kalerkantho


চাকরি পাচ্ছেন না প্রশিক্ষিত নারী নাবিকরা

‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও স্পিকার তিনজনই নারী। দেশের সব সেক্টরে নারীরা এগোচ্ছেন। নারীরা সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে পারলে, জাহাজ কেন চালাতে পারবেন না? অথচ সমুদ্রপেশায় নারীদের আগ্রহী ও উৎসাহিত করার জন্য পাশের দেশ ভারত সরকার নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। ফলে ভারতে নৌ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নারী ক্যাডেটদের সংখ্যা বাড়ছেই।’

শিমুল নজরুল ও আসিফ সিদ্দিকী   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চাকরি পাচ্ছেন না প্রশিক্ষিত নারী নাবিকরা

প্রশিক্ষণ শেষে পুরুষ নাবিকরা চাকরি পেলেও নারী নাবিকরা এখনো সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশ সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর থেকে একাধিকবার নির্দেশ দেওয়া হলেও নারী নাবিকদের নিয়োগের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি বেসরকারি শিপিং সংস্থাগুলো। জাহাজ চালানোর জন্য সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি, সফলভাবে প্রশিক্ষণ সবই নিয়েছেন দেশের নারী মেরিন ক্যাডেটরা।

পরীক্ষামূলকভাবে সমুদ্রগামী জাহাজ চালানোর সক্ষমতাও অর্জন করেছেন এই অদম্য নারীরা। পারদর্শী হওয়ার পরও সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় এই নারীরা জাহাজ চালিয়ে দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন না। এই ধরনের নারী ক্যাডটের সংখ্যা কমপক্ষে ৫৪ জন। একবছর পর এই সংখ্যা বেড়ে ৬১ তে দাঁড়াবে।

একই সক্ষমতা অর্জন করলেও পুরুষরা দেশি-বিদেশি জাহাজে চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু বঞ্চিত হচ্ছেন বাংলাদেশের নারী মেরিনাররা। দেশি-বিদেশি জাহাজ কম্পানি বিভিন্ন অজুহাতে কেউ তাঁদের চাকরিতে নিতে চাইছে না। মেরিন একাডেমি থেকে পাস করা প্রথম চারটি ব্যাচের ৫৪ জন নারী ক্যাডেট এখনো বেকার।

ক্ষুব্ধ ও হতাশ কণ্ঠে নারী ক্যাডেট সালমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের নিশ্চয়ই পরিকল্পনা ছিল না আমরা পাস করলে কোথায় চাকরি করব।

থাকলে আমাদের এই করুণ অবস্থা হত না। ভর্তি করানোর আগে এটি বললেই হত। ’

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনে আমরা (একবছরের প্রশিক্ষণ) ইন্টার্নির জন্য গেলে সেই বছর থেকেই সম্মানি বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মা-বাবা থেকে টাকা নিয়ে এসে জাহাজে ইন্টার্নি সমাপ্ত করেছি। বিএসসির কাছে ধন্যবাদ তারা অন্তত আমাদের সনদ অর্জনে সহযোগিতা করেছেন। তা না হলেও সেটাও আমরা পেতাম না। ’

সালমা বলেন, ‘বেসরকারি সব জাহাজ কম্পানি, নাবিক নিয়োগকারী কম্পানিগুলোর কাছে ধরনা দিয়েছি। কিন্তু আমরা নারী বলে তারা আমাদের চাকরি দেয়নি। একাডেমিতে পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে সবখানে সমান দক্ষতার সাথে উত্তীর্ণ হলেও চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে মেরিন একাডেমি থেকে পাস করে এখন মা বাবার কাছে নিজেকে বোঝা মনে হচ্ছে। তবে দমে যাইনি। ’

সালমা বলেন, ‘দেশি পতাকাবাহী জাহাজগুলোতে প্রতিটিতে দুজন করে নারী ক্যাডেট দেয়ার বাধ্যবাধকতা করা হলেও সেটি মানা হচ্ছে না। দেশি জাহাজগুলো যদি নারীদের চাকরি দিতে এগিয়ে না আসে তাহলে বিদেশি জাহাজগুলো কিভাবে চাকরি দেবে। ’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেন। ’ তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বিএসসি জাহাজে প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নির পর আমাকে তো কাজ দেখানেরা জন্য চাকরির সুযোগ দেয়া হয়নি। তাহলে কিভাবে আমার দক্ষতা দেখাবো?’

