kalerkantho

বর্ষবরণ

সাগর চৌধুরী

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বর্ষবরণ

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষে আমি ঢাকায় উপস্থিত থেকেছি তিনবার। প্রথমবার রমনায় প্রভাতি অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলাম, তবে তারপর সেই সুযোগ বা সুবিধা এ পর্যন্ত হয়নি, যদিও শহরের পথে জনসমুদ্রের জোয়ারে গা ভাসাতে পেরেছি। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা-নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষকে স্বতঃস্ফূর্ত উদ্দীপনায় যেভাবে এই মহাউৎসবে শামিল হতে দেখেছি, আমার কাছে সেটা এক আশ্চর্য ও অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মলাভের আগে পূর্ববঙ্গে (অর্থাৎ সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে) পহেলা বৈশাখ কিভাবে উদ্যাপিত হতো, আদৌ হতো কি না জানি না। তবে পশ্চিমবঙ্গে কী হতো সেটা জানি। এককথায়, তেমন কিছুই হতো না, যার অর্থ হলো, সবাই মিলে একসঙ্গে কোনো সর্বজনীন উৎসবে অংশ নেওয়ার চল ছিল না। হ্যাঁ, স্কুলে-কলেজে, পাড়ার কোনো ক্লাবে বা সমিতিতে নববর্ষ উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো, রবীন্দ্রনাথের ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...’ কোরাসে গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাচ-গান-আবৃত্তিও হতো, সবই অবশ্য রবীন্দ্রনাথনির্ভর, অন্য কিছু বড় একটা শোনা বা দেখা যেত না। অল্পবিস্তর ঘটা করে সরকারি অনুষ্ঠানও হতো নামি গায়ক ও নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে, সেখানেও রবীন্দ্রনাথই প্রায় একমেবাদ্বিতীয়ম। এই সব কিছু এখনো হয়, হয়তো বা জৌলুস কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু সর্বজনীনতার অভাব এখনো প্রকট।

তবে আশার কথা, এই পরিস্থিতিতে একটা পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে বছর তিনেক হলো। বাংলা ভাষার এবং বাংলার লোকসংস্কৃতির চর্চা ও প্রসারে নিবেদিতপ্রাণ কিছু মানুষ বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনকে উপলক্ষ করে এগিয়ে এসেছেন ও আসছেন ব্যক্তিগত ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক-শ্রেণিগত অবস্থানের ঊর্ধ্বে ওঠে ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই বিশ্বাসকে সমাজজীবনের সর্বত্র সঞ্চারিত করার উদ্দেশ্যে। বৈশাখের প্রথম দিনের সূর্যোদয়ের অব্যবহিত পরেই শহর কলকাতার পথে, সেই সঙ্গে কলকাতার বাইরে অন্যত্রও, সংগঠিত হচ্ছে একাধিক মাঙ্গলিক প্রভাতফেরি। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, নববর্ষের প্রথম দিনটি উদ্‌যাপন উপলক্ষে ঢাকায় যে প্রভাতি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আয়োজিত হয়ে আসছে বেশ কয়েক বছর ধরে, তার অনুপ্রেরণাতেই এখন আমাদের সংগঠন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা কলকাতা’ আয়োজন করছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বমূলক নানা বর্ণাঢ্য উপকরণে সুসজ্জিত প্রভাতফেরির, যাতে সোৎসাহে যোগ দিচ্ছেন শিশু-কিশোর-যুবাদের সঙ্গে প্রবীণরাও। আমাদের উদ্যোগের সঙ্গে শুভানুধ্যায়ী হিসেবে জড়িত রয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদ্বজ্জনেরা। সব সম্প্রদায় ও শ্রেণির মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্যের বার্তার প্রসারই আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বৃহত্তর বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যেও—যেমন ধরা যাক তথাকথিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত বাঙালিদের—নববর্ষ উদ্‌যাপনের মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার প্রবণতা ইদানীং বাড়ছে। কলকাতার উত্তরের প্রান্তিক নগরী ‘নিউ টাউন’ অঞ্চলে আলিয়া ইউনিভার্সিটি নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। কয়েক বছর আগে এই প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল মহামেডান কলেজ অব ক্যালকাটা, ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মর্যাদাপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় নাম হয়েছে। আমাদের এক শিক্ষাবিদ বন্ধুর কাছে শুনলাম, এবার পহেলা বৈশাখ এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ও শিক্ষকরা বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনের জন্য দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের অয়োজন করছেন, যা হবে সর্বসাধারণের জন্য অবারিতদ্বার। বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতিপ্রেমী মাত্রই এমন সংবাদে উজ্জীবিত বোধ করবেন। 

লেখক : সাংবাদিক

মন্তব্য