kalerkantho


বিএনপিকে বাঁচানোর এটা সম্ভবত শেষ সুযোগ

আবদুল মান্নান

১৪ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



বিএনপিকে বাঁচানোর এটা সম্ভবত শেষ সুযোগ

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে চারটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় হয়েছে, যা পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছিল তার পরিসমাপ্তি ঘটাবে বলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ মনে করে। এবং এই চারটি রায়ের জন্য এ দেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার গঠন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই চারটি মামলা হচ্ছে—বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, জেলহত্যা মামলা, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ (একাধিক মামলা) মামলা; আর সর্বশেষটি হচ্ছে একুশে আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা মামলা। আরো একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি, সেটি হচ্ছে জিয়া হত্যা। পরেরটি না হওয়ার কারণ, তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া এই বিচার চাননি। যদিও তিনি পুরো দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এসব মামলার মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাটি একটু ব্যতিক্রমধর্মী ছিল। কারণ এই হত্যাকাণ্ডের বিচার যাতে না হয় তার জন্য বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়া দেশের সংবিধানে একটি দায়মুক্তি ধারা সংযোজন করেছিলেন, যা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। অবশ্য অধ্যাদেশ আকারে এই ধারাটি জারি করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পেছনে যার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেই খন্দকার মোশতাক। প্রকাশ্য আদালতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনার ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করার পর, যা তাঁর ওই মেয়াদে শেষ হয়নি। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করলে নানা অজুহাতে এই মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। আর অজুহাতগুলো জোগান দিয়েছিলেন খালেদা জিয়ার তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ। সেই মামলা শেষ হয় ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা আবার সরকার গঠন করার মধ্য দিয়ে।

গত ১০ অক্টোবর একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় দেওয়া হলো। রায়ে ১৯ জন আসামিকে দৃত্যুদণ্ড, ১৯ জনকে জাবজ্জীবন আর ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাঁদের মধ্যে খালেদা জিয়ার শাসনামলের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ আরো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আছেন। তাঁরা সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করেছিলেন খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমানের শাসন এ দেশে চিরস্থায়ী করার জন্য। তাঁদের সহায়তা করেছিল রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও অঙ্গসংগঠন। বিষয়টি সম্পর্কে আদ্যোপান্ত জানা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এবং ঘটনাটি ঘটানোর পর থেকে তা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সব রকমের চেষ্টা করা হয়েছিল। ২০০৪ সালের আগস্ট মাসের ২১ তারিখ সংঘটিত এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় সেই সময়ের অসমাপ্ত হত্যাকাণ্ড শেষ করা এবং এর প্রাথমিক পর্যায় ছিল বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করা। বিশ্বে অনেক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হয়েছে, কিন্তু সেগুলো একজন বিশেষ ব্যক্তিকে হত্যা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। একজনকে হত্যা করতে গিয়ে ২৪ জনকে হত্যা আর আওয়ামী লীগের প্রায় ৪০০ নেতাকর্মীকে গুরুতর আহত করার ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, জন এফ কেনেডি, মানবাধিকার নেতা ড. মার্টিন লুথার কিং, ভারতে মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, সৌদি আরবে বাদশাহ ফয়সাল, পাকিস্তানে লিয়াকত আলী খান, বেনজির ভুট্টো, জিয়াউল হক, ফিলিপাইনে বেনিগনো একিনো, মিয়ানমারে অং সান সু চির পিতা অং সান—সবাই ঘাতকদের হাতে নিহত হয়েছেন। জিয়াউল হক নিহত হয়েছেন তাঁকে বহনকারী বিমান বিস্ফোরণের কারণে। কিন্তু একজন শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছিল, তা অন্য কোনো ক্ষেত্রে ছিল না।

