kalerkantho


চক্ষে আমার তৃষ্ণা

জয়নাল আবেদীন   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৫:৪২



চক্ষে আমার তৃষ্ণা

-স্যার আমি আত্মহত্যা করব!

চেয়ারে বসেই মেয়েটি এমনভাবে কথাটা বলল যেন কোন একটা দাবি জানাচ্ছে। "আমি ভাত খাব, আমি ফুটবল খেলব" ধরনের দাবি।
আমি মেয়েটার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথাটা নেয়ার চেষ্টা করলাম। মেয়েটা ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে। চিবুক বেয়ে এক ফোঁটা ঘাম নেমে আসছে। চোখ ফোলা ফোলা। রাতে যে ঘুম হয়নি এটা জিজ্ঞেস না করেও বলা যায়।

সুতরাং সে আত্মহত্যা করবে কিনা এটা আমলে নেয়ার আগে সে যে সত্যি সত্যিই কোনও সমস্যায় আছে এটা বিশ্বাস করতে হলো। তাছাড়া একটা অতি সূক্ষ্ম কারণে তার কথা আমি একটু বেশি বিশ্বাস করলাম। বর্তমান প্রজন্ম "আত্মহত্যা" বলতে অভ্যস্ত না, "সুইসাইড" বলতে অভ্যস্ত। তার আত্মহত্যা বলার মানে হচ্ছে সে সিরিয়াস মুডেই আছে।

সাধারণ মানুষের কাছে 'আত্মহত্যা' আর 'সুইসাইড' এর মাঝে কোন পার্থক্য নেই। সাইকোলজিস্টদের কাছে বিশাল পার্থক্য।

আমি টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু বের করে বললাম, আপনি মুখের ঘাম মুছুন। ঠান্ডা হয়ে বসুন। পানি খেতে চাইলেও আনা যেতে পারে। ফ্রিজের ঠান্ডা পানি আছে।

মেয়েটি দ্রুত ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে বলল, ধন্যবাদ স্যার। আমার কাছে টিস্যু আছে। পানি খাব না।

আমি বললাম, আপনার সমস্যা একটু পরে শুনব। তার আগে আপনার নাম বয়স আর কি করেন জানতে চাই।

- আমার নাম তানজিনা। বয়স ২৩। ইংলিশ ফাইনাল ইয়ার। আমাকে তানজি বলতে পারেন।

আমি প্যাডে লিখে বললাম, ধন্যবাদ তানজি। আপনাকে আমার প্রথম প্রশ্ন, আপনি কি সত্যিই আত্মহত্যা করবেন?

-জ্বি। এখন পর্যন্ত এটাই সিদ্ধান্ত। উপায়ও বের করে রাখা।

তারপর মেয়েটি আমাকে খানিকটা অবাক করে দিয়ে ব্যাগ থেকে ৬ পাতা ফ্রেনজিট বের করল। আমার টেবিলের সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বলল, অনেক কষ্ট করে ৬ টা ফার্মেসি থেকে কিনতে হয়েছে। একটা প্রেসক্রিপশন দিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে কিনলাম।

আমি আরো খানিকটা নিশ্চিত হলাম মেয়েটা সিরিয়াস। সাইকোলজিস্টদের নিয়ম হচ্ছে সব কিছুকেই সিরিয়াসলি নেয়া। আমি আরো সিরিয়াস হলাম।

আমি বললাম, তানজি আপনি সুইসাইড করবেন সেটা আপনার ব্যাপার। আমার কাছে কেন এসেছেন?

