kalerkantho


একজন সীমা সরকার ও একটি প্রেরণাদায়ী গল্প!

রেজানুর রহমান

১০ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



একজন সীমা সরকার ও একটি প্রেরণাদায়ী গল্প!

দৃশ্যটি যতবারই চোখের সামনে দাঁড় করাই, ততবারই অবাক হই। রাজ্যের বিস্ময় চোখের সামনে ভিড় করে। ধৈর্যেরও তো একটা সীমা আছে? কিভাবে এত কিছু সামলান তিনি? একজন মা বলে কি তাঁকে এতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হবে? প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত আমাদের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের পঞ্চম তলায় শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে কোলে করে নিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বসিয়ে দিয়ে আসেন এক মা। ছোট বাচ্চা হলে না হয় একটা কথা ছিল। তাকে কোলে করে আনা-নেওয়া করা হয়তো সহজ ব্যাপার। কিন্তু ছেলেটি এইচএসসি পাস করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছে মমতাময়ী মায়ের কোলে চড়ে। হাজার হাজার মানুষের সামনে ছেলেকে কোলে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন ওই মা। কলা ভবনের পঞ্চম তলায় ছেলেকে নিয়ে যখন উঠছিলেন তখন অনেকেই তাঁকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছিল। ওই মা কারো সাহায্য নেননি। বরং সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘ধন্যবাদ, আমার ছেলেকে আমিই পরীক্ষার হলে বসিয়ে রেখে আসব।’

কালের কণ্ঠ’র অবসর বিভাগে ওই মাকে নিয়ে এক পাতার একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। পিন্টু রঞ্জন অর্কের লেখা রিপোর্টটি পড়ে আমি অভিভূত। দৈনিক ইত্তেফাকে একটানা ১৯ বছর সাংবাদিকতা করেছি। বর্তমানে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের বিনোদন পাক্ষিক ‘আনন্দ আলো’র সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। কেন যেন মনে হচ্ছে, পিন্টু রঞ্জন অর্কের মতো এত মানবিক আবেদনসমৃদ্ধ রিপোর্ট আমি লিখতে পারিনি। তবে আমি অর্ককে ধন্যবাদ জানাব না। ধন্যবাদ জানাব ওই সংগ্রামী মাকে। ওই গরবিনী মায়ের নাম সীমা। ২০০০ সালের ২৩ অক্টোবর নেত্রকোনার একটি ক্লিনিকে সীমা একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু পুত্রের মুখে কোনো শব্দ নেই। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মুখে অক্সিজেন দিয়েও তেমন কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছিল না। ওই অবস্থায়ই ছেলেকে ক্লিনিক থেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন সীমা। পরে দেশে-বিদেশে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন সীমা। চিকিৎসকরা জানান, সীমার ছেলে জন্মের সময় মস্তিষ্কে আঘাত পেয়েছে। তাই হাতে-পায়ে সেভাবে শক্তি পাবে না সে। এ কথা শোনার পর সীমা শুরু করেন নতুন লড়াই। ছেলেকে ওষুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম করানো শুরু করেন। তিন বছর বয়সে বসতে শিখে সীমার আদরের ধন হৃদয়। তাকে একসময় স্কুলে ভর্তি করানো হলো। সীমাই ছেলেকে কোলে নিয়ে স্কুলে যান আবার কোলে করেই বাসায় নিয়ে আসেন। এভাবেই স্কুল পাস করে কলেজে ভর্তি হয় হৃদয়। সেখানেও মায়ের কোলই ভরসা হয়ে ওঠে তার। এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৫০ পেয়ে পাস করে হৃদয়। মায়ের আগ্রহেই এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াই শুরু হয়।

সুখবর হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় পাস করেছে হৃদয়। যদিও এখনো মৌখিক পরীক্ষা বাকি। আমরা আশা করতেই পারি, হৃদয় মৌখিক পরীক্ষায়ও টিকে যাবে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে একজন মা তাঁর সংগ্রামী জীবনের স্বীকৃতিও অর্জন করবেন। যদিও শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে এখনো সীমা সরকারের দুশ্চিন্তা দূর হয়নি। থাকেন নেত্রকোনায়। ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে কোথায় থাকবে—এই চিন্তায় সারাক্ষণ অস্থির থাকছেন সীমা। এ ব্যাপারে সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। বলেছেন, হৃদয়ের জন্য একটা স্বয়ংক্রিয় হুইলচেয়ার পাওয়া গেলে ওর চলাফেরায় অনেক সুবিধা হতো। আমার ধারণা, সীমার এই আহ্বানে এরই মধ্যে হয়তো সাড়া পড়েছে।