একুশে আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে বেশ সূক্ষ্মভাবে। নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। তাঁকে সহায়তা করেছেন লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু, হারিছ চৌধুরী, সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। সহায়তা নেওয়া হয়েছে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন হরকাতুল জিহাদের। ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সহায়তা করেছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও একজন বিচারপতি। ব্যবহার করা হয়েছে সেনাবাহিনীতে ব্যবহার্য আর্জেস গ্রেনেড। প্রতিটি আর্জেস গ্রেনেডে আনুমানিক চার হাজার স্প্লিন্টার থাকে, যার প্রতিটির একেকটি বুলেটের মতো এবং তা বিস্ফোরণের পর এক হাজার গজের মধ্যে কেউ থাকলে একেকটি স্প্লিন্টারের আঘাতে তার মৃত্যু হতে পারে। সেদিন ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যার মধ্যে বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান অন্যতম। শেখ হাসিনা সেই দিনের সেই ভয়াবহ পড়ন্ত বিকেলে বেঁচে গিয়েছিলেন দলীয় নেতাকর্মীরা তাঁকে ঘিরে মানবঢাল তৈরি করার কারণে। ঘটনার পর যখন তাঁকে বহনকারী জিপগাড়িটি অকুস্থল ত্যাগ করছিল, তখন তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয় এবং গুলি থেকে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হন তাঁর দেহরক্ষী অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মাহবুব। ঘটনার পরপর পুলিশ কোথায় আহতদের একটু সাহায্য করবে, তা না করে তাদের ওপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ আর লাঠিচার্জ শুরু করে। আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে তখন সেখানে কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। কারণ সেদিন আগেই তাঁদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অপারেশন থিয়েটারগুলো ছিল বন্ধ। গুলশানে জেড এইচ শিকদার হাসপাতালে কয়েকজন আহতকে ভর্তি করা হয়েছিল। সরকার তাদের সেখান থেকে বের করে দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সব কিছুই ছিল পূর্বপরিকল্পিত। রাতে ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা সব আলামত নষ্ট করার জন্য পুরো এলাকা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে ফেলা হয়। অবিস্ফোরিত গ্রেনেডগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়। জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানকে মুমূর্ষু অবস্থায় সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। খালেদা জিয়া তাঁকে দেখতে গেলে আইভি রহমানের পরিবারের সদস্যদের একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। এটি ছিল শুধু অমানবিকই নয়, নির্দয় আচরণও বটে। এক দিন পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল দলের কয়েকজন সিনিয়র সদস্যকে নিয়ে প্রথমে রমনা ও পরে মতিঝিল থানায় যান। মামলা রুজু করতে গেলে থানা মামলা নিতে অস্বীকার করে। সাজানো হয় সেই বিখ্যাত জজ মিয়া নাটক। পরে জানা যায়, জজ মিয়া গ্রেনেড হামলাকারীর ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য তার পরিবারকে প্রতি মাসে দুই হাজার করে টাকা দেওয়া হতো।

