kalerkantho


যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন : একটি মূল্যায়ন

ফরিদুল আলম

১০ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন : একটি মূল্যায়ন

প্রতি চার বছর অন্তর নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার দুই বছরের মাথায় মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের (কংগ্রেস) সব কটি আসন (৪৩৫) ও সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৩৩ অথবা ৩৪টি আসনের এই নির্বাচন মধ্যবর্তী নির্বাচন হিসেবে পরিচিত। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৩৪টিতে এই সময়ে চার বছর মেয়াদের জন্য গভর্নর নির্বাচিত হন। শুধু ভারমন্ট ও নিউ হ্যাম্পশায়ার রাজ্য দুটির গভর্নররা একই সঙ্গে এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়েও দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। সে হিসাবে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৩৬ জন গভর্নর নির্বাচিত হন। এই সময়ে কিছু অঙ্গরাজ্যের আইনসভার কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে এই নির্বাচনে নিম্নকক্ষ বা কংগ্রেস এবং উচ্চকক্ষ সিনেট নির্বাচনের গুরুত্ব বেশি এই কারণে যে এই দুটি কক্ষের সঙ্গে সরকারের নীতি ও প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর এসব বিবেচনায় এই মধ্যবর্তী নির্বাচন এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে এটা অনেকটা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব মূল্যায়নের একটা গণভোট হিসেবে অনেকে মনে করে এবং এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষ উভয়েই তাদের জনসমর্থন বৃদ্ধির দাবিকে প্রমাণের প্রয়াস পায়। প্রেসিডেন্টের মেয়াদের মধ্যবর্তী সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বলে এর ফলাফলের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্টের গ্রহণযোগ্যতার একটি মোটামুটি চিত্র প্রতিফলিত হয়ে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকে গত দুই বছর সময়ে নানা ঘটনায় অনেক বিতর্কের জন্ম দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এই নির্বাচন তাঁকে একটি অগ্নিপরীক্ষার সামনে ফেলে। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায় যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি আট বছর পর নিম্নকক্ষ কংগ্রেসে তাদের কর্তৃত্ব হারিয়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টি ২২০ আসন নিয়ে কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করেছে। এর ফলে পার্লামেন্টে কোন বিলগুলো আসবে বা আলোচিত হবে সেটার পাশাপাশি সংসদীয় কমিটিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করবে তারা। এমনকি প্রেসিডেন্টকে ইমপিচমেন্ট করার প্রয়োজন হলে সেটার প্রক্রিয়াও শুরু হয় কংগ্রেসে। অন্যদিকে উচ্চকক্ষ সিনেটে এবারও শক্ত অবস্থানে রয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। তারা এ ক্ষেত্রে আগের চেয়েও শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং ইন্ডিয়ানা, মিসৌরি ও নর্থ ডাকোটার আসন ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। সরকারের আর্থিক চাহিদা, মন্ত্রিসভার সদস্য নিয়োগ ও বিচার বিভাগীয় নিয়োগসহ কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রেসিডেন্টকে সব সময় সিনেটের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হয়। সেদিক বিবেচনায় কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও সিনেটের এই বিজয়ের ফলে ট্রাম্পের বাদবাকি মেয়াদে তিনি যদি কৌশলী হন, তবে খুব একটা সমস্যায় পড়তে হবে না বলে মনে করা যেতে পারে। আবার অতীতের নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখলে বিষয়টি ট্রাম্পের জন্য অনেকটা আশাব্যঞ্জক। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইতিহাসে ২১টি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় যে এর মধ্যে শুধু দুটি ছাড়া অন্য নির্বাচনগুলোয় প্রেসিডেন্টের দল কখনো উভয় পরিষদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে পারেনি। গড়ে ওই নির্বাচনগুলোতে কংগ্রেসে ৩০টি এবং সিনেটে চারটি আসনে তারা পরাজিত হয়েছে। যে দুটি নির্বাচনে তারা তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে পেরেছিল, সেগুলো হচ্ছে ১৯৩৮ সালে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্টের সময় এবং ২০০৪ সালে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশের সময়ে। এখানে একটি অদ্ভুত মিল হচ্ছে এই দুটি সময়েই যুক্তরাষ্ট্র দুটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধাবস্থায় ছিল, একটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে আর অন্যটি ছিল তথাকথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময়ে। মার্কিন জনগণ ওই সময়ে তাদের ‘গ্রেটনেস’ বা ‘মহান’ সত্তাকে মাথায় রেখেছিল বলেই মনে হতে পারে।