মেয়েটা একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। এই প্রশ্নের উত্তর সে ভেবে রাখে নি। আমার এই ভ্যাবাচেকা খাওয়ানোটাই দরকার ছিল। যে কোনও সাইকোথেরাপির ক্ষেত্রে প্রথম শর্ত হচ্ছে পেশেন্টকে প্রথমেই চমকে দিতে হবে। কনভার্সেশনের নিয়ন্ত্রণ যত দ্রুত সম্ভব নিজের দিকে নিয়ে আসতে হবে।
পেশেন্টের অবচেতন মন সাইকোলজিস্টকে বিপাকে ফেলতে চায়। কোন ভাবে বিপাকে ফেলতে পারলে রোগী আনন্দ পায়।

তানজি বলল, সত্যি বলতে কি আমি বুঝতে পারছি আমার জীবন অসহ্য হয়ে গেছে। বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। তারপরও কেন জানি মনে হচ্ছে কেউ যদি আমার জীবনের জটিলতা কাটিয়ে দিতে পারে তবে বেঁচে যেতাম।

আমি তার পালস দেখলাম। হার্টবিটের গতি অস্বাভাবিকভাবে বেশি। সঙ্গে কেউ আসে নি, তার মানে সম্ভবত সে নিঃসঙ্গ। তার কথা গুলোকে সিরিয়াসলি না নিয়ে এখন আর কোন উপায় নেই।

আমি প্রথম কাজের প্রশ্ন করলাম, তানজি আপনি কেন আত্মহত্যা করবেন?

- আমি একটি ছেলেকে ভালোবাসি!

আমি হাসিমুখে বললাম, ভালোবাসা তো ভালো জিনিস। তার জন্য আত্মহত্যা করবেন কেন?

তানজি মুখ নিচু করে বলল, সে আমাকে ভালোবাসে না। সামনের মাসে সে বিয়ে করতে যাচ্ছে।

আমি একটি গোপন দীর্ঘঃশ্বাস ফেললাম। এই প্রেমের কারণে তাহলে মরতে হচ্ছে!
ক্ষুধার জন্য না, যুদ্ধের জন্য না, চাকরির জন্য না, সন্তানের জন্য না.. কেবল প্রেমের জন্য!
কিন্তু এই কথা গুলো আপাতত তাকে বলা যাবে না। তাতে হীতে বিপরীত হবে। বর্তমানে তার কাছে মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার চেয়ে এক কোটি গুণ বড় সমস্যা এই প্রেম। আমাকে বাস্তবতা বুঝতে হবে।

আমি মিষ্টি করে হাসার চেষ্টা করলাম।

-তানজি আপনি কেন তাকে ভালোবাসেন?

-কারণ জানি না।

-সব কিছুরই কারণ থাকে। কারণ ছাড়া পৃথিবীতে কিছুই ঘটে না। তার প্রতি আপনার ভালো লাগার ভিত্তি কি?

তানজি বলল, তার সবকিছুকেই আমার ভালো লাগে। সে যখন কথা বলে তখন ভালো লাগে। সে যখন হাসে তখন ভালো লাগে, সে যখন রাগ করে তখনও ভালো লাগে। এমনকি সে যখন বিরক্ত হয়ে ফোন ধরে না তখন তার রিং হওয়ার শব্দও আমার কাছে ভালো লাগে।

আমি বললাম, আপনাদের কয় বার দেখা হয়েছে?

-একবারও না!

-না দেখেই প্রেমে পড়ে গেলেন?

-হাঁ।

-সে কি খুব বড় মাপের কোন মানুষ? আই মিন বিশাল প্রতিষ্ঠিত বা সেলিব্রেটি?