একুশে আগস্টের ঘটনা নিয়ে গত কয়েক দিন অনেক আলোচনা হয়েছে, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। বিএনপি নেতারা বলেছেন, এটি একটি ফরমায়েশি রায় এবং তাঁদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পলাতক তারেক রহমানকে রাজনীতি থেকে বাইরে রাখার জন্য এই মামলা ও রায় একটি ষড়যন্ত্র। তবে সার্বিক বিচারে এই দুজন বাংলাদেশের রাজনীতিতে না থাকলে দেশের রাজনীতির তেমন কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। কিছুদিন আগে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ১৫ই আগস্ট ও ২১ আগস্টের ঘটনা ছিল নিছক দুর্ঘটনা। এসব নিয়ে আজীবন মাতামাতি করার কোনো অর্থ নেই। অবাক লাগে, এই ভদ্রলোক একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন এবং হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল থেকে ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত প্রথম ভিপি ছিলেন (১৯৬৮)। বিএনপির আরেকজন ঝাণ্ডাধারী গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গবন্ধু তাঁকে সাভারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য জমি দিয়েছিলেন। তিনি এখন মির্জা ফখরুল আর রিজভী আহমেদের চেয়েও বড় মাপের জিয়ার সৈনিক। এমন জিয়ার সৈনিক যে তিনি অকপটে বলতে পারেন, জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এটি একটি মিথ্যা কথা। একবার তিনি টিভিতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছে আবেদন করেছিলেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত বেপরোয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল আজিজকে টেনে এনে ‘সময়’ টিভির টক শোতে বললেন, জেনারেল আজিজ নাকি যখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসে জিওসি ছিলেন, তখন সেখান থেকে কিছু গ্রেনেড চুরি হয়েছিল এবং এই অপরাধে তাঁর কোর্ট মার্শাল হয়েছিল। এমন একটি নির্জলা মিথ্যা কথা বলার পরিপ্রেক্ষিতে আইএসপিআরকে প্রতিবাদ জানিয়ে ‘সময়’ টিভিতে পত্র প্রেরণ করতে হয়েছে। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অবশ্য শনিবারই এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলেছেন, ‘আমি দেশের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ সম্পর্কে অসাবধানতাবশত একটি ভুল তথ্য উল্লেখ করেছিলাম।’ সময় টিভিতে তাঁর মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য আসলেই ‘অসাবধানতাবশত একটি ভুল’ নাকি শতভাগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। যে ব্যক্তি রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান সম্পর্কে এমন মিথ্যা ও বানোয়াট উক্তি করতে পারেন, তিনি এখন ড. কামাল হোসেন গংয়ের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ফেলে দিতে।

২১ আগস্টের ঘটনা নিয়ে কয়েকজন সংসদ সদস্য সংসদে আলোচনা করতে চাইলে স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার খালেদা জিয়ার নির্দেশে সেই আলোচনা করার অনুমতি দেননি। তবে কয়েকজন বিএনপির সদস্য ফ্লোর নিয়ে বলেন, এই গ্রেনেড হামলা আওয়ামী লীগই সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে করেছে। কয়েকজন এমনও বলেন, গ্রেনেডগুলো শেখ হাসিনা তাঁর ব্যাগে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। অনেকটা বাধ্য হয়ে সরকার বিচারপতি জয়নাল আবেদিনকে দিয়ে একটি এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে। বিচারপতি জয়নাল আবেদিন একসময় জয়পুরহাট বিএনপির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি একটি লোকদেখানো তদন্ত করে প্রতিবেদনে এ ঘটনার জন্য একটি বন্ধুরাষ্ট্র ও তার গোয়েন্দা সংস্থাকে (পড়ুন ভারত ও ‘র’) দায়ী করেন। যখন ঘটনার প্রকৃত তদন্ত শুরু হয়, তখন তাঁর দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডির আবদুল কাহহার আখন্দকে। তাঁর তদন্ত নিয়েও বিএনপি ধূম্রজাল সৃষ্টি করে এবং বলে, তাঁকে অবসর থেকে ডেকে এনে এই তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, আবদুল কাহহার আখন্দকে খালেদা জিয়া সরকারের আমলে ২০০২ সালে জোরপূর্বক আগাম অবসরে পাঠালে তিনি মামলা করেন এবং সেই মালায় জয়ী হয়ে কাজে যোগদান করেন। যদিও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচারকার্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা হয়েছিল, তথাপি এই মামলা শেষ হতে দীর্ঘ ১৪ বছর সময় লেগেছে। কারণ বিএনপির আইনজীবীরা সময়ক্ষেপণ করার জন্য নানা অজুহাতে পাঁচবার উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করেছেন। এতে কম করে হলেও ২২৫ দিন সময়ক্ষেপণ হয়েছে।