এই লেখাটি লিখতে গিয়ে কেন যেন বারবার একটি কথাই মনে হলো—কালের কণ্ঠ’র অবসরে পিন্টু রঞ্জন অর্ক যা লিখেছে, আমি কি তার থেকে বেশি কিছু লিখলাম? দিয়েছি কি নতুন কোনো তথ্য? না, অর্কর লেখার বাইরে আমার এই লেখায় নুতন কোনো তথ্য নেই। তবে কেন নতুন করে এই লেখা? উত্তর একটাই—সীমার মতো সংগ্রামী মায়েদের শ্রদ্ধা জানানো। ভাবুন তো একবার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নারী তাঁর শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে কোলে করে নিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বসিয়ে দিতে যাচ্ছেন। তিনি কে? তিনি একজন মা। একজন মায়ের পক্ষেই বোধ করি এতটা ত্যাগ স্বীকার করা সম্ভব? আমাদের সমবেত প্রার্থনা হওয়া উচিত—এই মায়ের চেষ্টা যেন বৃথা না যায়। পৃথিবীখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং হৃদয়ের মতোই শারীরিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। অথচ তিনিই আধুনিক বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর প্রতিভা। কেন যেন মনে হচ্ছে, হৃদয়ের মতো শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য যে যার অবস্থান থেকে আমরা যদি সামান্যতম সহযোগিতার হাত বাড়াই, তাহলে ভবিষ্যতে দেশই উপকৃত হবে। একই সঙ্গে এই লেখাটির মাধ্যমে সীমা সরকারের মতো সংগ্রামী মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চাই। প্রায়শই বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে সন্তান কর্তৃক মা-বাবাকে অপমান ও অশ্রদ্ধা করার নির্মম, নিষ্ঠুর খবর প্রকাশ ও প্রচারিত হতে দেখি। অনেকে বৃদ্ধ মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। তাঁদের খোঁজখবরও নেন না। তাঁদের সীমা সরকারের দৃষ্টান্ত অনুভব করতে বলি। সবচেয়ে বড় কথা, মায়ের জঠরেই কিন্তু আমাদের জন্ম। অথচ সেই মাকেই আমরা অনেকে শ্রদ্ধা করি না। যত্নে রাখি না। আসুন, সীমা সরকারের দৃষ্টান্তকে শ্রদ্ধা করে আমরা সবাই নিজেদের মা-বাবাকে যত্নে রাখি।

শেষে একটি গল্প বলি—এক মায়ের কাছে তাঁর একমাত্র ছেলে হঠাৎ হাজির। ছেলেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখে মা বললেন—বাবা, তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে মারাত্মক কোনো সমস্যায় পড়েছিস। কী হয়েছে, আমাকে বল? ছেলে আমতা আমতা স্বরে বলল, মা, তোমার কথাই ঠিক। আমি মারাত্মক একটা সমস্যায় পড়েছি। মা উদ্বেগ ছড়িয়ে প্রশ্ন করলেন—কী সমস্যা? বল আমাকে? ছেলে আবার আমতা আমতা করে বলল, তোমার বউমার ধারণা আমি তাকে ভালোবাসি না। আমি তোমাকেই বেশি ভালোবাসি। মা খুশি হয়ে বললেন, সোনা আমার...জাদু আমার...তারপর কী হলো, বল। ছেলে বলল, তোমার বউমা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে চায় না যে আমি তোমার চেয়ে তাকেই বেশি ভালোবাসি...মা এবারও হেসে বললেন, আমার ধারণা তুই আমার কাছে কিছু চাইতে এসেছিস। মায়ের কথা শুনে ছেলে বলল, তুমি ঠিকই ধরেছ মা। আমি যে তোমার চেয়ে তোমার বউমাকেই বেশি ভালোবাসি সে তার প্রমাণ চায়...মা এবারও হেসে বললেন, আমাকে কী করতে হবে, সেটাই বল। ছেলে এবার মাথা নুয়ে বলল, তোমার হৃৎপিণ্ড চাই মা। তোমার বউমাকে দেখাব...তাহলে সে আমার কথা বিশ্বাস করবে। মা এবারও হেসে হেসেই নিজের হৃৎপিণ্ড ছেলের হাতে তুলে দিলেন। মায়ের হৃৎপিণ্ড হাতে নিয়ে ছেলে খুশি হয়ে দৌড় দিতেই হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। ছেলের হাত থেকে ছিটকে পড়া হৃৎপিণ্ড বলে উঠল—ব্যথা পেয়েছিস, বাবা?

প্রিয় পাঠক, এই হলো আমাদের মা। সীমা সরকারের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করতে গিয়ে কেন যেন এই গল্পটার কথা মনে পড়ল। আসুন, যে যার অবস্থানে থেকে মাকে এবং অবশ্যই বাবাকেও যত্নে রাখি। সবার জন্য রইল শুভ কামনা।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক-আনন্দ আলো

 



মন্তব্য