-না। খুব বড় মাপের কেউ না। আমার চেয়ে একটু উপরের সিঁড়ির। তবে আমি তার অযোগ্য নই।

আমি একটু সময় নিতে চাইলাম। তাকে একটু সময় দেয়া উচিত। রুমের একমাত্র দরজাটা আধখোলা। বাইরে অ্যাসিস্টেন্টের পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
দুইটাই পরিকল্পিত। চেম্বারটা ফরিদ স্যারের। স্যারের সিস্টেম হচ্ছে কোনও নারী একা আসলে দরজা আধখোলা রাখতে হবে। নারী যাতে ডাক্তার এবং তার তার প্রাইভেসী উভয় থেকে নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারেন এ জন্য এই ব্যবস্থা। অ্যাসিসটেন্টকে বলে দেয়া হয়েছে সে যে কোন সময় উঁকি দিয়ে পেশেন্টের প্রাইভেসী ব্রেক আপ করতে পারবে না। আবার পায়ের শব্দ দিয়ে নারী পেশেন্টকে এই নিশ্চয়তা দিতে হবে "ডাক্তারকে ভয় নেই" বাইরে আমি পাহারায় আছি। স্যার আজকে চেম্বার করতে পারছেন না।
ফরিদ স্যারের অনুপস্থিতে আমি পুরোদস্তুর সাইকোলজিস্ট হয়ে বসে আছি।

কিছুক্ষণ পর আমি বললাম, আপনার কি মনে হচ্ছে না আপনি ভুল করছেন?

তানজি বলল, মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। আমি তাকে ভুলতে পারব না।

-আমি যদি বলি আপনি বোকা, একজন না দেখা মানুষকে আপনি ভালোবেসে বসে আছেন, আপনি কি রাগ করবেন?

তানজি বলল, না দেখা মানুষকে ভালোবাসা যাবে না এরকম কোন কথা আছে? না দেখলে ভালোবাসা যায় না?

-না, এটা অবাস্তব ভালোবাসা।

-তাহলে বাস্তব ভালোবাসা কি?

-বাস্তব হচ্ছে বাস্তব। বাস্তবতা অদৃশ্যমান কিছু নয়। বাস্তবতা হচ্ছে দেখা, শোনা, অনুভব করা, স্পর্শ করা।
দূর থেকে কারো জন্য জ্বলে পুড়ে মরাটা লটারী, জুয়া খেলা। ভালোবাসা না।

তানজি আমার কঠিন কথা হজম করার চেষ্টা করছে। খুব সম্ভবত মানতে পারছে না।
আমি ভাবছি আমার কি আরো কঠিন কিছু বলা উচিত নাকি খানিকটা নরম হওয়া উচিত?

তানজি কিছুক্ষণ পর বলল, আমি দূরের একজন মানুষকে পছন্দ করছি। সে ভালো মানুষ এটা বিশ্বাস করি। আপনি কোন যুক্তিতে আমার বিশ্বাসকে ভুল বলবেন?

আমি নরম স্বরে বললাম, তানজি! মরীচিকার কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন। পানিতে হাত দেয়ার আগে পানিকে পানি বলা ঠিক না। ধূ ধূ বালুচরকে পানি ভেবে জীবন হারানো মানুষের সংখ্যা অসংখ্য।

তানজি কিছুক্ষণ পর বলল, তার মানে আপনি আমার ভালোবাসাকে ভালোবাসা বলবেন না?

-না। এটা ভালোবাসা না, মোহ। পৃথিবীর প্রতিটা ঘটনার কারণ থাকে। আপনি অকারণে আরেকজনকে ভালোবেসে বসে আছেন। এটাকে মোহ ছাড়া কি বলা যায়? ইন ফ্যাক্ট বিবাহ পূর্ববর্তী বেশির ভাগ প্রেমকেই আমার কাছে মোহ মনে হয়।

তানজি কঠিন স্বরে বলল, মনে করুন একজন প্রবাসীর স্ত্রীর স্বামীর প্রতি মায়া আর একজন প্রেমিকার প্রেমিকার প্রতি মায়া- এই দুইটার মধ্যে বেসিক পার্থক্য কি? দুইটাই তো মায়া। আপনি আলাদা করবেন কিভাবে?

