যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নতুন একটি তদন্ত শুরু করেছে। এই তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে, চীনা দাতাদের দেওয়া অর্থ দিয়ে পরিচালিত কিছু বৃত্তি কর্মসূচিতে মার্কিন শিক্ষার্থীদের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে কি না।
সোমবার বিচার বিভাগ এই তদন্তের ঘোষণা দেয়। তবে কোন বৃত্তি কর্মসূচি বা কোন দাতাদের দেওয়া অর্থ নিয়ে তদন্ত হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। এটি হার্ভার্ডের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু করা ধারাবাহিক ফেডারেল তদন্তের নতুন সংযোজন। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন, ভর্তি নীতি এবং বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিসহ বিভিন্ন বিষয়েও তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন। বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, হার্ভার্ড বিদেশি অর্থায়ন নিয়ে যে তথ্য সরকারের কাছে জমা দিয়েছে, তা পর্যালোচনা করে তাদের মনে হয়েছে, কিছু বৃত্তি কর্মসূচিতে মার্কিন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্য হয়ে থাকতে পারে। তবে তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
তদন্তের মূল বিষয় হলো, হার্ভার্ডের কিছু চীনভিত্তিক আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি। বিচার বিভাগের দাবি, কয়েকজন চীনা দাতা এমন শর্ত দিয়ে অর্থ দিয়েছেন, যার সুবিধা শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীরা পেতে পারেন। বিচার বিভাগের মতে, কোনো বৃত্তি বা আর্থিক সহায়তা যদি শিক্ষার্থীর জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে। এ বিষয়ে হার্ভার্ড জানিয়েছে, তারা বিচার বিভাগের পাঠানো নোটিশ পর্যালোচনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, তারা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবৈধ বৈষম্য করে না। বিচার বিভাগের নাগরিক অধিকার বিভাগের প্রধান হারমিত ধিল্লন বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একদিকে ফেডারেল সরকারের অর্থ নিতে পারে না, আবার বিদেশি উৎস থেকে এমন অর্থও নিতে পারে না, যার শর্ত অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে মার্কিন নাগরিকদের বৃত্তি থেকে বাদ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, এমন কোনো ঘটনা পাওয়া গেলে বিচার বিভাগ তা বন্ধ করতে ব্যবস্থা নেবে।
অন্যদিকে, লিখিত বিবৃতিতে হার্ভার্ড বলেছে, বিদেশি অনুদান গ্রহণ ও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা আইন মেনে চলে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টাইটেল সিক্স আইনের আওতায় আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সময় জাতি, জাতিগত পরিচয় বা জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো অবৈধ বৈষম্য করা হয় না। এদিকে, ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ চ্যাং বলেছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা দুই দেশের জন্যই উপকারী। তিনি বলেন, স্বাভাবিক শিক্ষা ও একাডেমিক বিনিময়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়। হার্ভার্ডসহ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার অনুদান এবং বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে অর্থ পেয়ে থাকে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের বিদেশি অর্থায়নে আরো বেশি স্বচ্ছতা দাবি করে আসছে। প্রশাসনের দাবি, প্রতিদ্বন্দ্বী বিদেশি দেশগুলোর অর্থায়ন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে হার্ভার্ড চীনা উৎস থেকে মোট ৬৩ কোটি মার্কিন ডলার পেয়েছে। আর সব মিলিয়ে বিদেশি উৎস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে এই অর্থের মধ্যে কোনটি তদন্তের আওতায় এসেছে তা জানানো হয়নি। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এটি সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে শুরু করা আইন মেনে চলার তদন্ত। বাইরের কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু হয়নি। হার্ভার্ডের নীতিমালা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদেরও মার্কিন শিক্ষার্থীদের মতো আর্থিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে বৃত্তি দেওয়া হয়। যদিও ফেডারেল সরকারের অনুদান ও কিছু সরকারি সহায়তা শুধু মার্কিন শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত, তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে বিদেশি শিক্ষার্থীরাও বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, হার্ভার্ডের নিজস্ব বৃত্তি ও ক্যাম্পাসে কাজের সুযোগ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত।
কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি দাতারা নির্দিষ্ট দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা তহবিলও গঠন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অনুদান আসে ২০১৪ সালে। সে সময় চীনের রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান সোহো চায়নার সহপ্রতিষ্ঠাতা পান শিই এবং ঝ্যাং শিন হার্ভার্ডকে ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান দেন। এই অর্থ বিশেষভাবে চীনা শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তার জন্য দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই অনুদান তখন চীনের ভেতরেও সমালোচনার মুখে পড়ে। সমালোচকদের দাবি ছিল, এই অর্থ বিদেশে না দিয়ে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত ছিল। বিচার বিভাগের দাবি, এই মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন রয়েছে। তাদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তিগত অনুদান নির্দিষ্ট দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে এবং সেই অর্থ ব্যবহার করে অন্যদের বাদ দেওয়া হয়, তাহলে তা মার্কিন নাগরিকদের নাগরিক অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিচার বিভাগের ভাষ্য, হার্ভার্ড দাতাদের এমন শর্তযুক্ত অর্থ গ্রহণ করছে এবং সেই শর্ত মেনে সম্ভবত চীনা শিক্ষার্থীদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। এতে অন্য দেশের শিক্ষার্থীরা, এমনকি মার্কিন নাগরিকরাও বঞ্চিত হতে পারেন।
এই তদন্ত এমন সময় শুরু হয়েছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন ও হার্ভার্ডের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধ চলছে। উচ্চশিক্ষায় কথিত ‘ওক’ সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং ক্যাম্পাসে অভিযোগ থাকা ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নামে ট্রাম্প প্রশাসন হার্ভার্ডের ওপর একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর আগে এক ফেডারেল বিচারক হোয়াইট হাউসকে হার্ভার্ডের জন্য নির্ধারিত শত শত কোটি ডলারের গবেষণা তহবিল বন্ধ করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেন। তবে এরপরও প্রশাসনের চাপ কমেনি। বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ভর্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নীতি নিয়ে নতুন নতুন তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। সবশেষ শুরু হওয়া এই তদন্তের মাধ্যমে হার্ভার্ডের অর্থায়ন, বৃত্তি নীতি এবং বিদেশি অনুদান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চলমান বিরোধ আরো বিস্তৃত হলো।





