kalerkantho


উন্নয়নের অভিযাত্রায় মাইলফলক পদ্মা বহুমুখী সেতু

মোহাম্মদ আব্দুর রহমান খান

১৪ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



উন্নয়নের অভিযাত্রায় মাইলফলক পদ্মা বহুমুখী সেতু

পদ্মা বহুমুখী সেতু। এই সেতু নির্মাণের পর যোগাযোগব্যবস্থায় সড়কপথে ব্যাপক উন্নতি ঘটবে। এই সেতু নির্মাণের পর দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অভিযাত্রায় যোগ করবে এক নতুন মাত্রা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়চিত্ত, মহৎ ও বৃহৎ উদ্যোগে এই সেতু আজ বাস্তবে রূপ পেতে চলেছে। কত ষড়যন্ত্র, কত মিথ্যা তথ্য ও গুজব রটিয়ে এই সেতু বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সব কিছুকে উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছেন। সম্ভাবনাময় ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে তিনি শুধু ডিজিটাল যুগের স্বর্ণ অধ্যায় রচনা করেননি, সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ জনগোষ্ঠীর নিত্যকর্মপ্রবাহকে উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের অব্যাহত সাফল্যে বাংলাদেশ আজ এক অনন্য উচ্চতায়, যা প্রতিনিয়ত শুধু দৃশ্যমানই হচ্ছে না, বিশ্ব জরিপেও বাংলাদেশ নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছে।

পদ্মা সেতুর অবকাঠামো এখন দৃশ্যমান। এ সেতু বাস্তবায়নে কাজের গতি অনেক বেড়েছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ এখন এক কিলোমিটার পর্যন্ত দেখা গেলেও আগামী বছরের শুরুতেই এ ক্ষেত্রে বিস্ময় সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা যায়। দ্রুত সময়ের মধ্যে কয়েকটি স্প্যান বসানোর প্রস্তুতি চলছে। সমস্যায় থাকা ১৪টি পিলারের মধ্যে সাতটি পিলারের নকশা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। এ ছাড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে অবশিষ্ট সাতটি পিলারের নকশাও। নতুন নকশা অনুযায়ী বিশ্বে প্রথমবারের মতো ১১টি খুঁটির ৭৭টি স্টিলের পাইলে ব্যবহার করা হচ্ছে খাঁজকাটা (ট্যাম) প্রযুক্তি।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের আওতায় মূল সেতুর ৭০ শতাংশ ও সার্বিক অগ্রগতি বর্তমানে ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে পদ্মা সেতুসংলগ্ন ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ের কাজের অগ্রগতিও ৭০ শতাংশ। এ ছাড়া পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ ও মাওয়া প্রাঙ্গণে ১৩০০ মিটার নদী রক্ষার কাজও হাতে নেওয়া হয়েছে। খুঁটির নকশায় যে সমস্যা ছিল, তা-ও শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু মান ঠিক রেখে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া। তবে সেতুর অন্যান্য কাজের অগ্রগতি হলেও পিছিয়ে পড়েছে নদীশাসনের কাজ। এ পর্যন্ত নদীশাসনের কাজ হয়েছে মাত্র ৪৫ শতাংশ। কিন্তু এই সময়ে নদীশাসনের কাজ হওয়ার কথা ছিল ৯০ শতাংশ। টার্গেট থেকে বাস্তবায়ন অর্ধেক হয়েছে মাত্র।

প্রসংগত উল্লেখ করতে হয়, ২০১৪ সালের ১০ নভেম্বর চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশনের সঙ্গে নদীশাসনের কাজের চুক্তি হয়। আগামী ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হচ্ছে না। নদীশাসনের কাজ পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশনের অনভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারী, যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা এবং জনবলের ঘাটতি। এ অবস্থায় ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে মূল সেতুর ঠিকাদার মেজর ব্রিজ কম্পানি। আর নদীশাসন কাজের ঠিকাদার চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড সময় চেয়েছে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। জানা গেছে, পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন সম্পর্কিত প্যানেল অব এক্সপার্টের সভায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুর যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এই প্যানেল অব এক্সপার্টের চেয়ারম্যান হলেন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। তাঁর নেতৃত্বে এই প্যানেলে আরো ১১ জন বিশেষজ্ঞ সদস্য রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কলম্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের একজন করে, জাপানের দুজন, ডেনমার্কের একজনসহ মোট পাঁচজন বিদেশি বিশেষজ্ঞ রয়েছেন।

এ কথা দিবালোকের মতো সত্য যে পদ্মা সেতু আর স্বপ্ন নয়, এখন বাস্তব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতুর রূপকার। তিনি যে কথা দিয়েছিলেন তা রেখেছেন। তবে আমাদেরও কথা, সেতু নির্মাণে কাজের ক্ষেত্রে কোনো ভুল-ত্রুটি বা গাফিলতি যেন না থাকে, যেমনটি আমরা দেখেছি বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতুর ক্ষেত্রে। বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতু চালুর কিছুদিন পরই ফাটল দেখা দেয়। আর এই ফাটল নিয়ে তখন হৈচৈ পড়ে যায়। দেশের মানুষও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কেউ বলেন সেতুর ডিজাইনের ত্রুটির কথা, আবার কেউ বলেন সেতুর এক পাশ দিয়ে ট্রেন চলাচল করায় ভাইব্রেশনের কারণে এ ফাটল। এমন নানা কথার ডালপালা গজাতে থাকে। এ অবস্থায় তৎকালীন সেতু বিভাগের সচিব আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর উদ্যোগে ইস্কাটনের বিয়াম অডিটরিয়ামে উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা হয়। দেশীয় প্রকৌশলী, সংবাদিক ও বিভিন্ন পেশার মানুষও এই উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করে। সেতুর ফাটল নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতুর বিদেশি প্যানেল অব এক্সপার্টের প্রধান প্রফেসর গারউইককে আমেরিকা থেকে ডাকা হয়।

এখানে উল্লেখ করা দরকার, সে সময়ও বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতুর দেশীয় প্যানেল অব এক্সপার্টের প্রধান ছিলেন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। সেদিন বিদেশি ও দেশীয় প্যানেল অব এক্সপার্টদের প্রশ্নবাণে ভাসিয়ে দেন প্রকৌশলী, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশার মানুষ। আলোচনা শেষে ফাটল নিয়ে শঙ্কিত না হওয়ার কথা জানানো হয়। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সভায় উপস্থিত সবাইকে আশ্বস্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু অর্থ ব্যয় করে বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতুর সেই ফাটলগুলো বন্ধ করা হয়। তাই পদ্মা বহুমুখী সেতুর ক্ষেত্রেও যেন এমনটি না ঘটে, সেদিকে সেতুর প্যানেল অব এক্সপার্টদের তীক্ষ দৃষ্টি রাখা দরকার। ভবিষ্যতে যাতে সেতুর বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে।

 

লেখক : সেতু বিভাগের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা



মন্তব্য