আমি আবারও হাসার চেষ্টা করলাম।
তানজির চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, একটা লাইসেন্স করা পিস্তল আর একটা অবৈধ পিস্তলের ব্যবহারের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। দুইটা দিয়েই আঘাত করা যায়। পার্থক্য হচ্ছে একটার ব্যবহার স্বীকৃত, আরেকটার নয়। স্বীকৃত অস্ত্র ব্যবহারের মধ্যে সংযম রাখতে হয়। নিতান্ত দরকার বশত সেটি কাছে রাখতে মানুষ। অন্যদিকে লাইসেন্সবিহীন পিস্তল কোন ভালো মানুষের হাতে পড়লেও সেটার অপব্যবহারের সম্ভবনা আছে।
স্বামী-স্ত্রী আর প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে পার্থক্য এখানেই। একটা সমাজ স্বীকৃত, আরেকটা নয়। সুতরাং দুই ক্ষেত্রেই মায়া ব্যাপারটা জড়িত থাকলেও সেটার প্রয়োগ বিধি ভিন্ন হতে বাধ্য।
ভালো মানুষও মাঝে মাঝে এই মায়ার অপব্যবহার করে।
জটিল করে বলে ফেলেছি। আপনি কি আমার কথা বুঝতে পেরেছেন?

তানজি বলল, হাঁ। অনেকটাই।

আমি বললাম, আপনার কি মনে হয়, এখনো সুইসাইড করা উচিত?

তানজি বলল, উচিত নয় সেটা প্রথম থেকেই জানি। কিন্তু একা হয়ে যাওয়ার পর আবার মাথায় ভূত চাপতে পারে। আমি বের হতে পারব বলে মনে হয় না।

আমি এবার মাইন্ড গেমের দিকে গেলাম। সাইকোলজি মতে এটা পরপর দুই বলে বাউন্সার আর ইয়র্কার দিয়ে ব্যাটসম্যানের চিন্তা ভাবনাকে উলট পালট করে দেয়ার মতো। পেশেন্টকে এমন প্রশ্ন করতে হবে যেটা নিয়ে সে একেবারেই ভাবেনি।

আমি বললাম, তানজি! মরার আগে আপনি কি খেতে চান ভেবেছেন?

তানজি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে বলল, ভাবি নি। মরার আগে খাওয়া খুব বড় ব্যাপার না।

-অবশ্যই বড় ব্যাপার। জীবনের শেষ খাওয়া অনেক বড় কিছু। বড় কিছু না হলে ফাঁসির আসামির ইচ্ছামতো শেষ খাওয়া বলে কোন অপশন থাকত না।

তানজি কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেল।
আমি আবার বললাম, মরার সময় কোন ড্রেস পরে মরতে চান? কোন কালারের?

সে আবার অবাক হয়ে বলল, ড্রেস নিয়েও ভাবি নি।

-ভাবা উচিত ছিল। মরার পর মানুষ দেখতে আসবে। এই পোশাকের ছবি আসবে পত্রিকায়। এই পোশাক নিয়েই পোস্ট মর্টেমে নেয়া হবে। ডোম পোশাক সহ শরীর ফাঁড়া ফাঁড়া করবে।

তানজি কিছু না বলে চুপ করে বসে রইল।

আমি বললাম, দেখুন! সত্যি বলতে আপনি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত নন। প্রস্তুত থাকলে অবশ্যই এসব মাথায় থাকত। মানুষ মরার আগে সব প্রস্তুতি নিয়েই মরতে যায়। আপনি ঝোঁকের মাথায় ঔষধ কিনেছেন। কিন্তু আপনার অবচেতন মন সাড়া দেবে না।

তানজি মাথা নিচু করল। সে সম্ভবত বিশ্বাস করতে বসেছে। সুইসাইড করতে যাওয়া কারো থেরাপীর জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাকে বিশ্বাস করাতে হবে যে সে আসলে সুইসাইড করার জন্য রেডি না। এই বিশ্বাসটা তাকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অনেকটাই সাহায্য করে।