২১ আগস্ট মামলার রায় ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পর যতই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব নানা টালবাহানা করে পুরো বিষয়টিকে উড়িয়ে দিতে চায়, টিভির সামনে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, বাস্তবে তারা স্বস্তিতে নেই। এরই মধ্যে ড. কামাল হোসেন বিএনপিকে ও কিছু তামাদি রাজনীতিবিদকে নিয়ে জোট বেঁধেছেন শেখ হাসিনাকে ফেলে দেওয়ার জন্য। বাস্তবতাটা হচ্ছে, তাঁরা ঠিকই জানেন, এসব জোট দিয়ে কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। আর মাস দুয়েক পর নির্বাচন। সেই নির্বাচন ঠেকানোর সামর্থ্য বিএনপির বা ড. কামাল হোসেন গংয়ের নেই। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে বিএনপির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। তাদের দলের চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারমান দুজনই দণ্ডপ্রাপ্ত। একজন কারাগারে, অন্যজন আইনের দৃষ্টিতে পলাতক। দলের ভেতরে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল দৃশ্যমান। এ অবস্থা এক-এগারোর পরও দেখা গিয়েছিল। তখন বিএনপি বস্তুত ভেঙে গিয়েছিল। সেই ভাঙন আর তেমন একটা জোড়া লাগেনি। এ অবস্থায় দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে দলের খোল-নলচে পাল্টাতে হবে। খালেদা জিয়া করাগারে। নানা রোগে আক্রান্ত। বয়স হয়েছে। তারেক রহমান এরই মধ্যে দেশে ও দেশের বাইরে একজন নিন্দিত চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে আপাতত দেশে ফিরে আসবেন, তার সম্ভাবনা নেই। সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে এটা মেনে নিতে হবে—বিএনপির ওপর জিয়া পরিবারের নিয়ন্ত্রণ আপাতত তেমন একটা আর থাকছে না। অনেকে মনে করেন, এই মুহূর্তে তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান দলের হাল ধরলে দলের একটা গতি হতে পারে। তিনি তা করবেন বলে মনে হয় না। তিনি নিজেকে সব সময় রাজনীতি থেকে দূরে রেখেছেন। কোকোর স্ত্রীর ক্ষেত্রেও একই মন্তব্য প্রযোজ্য। আর যদি এই দুই পত্রবধূর কোনো একজন দলের দায়িত্ব নিতে চান, দলের সিনিয়র নেতারা মেনে যে নেবেন তা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট ও দেশে পেট্রলবোমার সংস্কৃতি আমদানি করে প্রায় ৩০০ নিরীহ মানুষ হত্যা করে বিএনপি খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল। এখন কিনারে নেই, খাদেই পড়ে গেছে। এখান থেকে উঠে আসতে হলে দলের সিনিয়র নেতাদেরই ঠিক করতে হবে, তাদের সামনের দিনের রোডম্যাপ। মেনে নিতে হবে, দলের নয়াপল্টন কার্যালয়ে মির্জা ফখরুল ও রিজভী আহমেদের প্রতিদিনের সন্ধ্যাকালীন টিভি ক্যামেরার সামনে চেহারা দেখানোর রুটিন তাদের দলের জন্য তেমন একটা লাভের কারণ হচ্ছে না। ভারতে কংগ্রেস একসময় অনেক শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ছিল। দীর্ঘদিন তারা দেশ শাসন করেছে। অনেকটা যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে তারা এখন একটি দুর্বল দলে পরিণত হয়েছে। এককভাবে অদূর ভবিষ্যতে তারা আবার ক্ষমতায় ফিরতে পারবে, তা কেউ মনে করে না। পাকিস্তানে একসময়ের ক্ষমতাধর মুসলিম লীগ এখন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। বিএনপি নেতারা না মানলেও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় তাঁদের সামনে দলকে টিকিয়ে রাখতে একটা সুযোগ করে দিয়েছে। সেই সুযোগটা গ্রহণ করতে হলে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিকল্প মাথায় রেখে তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। তা তাঁরা করবেন কি না সেই সিদ্ধান্ত একান্তভাবে তাঁদের।

 লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

 



মন্তব্য