শিপিং সংশ্লিষ্টরা জানান, সমুদ্রগামী জাহাজে মেরিন অফিসার ও ইঞ্জিনিয়ার তৈরির সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। প্রতি বছর সেখান থেকে ৩শ জন ডিগ্রি অর্জন করলেও এতদিন নারী ক্যাডেট ভর্তির সুযোগ ছিল না। ২০১২ সাল থেকে মেরিন একাডেমির ৪৮তম ব্যাচে বাংলাদেশের প্রথমবারের মতো ১৬ জন নারী ক্যাডেট ভর্তি করা হয় মেরিন একাডেমিতে। এরপর ৪৯তম ব্যাচে ১৯ জন, ৫০তম ব্যাচে ১৩ জন ভর্তি হয়। এরপর ৫১তম ব্যাচে ৬ জন ভর্তি হওয়ার পর ৫২তম ব্যাচে কোনো নারী ক্যাডেট ভর্তি হয়নি। এই চারটি ব্যাচের ৫৬ জন নারী নাবিকের এখনো কোনো কর্মসংস্থান হয়নি। এ অবস্থায় চলতি বছর মেরিন একাডেমির ৫৩তম ব্যাচে আরো সাতজন নারী ক্যাডেট ভর্তি হয়েছেন।

ক্যাডেটরা জানান, মেরিন একাডেমি থেকে দুই বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রি নেয়ার পর, সমুদ্রগামী জাহাজে একবছরের প্রশিক্ষণ (সি টাইম) নিতে হয়। এরপর সরকারি সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরে পরীক্ষা দিয়ে জুনিয়র অফিসার হিসেবে সনদ অর্জন করতে হয়। এর পরই তাদের জাহাজ চালানোর মূল পেশায় যোগ দেওয়ার কথা।

এই সময়ে তাঁদের প্রতি মাসে বেতন হওয়ার কথা ২ হাজার থেকে ২৫০০ মার্কিন ডলার। এর পর বিভিন্ন পেশাগত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং দক্ষতার সাথে জাহাজ চালানোর পর ৮-১০ বছরের মধ্যে জাহাজের ক্যাপ্টেন বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার হন। তখন তাঁর বেতন হয় ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার মার্কিন ডলার।

ক্ষুব্ধ বেকার একাধিক নারী নাবিকরা বলেন, প্রশিক্ষণ শেষ করে বেকার বসে আছি। এই সময়টাতে চাকরি করে পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করার কথা। উল্টো এখনো পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলতে হচ্ছে।

নারী ক্যাডেটরা আরো বলেন, বিভিন্ন শিপিং প্রতিষ্ঠানে আমাদের চাকরির আবেদন জমা পড়ে আছে। কেউ আমাদের নিতে চাচ্ছে না। সরকার নারী মেরিন ক্যাডেটদের ব্যাপারে কঠোর না হলে বেসরকারি শিপিং কম্পানিগুলো আমাদের চাকরি দেবে না। দেশের বিভিন্ন বন্দরে পাইলট হিসেবে, ডিজি শিপিং কিংবা শিপিং মাস্টারের কার্যালয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী ক্যাডেটদের কর্মসংস্থান করার ব্যাপারে সরকার    উদ্যোগ নিতে পারে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। ’

এ বিষয়ে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর আরিফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেসরকারি শিপিং কম্পানিগুলোকে নাবিক নিয়োগের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা চাপিয়ে দিতে চাই না। নারীদের চাকরি দিতে সমুদ্রগামী জাহাজ মালিকদের সাথে আলোচনা হয়েছে। জাহাজ মালিক পক্ষ থেকে এখনো কোনো সাড়া মেলেনি। ’