সাইকোলজি এক প্রকার খেলা।
মরতে চাইলে কাউকে আটকানো সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারো পক্ষে সম্ভব না। ঘুমের ঔষধ খেতে না পারলে গলায় ফাঁস দেবে। সেটা না পারলে ছাদ থেকে লাফ দেবে। সেটা না পারলে হাতে ব্লেড লাগাবে। সাইকোলজিস্টের পক্ষে তাকে পাহারা দেয়া সম্ভব না। কেবল সম্ভব তার মৃত্যুর গতিতে অন্য দিকে ডাইভার্ট করা।

তানজি বলল, আপনার কথা বুঝতে পারছি। কিন্তু তাকে ভুলতে পারাটা আমার জন্য প্রায় অসম্ভব।
ঘুম থেকে উঠেই তার কথা মনে পড়বে। তখনই আবার মরতে ইচ্ছা করবে। ফোন হাতে নিলেই মনে পড়বে। প্রতিটা ক্ষেত্রে মনে পড়বে।

আমি বললাম, আপনি বুদ্ধিমতী। বিশ্বাস করুন একদিন এই মোহ কেটে যাবে। কারো কিচ্ছু করতে হবে না। মোহ কেটে গেলেও এই ভুল গুলো থেকে যাবে। ভুলের অনুশোচনা করতে করতে জীবনের অনেক খানি সময় নষ্ট হবে।

তানজি চোখ মুছে বলল, প্লিজ আপনি বলুন আমি কিভাবে এই সমস্যা থেকে বের হতে পারি?
আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মনে হয় না মরলে শান্তি নেই।

আমি ল্যাপটপ বের করলাম।
একটা ফোল্ডার অপেন করে তাকে দেখিয়ে বললাম, তানজি দেখুন।

তানজি অবাক হয়ে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে আছে। চিকিৎসা নিতে এসে ল্যাপটপ দেখতে হবে এই ব্যাপারটা বোধহয় সে চিন্তা করে নি।

আমি বললাম, মন দিয়ে দেখুন। এটা হচ্ছে রাঙামাটি জেলার একটা জায়গা। দুই পাশে উপত্যকা, মাঝখানে পাহাড়ের ওপর রাস্তা। চার দিকে সবুজ আর সবুজ। মেঘ খুব পাশ দিয়ে উড়ে যায়। চমৎকার না?

তানজি বিড়বিড় করে বলল, চমৎকার!

আমি আরেকটা ছবি বের করে বললাম, এটা দেখুন। এটা হচ্ছে সিলেট। একটু দূরে রূপালি সুতোর মতো নদী। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সবুজের চাদর।
কিংবা এটা দেখুন। চারপাশে হালকা ঢেউ। কেবল পানি আর পানি। পানির উপর শাপলা ভেসে আছে।
অসাধারণ না?

তানজি আবার বিড়বিড় করে বলল, অসাধারণ!

আমি আরো কয়েকটা ছবি দেখিয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করলাম।
তানজির দিকে তাকিয়ে বললাম, এত সব সুন্দর জায়গা আমাদের দেশেই। এত সুন্দর প্রকৃতি। আপনি সরাসরি দেখেছেন?

- না।

-দেখার ইচ্ছে হয়?

-অবশ্যই।

আমি বললাম, আপনি একটা মানুষের ওপর মুগ্ধ হয়ে পড়ে আছেন। মানুষটা আপনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
অথচ আশেপাশেই মুগ্ধ হওয়ার মতো হাজারো জিনিস পড়ে আছে। ভালোবাসার মতো অসংখ্য কিছু হাতের কাছেই। ঠিক কি না?

তানজি বলল, হাঁ।

আমি শান্ত স্বরে বললাম, আপনি মুগ্ধতার রাস্তা পরিবর্তন করুন। একটা জায়গায় হোঁচট খেয়ে পড়ে সেখানে বারবার ফিরে যাওয়া কোন সমাধান না। আপনার অপমানের স্থানকে স্রেফ ভুলে যান।
পারবেন না?

তানজি খানিকটা হাসি দিয়ে বলল, চেষ্টা করব।

আমি হাসি মুখে বললাম, তানজি আপনাকে একটা অনুরোধ করব। রাখবেন?