২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী স্লোগান ছিল ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ অর্থাৎ আমেরিকাকে আবারও মহান করা। নির্বাচনের আগের সব জনমত জরিপকে মিথ্যা প্রমাণ করে হিলারি ক্লিনটনের মতো একজন হেভিওয়েট প্রার্থীর বিরুদ্ধে তাঁর এই বিজয়ের মূল সূত্র ছিল এই স্লোগান। এবারের নির্বাচনে সংগত কারণেই তাই মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের নির্বাচনপূর্ব স্লোগানটি মূল্যায়ন করার একটা প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়েছে। আর এই লক্ষ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনায় এসেছে মার্কিন অর্থনীতি। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বেকারত্বের হার বিগত তিন মাসে নেমে দাঁড়িয়েছে ৩.৭ শতাংশে, যা গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে এই অর্থনৈতিক উত্থানের পেছনে অনেকেই একবাক্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাফল্যকে স্বীকার করতে নারাজ। তাদের মতে, অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও মধ্যম আয়ের মানুষ দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল ভোগ করতে সক্ষম হবে কি না এবং এই বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। একই সঙ্গে এই সাফল্যের পেছনে শুধু দুই বছরের ট্রাম্পের শাসন, নাকি ওবামা সরকারের গৃহীত নীতিরও অবদান রয়েছে, সেটা পরিষ্কার নয়। নির্বাচনপূর্ব জনমত জরিপে দেখা যায়, মার্কিন ভোটাররা অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, বিচারব্যবস্থা—মূলত এই তিনটি মূল বিষয়কে সামনে রেখে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এতে দেখা যায় ৪১ শতাংশ ভোটার ওবামা শাসনামলের অর্থনীতির প্রশংসা করে এবং ৪০ শতাংশ ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতিকে সমর্থন করে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বহুল আলোচিত ওবামাকেয়ারের ব্যাপারে ট্রাম্প সরকারের শুরু থেকে আপত্তি থাকলেও এর পরিবর্তে বিকল্প স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। নির্বাচনপূর্ব জরিপে দেখা যায় যে ৭৫ শতাংশ ভোটার স্বাস্থ্যসেবাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ৫১ শতাংশ ভোটার মনে করে এ ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটরা সফল এবং ৩৫ শতাংশ মনে করে রিপাবলিকানরা সফল। বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে ব্রেট কাভানাগকে নিয়োগ এবং অনেক জল গড়ানোর পর রিপাবলিকান অধ্যুষিত সিনেটে সেটি অনুমোদন করাতে সক্ষম হলেও সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ‘মি টু’ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এটিও ভোটের আগে অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়। ভোটের আগে ৭৬ শতাংশ ভোটার জানায় যে সুপ্রিম কোর্টের এই নিয়োগপ্রক্রিয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা বিষয়টিকে বিবেচনায় রাখবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর দায়িত্ব পালনের প্রথম দুই বছর কংগ্রেস এবং সিনেটে রিপাবলিকানদের প্রাধান্যের ফলে তেমন একটা বাধার সম্মুখীন না হলেও এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাঁর নতুন সংকটের সূচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে ট্রাম্পকে ইমপিচ করার একাধিক প্রচেষ্টা নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি বিরোধী পক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে। এবার কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের প্রয়োজনের বেশি সমর্থন থাকার সুবাদে সামনে এ ধরনের প্রচেষ্টার ফলে তিনি সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। এই নির্বাচনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে মার্কিন ইতিহাসে এবারই প্রথম ব্যাপকসংখ্যক নারী প্রতিনিধি (১১৮ জন) নির্বাচিত হয়েছেন, যার বেশির ভাগই ডেমোক্রেটিক পার্টির টিকিটে নির্বাচিত। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তাঁর একাধিক নারী কেলেঙ্কারি ফাঁস এবং বিভিন্ন সময়ে নারীদের নিয়ে কটূক্তিপূর্ণ মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এবার তাঁরা তাঁর বিপক্ষে বেশ সরব থাকবেন। সেই সঙ্গে বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে তাঁর যোগসাজশের বিষয়টি তদন্তাধীন পর্যায় থেকে এটি তাঁর ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সম্প্রতি তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিল করবেন এবং ইমিগ্র্যান্টদের ক্ষেত্রে মার্কিন নীতি আরো কঠোর হবে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে প্রতিনিধি পরিষদে যাঁরা বিজয়ী হয়েছেন তাঁরা পুরো দেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত, অন্যদিকে সিনেটের নির্বাচিতরা এক-তৃতীয়াংশ অঙ্গরাজ্যের ভোটে নির্বাচিত। এই নির্বাচনে ভোটারদের, বিশেষত তরুণদের একটা বড় অংশ ইমিগ্র্যান্ট। সুতরাং এ ক্ষেত্রে বলা যায় যে প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের অনুভূতি প্রতিফলিত হয়েছে; যদিও নিকট অতীতে আমরা দেখেছি যে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেট অথবা উভয় পরিষদে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারালেও এক ধরনের ভারসাম্যের নীতি নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষম হয়েছেন। এখানে ট্রাম্প বরাবরই তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়ে আলাদা এবং ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে নানা রকমের বিতর্ক তাঁর নিত্যচলার সঙ্গী। মেয়াদের বাকি সময়ে তিনি যদি তাঁর পূর্বসূরিদের মতো ভারসাম্যের নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষম না হন, তবে শুধু সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাঁকে রক্ষার জন্য যথেষ্ট না-ও হতে পারে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বেইজিংয়ের ইউআইবিইতে উচ্চশিক্ষারত

mfulka@yahoo.com



মন্তব্য