kalerkantho

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা কাম্য

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

১১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা কাম্য

ভূ-প্রাকৃতিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সমতল, পাহাড়ি এবং হাওর ও নদীবেষ্টিত অঞ্চলে বিভক্ত। একেক অঞ্চলের প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ, মানুষের জীবনধারণ একেক রকম। রয়েছে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের সক্ষমতা ও কৌশলের ভিন্নতা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রকৃতি, ধরন ও ব্যাপকতারও ভিন্নতা। দক্ষিণাঞ্চল, পার্বত্য অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চল ভৌগোলিক কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষা ও কর্মসংস্থান। যদিও শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্পর্ক হাওর অঞ্চলের সঙ্গে যতটা, ততটা দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে নয়। তবে আকস্মিক বন্যা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করলে এবং তা দীর্ঘমেয়াদি হলে মানুষের কষ্টের শেষ থাকে না। সিডর ও আইলা এর জ্বলন্ত উদাহরণ। সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে মধ্যাঞ্চলের মানুষ। বড় কোনো বন্যার কবলে না পড়লে দুর্যোগ থেকে তারা অনেকটাই মুক্ত। উত্তরাঞ্চলের বন্যা আর খরা আমাদের জন্য আরেক মহাদুর্যোগ। প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলে আক্রান্ত হয় আমাদের উত্তরাঞ্চলবাসী। একটি বিষয় পরিষ্কার, আবহাওয়াজনিত কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে আমাদের উপকূলীয় জেলাগুলো। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সফল এক দেশ; কিন্তু তার পরও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন, প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়ে সমালোচনা রয়ে যাচ্ছে। রয়েছে রাজনীতির সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মোকাবেলার সম্পর্ক।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে। এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করার সময় একমাত্র বিবেচনা হওয়া উচিত দুর্যোগপ্রবণ এলাকা এবং এর অগ্রাধিকার ভিত্তি। বিগত বছরগুলোর প্রাকৃতিক দুর্যোগের রেকর্ড দেখলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে বাংলাদেশের কোন কোন অঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেশি আক্রান্ত হয়। অঞ্চলভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ কাম্য। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলাকা হওয়ায় এ অঞ্চলে বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলা বছরের অর্ধেক সময়ে পানিতে ডুবে থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে কষ্ট হয়। বছরের এ সময়ে কর্মসংস্থানেরও সমস্যা তৈরি হয়। আমাদের পাহাড়ি মানুষগুলো বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকির মধ্যে থাকে। সেখানেও এ সময়ে লেখাপড়া কষ্টসাধ্য। এ অঞ্চলগুলোর মানুষের বর্ষা মৌসুমে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিষয় গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত। বিকল্প স্কুল প্রতিষ্ঠা কিংবা আবাসিক ব্যবস্থা করা এবং কর্মসংস্থানের বিকল্প ব্যবস্থা, যেমন কর্মসৃজন প্রকল্পের আওতা বাড়ানো এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করা যেতে পারে। বর্ষা মৌসুম এবং আসন্ন বাজেট সামনে রেখে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য বিশেষ নির্দেশনার দাবি করছি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মেকাবেলায় আমরা যতটা সফল, তার চেয়ে ঢের বেশি বিফল মানুষসৃষ্ট দুর্যোগ মেকাবেলায়। বরং আমরা মানুষ মারার বিভিন্ন কৌশল আয়ত্ত করছি। এ বছর পর পর দুটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আমাদের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। এসব ঘটনা আমাদের জানিয়ে দেয়, আমরা মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মেকাবেলায় তেমন পারদর্শী নই। প্রতিটি ঘটনার সমাপ্তি ঘটে তদন্ত কমিটি গঠন এবং প্রতিবেদন প্রদানের মধ্য দিয়ে। অপেক্ষা আরেকটি ঘটনার। তদন্ত কমিটির কোনো সুপারিশ পুরোটা বাস্তবায়িত হয় না। প্রচলিত বিধি মেনে ভবন নির্মাণ করা হলে এমন দুর্যোগ আমাদের মোকাবেলা করতে হতো না। ভবন নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যেমন—রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, পূর্ত মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন বিভাগের ব্যর্থতার জন্য এমন ঘটনা বারবার ঘটছে এবং আমরা নিশ্চিত যে ভবিষ্যতেও ঘটবে।

দুর্যোগ মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের আলোচনা কম হয় না। কিন্তু করণীয় নির্ধারণ ও পদক্ষেপ গ্রহণের সময় যে বাধার সম্মুখীন আমরা হই, তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে পারাই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য যে প্রস্তুতি ও প্রকল্প আমরা গ্রহণ করি, তার মধ্যে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকে, প্রকল্প বিবেচনায় রাজনীতিকে টেনে আনা হয়, অপ্রয়োজনে প্রকল্প গ্রহণ এবং আওতাভুক্তকরণে সত্যিকার দুর্যোগপ্রবণ এলাকা অগ্রাধিকার না পায়, তাহলে দুর্যোগ মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনা আরো বেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।

বিশ্বের তৃতীয় ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকা। ঢাকাকে মানুষের বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হলে একটি ভালো পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের অযাচিত প্রকল্প বন্ধ করা, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্পের আওতা নির্ধারণ বন্ধ করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com

মন্তব্য