-অবশ্যই। বলুন।

-আমার ঘুমের সমস্যা আছে। আপনার ঘুমের ঔষধগুলো আমাকে দিয়ে দিলে বড় উপকার হয়। কিছু টাকা বেঁচে যেত।

তানজি হাসিমুখে সব ঔষধ আমার টেবিলে ফেলে দিল। ছয় পাতা ঔষধের পাতার শব্দ কাঁচের টেবিলে বিশেষ রকম শব্দ করে উঠল।
শব্দ শুনে আমরা দুজনই তৃপ্তির হাসি দিলাম।
:
:
আড়াই বছর পর।

আমি আর তানজি দাঁড়িয়ে আছি রাঙামাটি জেলার একটা পাহাড়ের উপর। রাস্তা উচুঁ নিচু হলেও দেখতে বেশ চমৎকার। রাস্তার দুই পাশ ঘেষে উপত্যকা।
সামান্য দূরের একটা উচুঁ পাহাড় ঘেষে মেঘ ছুটে বেড়াচ্ছে। শরীরে একটা হিম হিম হাওয়া এসে কাঁটা দিচ্ছে।

তানজি আমার হাত শক্ত করে ধরে বলল, পৃথিবীটা কত সুন্দর দেখেছো?

আমি বললাম,তাই নাকি? মাত্র জানলাম তো!

তানজি আমার গালে একটা চিমটি দিয়ে বলল, ভন্ড কোথাকার!

আমাদের বিয়ে হয়েছে সাড়ে চার মাস আগে।
বিয়েটা নিতান্ত কাকতলীয়।

প্রথম কাউন্সেলিং এর তানজির সাথে আমার আর দেখা হয় নি। দেখা হল তার প্রায় দুই বছর পর।
আমি এলিফেন্ট রোডে রিকশা নিয়ে জ্যামের মধ্যে আটকা পড়েছি। আমার সাথে আমার মা। হুট করে কোথা থেকে একটা মেয়ে ঝড়ের বেগে রিকশার সামনে এসে রিকশার হুড ধরে ঝাঁকি দিল।

প্রচন্ড উচ্ছাস নিয়ে বলল, স্যার আমাকে চিনেছেন?

আমি ঘটনায় মোটামুটি হতভম্ব এবং বিব্রত। তার চেয়ে বড় কথা তাকে পুরোপুরি চিনতে পারছি না।
আমার কিছু বলার আগেই সে বলল, স্যার আমি তানজিনা। তানজি।

আমি পরিষ্কার চিনতে পারলাম এবার। মেয়েটা এত সুন্দর সে দিন প্রথম বুঝতে পারলাম। চেম্বারে দেখেছিলাম একটা মৃতপ্রায় মেয়েকে। এখন তাকে জীবন্ত মনে হচ্ছে।
আমি বললাম, কেমন আছেন?

- খুব ভালো। আপনার পাশে ইনি কে?

আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, আমার মা।

তানজি আমাদের দুজনকে অবাক করে দিয়ে রিকশার নিচে থেকেই মায়ের পায়ে ধরে সালাম করল। মা তার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করলেন।

মা বললেন, মা তোমার বাসা কই?

-ধানমন্ডি ১৫ নাম্বার রোডের ৩৪ নাম্বার বাসা।

-আচ্ছা মা ভালো থেকো।

পর দিন আমার মা এই জগতের সবচেয়ে বিস্ময়ের কাজ করলেন। চার কেজি মিস্টি নিয়ে তানজির বাসার দিকে রওনা দিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি স্তব্ধ।
মা কি দেখে কি বুঝলেন আর কেন পছন্দ করলেন এ রহস্যের সমাধান আজো হয় নি। জগতের কিছু বিস্ময়কর জিনিস ব্যাখ্যাতীত হয়। এটা এরকমই একটা ঘটনা।