জানা গেছে, মেরিন একাডেমি থেকে পাস করা ক্যাডেটরা এক বছরের জন্য যেকোনো সমুদ্রগামী জাহাজে হাতে কলমে জাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণের (সি টাইম) নিয়ম রয়েছে। বাংলাদেশে বেসরকারি জাহাজ কম্পানিগুলো পুরুষদের সেই সুবিধা দিলেও দিচ্ছে না নারী ক্যাডেটদের। এক্ষেত্রে জাহাজ কম্পানিগুলো নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) এগিয়ে এসে সেই কাজটি করার সুযোগ দিচ্ছে। যদিও বিএসসির বহরে এখন জাহাজের সংখ্যা কমে মাত্র তিনটিতে ঠেকেছে। তার পরও বিএসসি গত পাঁচ বছরে ৩৫ জন নারী ক্যাডেটকে জাহাজ চালানোর একবছরের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। আরো ১৩জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন বিএসসির জাহাজে। মেরিন একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ শেষ করে সি টাইম করার সুযোগ পাননি ৫১তম ব্যাচের ৬ জন নারী ক্যাডেট। তবে বিএসসির বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে প্রশিক্ষণের সময় তারা নারী ক্যাডেটদের ভাতা দিচ্ছে না।

এ বিষয়ে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতি জাহাজে দুজন করে নারী ক্যাডেট প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলেও এখন বিএসসির জাহাজের সংখ্যা কমে তিনটিতে দাঁড়িয়েছে। প্রতি জাহাজে সর্বোচ্চ আমরা দুজন নিতে পারি, কিন্তু প্রথম নারী ক্যাডেটদের এই পেশায় উৎসাহিত করা এবং কর্মক্ষেত্রের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রতি জাহাজে ৬ থেকে ৮ জনকে প্রশিক্ষণের সুযোগ দিচ্ছি। আমাদের জাহাজ বেশি থাকলে আরো বেশি প্রশিক্ষণের সুযোগ পেত নারীরা। ’

তিনি আরো বলেন, ‘নারী ক্যাডেটদের এই পেশায় উৎসাহিত করতে আমি নিজে উদ্যোগী হয়ে বেসরকারি জাহাজ মালিকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে অনুরোধ করলেও সাড়া মিলেনি। এ বিষয়ে ডিজি শিপিং থেকে নির্দেশনা থাকলেও বেসরকারি শিপিং প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো নারী ক্যাডেটদের চাকরি দিচ্ছে না। ’

জানা গেছে, বাংলাদেশি মালিকানাধীন সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা বর্তমানে ৩৫টি। এগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য পরিবহনের কাজ করছে। সেখানে বাংলাদেশি পুরুষ ক্যাডেটরা কাজ করলেও কোনো নারী ক্যাডেটের স্থান হয়নি।

এ প্রসঙ্গে সরকারি ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ফয়সাল আজিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্লু ইকনোমিতে প্রবেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নারীদের সমানভাবে অগ্রণী ভূমিকা রাখার পরিকল্পনা নিতে হবে এখনই। প্রথমদিকে হয়তো একটু মানিয়ে নিতে সমস্যা হবে। কিন্তু ধাপে ধাপে তার উত্তরণ ঘটবে নিশ্চয়ই। কারণ আমাদের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার তিনজনই নারী। দেশের সব সেক্টরে নারীরা এগোচ্ছে। নারীরা সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে পারলে, জাহাজ কেন চালাতে পারবে না?’

জানা গেছে, সমুদ্রপেশায় নারীদেরকে আগ্রহী ও উৎসাহিত করার জন্য ভারত সরকার ৫০ শতাংশ হ্রাসকৃত ফি এবং ন্যূনতম বয়সের ক্ষেত্রে ২ বছর শিথিল করেছে। ফলে ভারতে নৌ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নারী ক্যাডেটদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯৯ সালে কলকাতার সোনালী বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের প্রথম ফিমেল মেরিনার (মেরিন ইঞ্জিনিয়ার) হিসেবে সমুদ্রগামী জাহাজে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি চিফ ইঞ্জিনিয়ার। এর পরে ২০০৪ সালের মধ্যে এই পেশায় আসেন কবিতা মিনাতুর, জ্যোতি কুমারী (বর্তমানে চিফ ইঞ্জিনিয়ার)। এর পর থেকে ভারতে নারী মেরিনারদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।


মন্তব্য