বিকেলে মা হাসি মুখে বাসায় ফিরে বললেন, মেয়ের বাপ কিছুটা ঘাড়তেড়া। তাও রাজী করাইয়াই আসলাম।
মেয়েটা লক্ষ্মী। আমি মানুষ চিনি।

মা কে আমরা প্রচণ্ড ভয় পাই। কোনওকালে মায়ের কথার উল্টো করার সাহস কখনোই হয় নি। এর কারণও আছে। বাবা মারা যান ২২ বছর আগে। বাবার মৃত্যুর পর মা একহাতে সংসার চালিয়েছেন। জীবন যাপনে কঠোর না হলে আমরা বানের জলে ভেসে যেতাম।

তানজি বাচ্চাদের মতো দুহাত মেলে এক পাক ঘুরে বলল, তোমার সাথে আমার বিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভূত বিয়ে না?

আমি বললাম, অদ্ভূত, তবে এত অদ্ভূত না। পৃথিবীতে হাজার হাজার অদ্ভূত ঘটনা ঘটে। তার তুলনায় এটা কিছুই না।

-এক দিনের পরিচয়। আমি তোমার পেশেন্ট। তোমার মা আমাকে রাস্তায় দেখেই পছন্দ করে বসে রাতারাতি বিয়ে পর্যন্ত চলে গেলেন। অদ্ভূত না?
-কিছুটা তো অবশ্যই।
-একটা প্রশ্ন করি?
-হু।

তানজি বলল, আমি একটা ছেলেকে পছন্দ করতাম। পাগলের মতো ভালোবাসতাম। তুমি সব জানো, তারপরও আমাকে বিয়ে করতে রাজি হলে কেন?

আমি বললাম, দুইটা কারণে। প্রথমত মায়ের কথার বাইরে আমার যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। মা পাবনা মেন্টাল থেকেও যদি একটা মেয়ে ধরে এনে বলে, নে বিয়ে কর। আমি করতে বাধ্য।

দ্বিতীয়ত আমি জানতাম তুমি আর ঐ ছেলেকে পছন্দ করো না। পছন্দ করো না বলেই সে দিন রিকশায় আমার সাথে দেখা করেছিলে। সাধারণ মানুষের কাছে তোমার মোহটা হয়তো প্রেম ছিল, আমার কাছে ছিল রোগ।
রোগ সেরে গেছে, রোগী এখন পুতঃপবিত্র।

তানজি নিচু স্বরে বলল, জানো, ঐ ছেলের সাথে তার স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। সে এখন ড্রাগ এডিকটেড।

আমি হেসে বললাম, তাকে আমার চেম্বারে পাঠাইয়া দিও। কিছু ইনকাম হোক।

তানজি কপট রাগ দেখিয়ে বলল, চুপ। প্রেমের রোগী দেখা একেবারেই বন্ধ।
আমি তোমার দরজায় লিফলেট লাগাব। "এখানে প্রেমের রোগী দেখা হয় না। "

-কেন?

-আমি চাই না আর কোন মেয়ে মরার আগে তোমার চেম্বারে আসুক। তারপর ভুজং ভাজং আর রাঙামাটির ছবি দেখুক। দেখা যাবে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখব আমার আরেকটা সতীন হয়ে গেছে। আরেকটা রাঙামাটি ট্যুরে থাকব তিনজন!
হবে না এসব।
কোন ছেমড়ি মরার জন্য আসলে বলবা, খালাম্মা শান্তিতে গিয়ে মরেন।

আমি বললাম, 'ছেমড়ি' 'খালাম্মা' এসব কোন ধরনের কথা?

-এটাই কথা।

-মনে করো কোন এক দিন আমি সুইসাইড করলাম। তোমার ঐ ঔষধ গুলো তো এখনো আছে। ডেট টেট ঠিক আছে?

তানজি আকাশের দিকে মুখ করে বলল, নো প্রবলেম। তুমি আমাকে প্রকৃতি প্রেম শিখাইছো। বন-পাহাড় লতা পাতা দেখতে বুদ্ধি দিয়েছো। তোমারে ছাড়াও আমি আলবৎ থাকতে পারব।

আমি শব্দ করে হাসলাম।
তানজির কানের পাশে মুখ নিয়ে বললাম, এক সময় কিন্তু আমারে স্যার সম্ভোধন করতে। স্যারকে এভাবে অপদস্ত করা ঠিক?

তানজি বলল, ভণ্ড কোথাকার! আমি কি জানতাম এইটা ফেইক সাইকোলজিস্ট? চান্সে পড়ে প্রক্সি চেম্বার করছে। আমি কি জানতাম লোকটার বয়স মাত্র ২৮? দেখে তো বুড়া বুড়া মনে হইছে। এরকম জানলে সে দিনই পালাতাম।

আমি বললাম, এখন পালিয়ে যাও।

তানজি পেছন থেকে আমাকে জাপ্টে ধরে বলল, এখন আর তোমাকে ছেড়ে যাব না। কোন দিন মরার ইচ্ছে হলে ফাঁস দেয়ার আগে তোমাকে বিষ খাওয়াব। নয়তো এভাবে পাহাড়ে এসে তোমাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে তারপর আমি ঝাপ দেব।
তোমাকে একা এই দুনিয়া ঐ দুনিয়া কোন দুনিয়ায় থাকতে দেব না।

আমি মিষ্টি হেসে বললাম, অসুখ তাহলে কমে নি এখনো?

এক ঝাপি শীতল বাতাস এসে আমাদের স্পর্শ করল। আমি কেঁপে উঠলাম। কেবল বাতাসের কারণে না। আমাকে জড়িয়ে ধরে তানজি কাঁপছে। দুই ফোঁটা গরম কিছু আমার ঘাড়ের উপর পড়ল। পেছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারলাম মেয়েটা কাঁদছে।

আমি কিছুই বললাম না। কাঁদতে থাকুক। কান্নার স্রোতে সব অতীত ধুয়ে মুছে যাক। পাহাড় আকাশ আর মেঘের মাঝখানে বসে মন খুলে কান্না করার ভাগ্য সবার হয় না।

তানজি ফিস ফিস করে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি। অনেক, অনেক, অনেক....

-আমিও।

-তুমি আমার জীবন পাল্টে দিয়েছো। তোমার জন্য পুরো জীবন দিলেও ঋণ শোধ হবে না।

-এসব ফালতু কথা। ভালোবাসা কোন ঋণ না। ঋণে সুদ থাকে। ভালোবাসায় কোন সুদ নেই। ভালোবাসার বিনিময় হয় না।

তানজি বলল, আমি কি তোমার জন্য একটা গান গাইতে পারি?

-পারো।

তানজি গান ধরল। তার কন্ঠ আহামরি না। তবে খুব খারাপও না।

-চরণ ধরিতে দিও গো আমারে নিও না নিও না সরায়ে..

আমি গান থামিয়ে বললাম, এটা ফালতু গান। অন্য গান ধরো।

তানজি আহত হয়ে বলল, ফালতু কেন?

-এটা মূলত পূজার গান। দেবীর প্রতি ভক্তি স্বরূপ এই গান লেখা হয়েছে। প্রেমের গান গাও।

তানজি আবার গান ধরল, "ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনেরও মন্দিরে..

আমি বললাম, এখানেও মন্দির চলে এসেছে। তারপরও গানটা চলুক, খারাপ না।

তানজি গান গাইছে। তার চোখ দিয়ে স্রোত নেমে আসছে। আমার মনে হল বাকি জীবন আমার আর ঝর্ণা না দেখলেও চলবে। এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য কেউ কি কখনো দেখেছে?

আমার মনে হচ্ছে রাঙামাটির পাহাড় আমাদের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ভাবছে "এই পাগল গুলো কই থেকে আসলো?"

#চক্ষে_আমার_তৃষ্ণা

জয়নাল আবেদীনের গল্প


মন্তব্য