kalerkantho


রাজধানীতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব

ডা. মো. জুলহাস উদ্দিন

৩১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



রাজধানীতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব

প্রতিবছরের মতো বর্ষা মৌসুমে এবারও মশাবাহিত সংক্রামক ব্যাধি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঢাকা শহরে আধিক্য দেখা দিয়েছে। যদিও এবারের শুরুটা একটু দেরিতে হয়েছে, তবে আক্রমণের হার খুব একটা কম নয়। প্রতিনিয়তই ডাক্তারের চেম্বার এবং হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগীদের প্রাধান্য লক্ষ করা যাচ্ছে। দু-এক দিনের উচ্চমাত্রার জ্বর, সঙ্গে কোমর ব্যথা ও চোখ বা মাথা ব্যথা নিয়ে তারা ডাক্তারের শরণাপন্ন হচ্ছে। ডাক্তারের চিকিৎসার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এহেন রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেহেতু ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া মশাবাহিত ভাইরাস রোগ, সেহেতু রোগের বিস্তার, রোগের লক্ষণাদি, তথা রোগটি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলে এ রোগ থেকে অনেকাংশে নিরাপদে থাকা সম্ভব। বার্ষিক ৪০০ মিলিয়ন  ইনফেকশনের মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ইনফেকশন ক্লিনিক্যালি প্রকাশ পায়। তন্মধ্যে ডেঙ্গু হচ্ছে সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করা একটি রোগ। এশিয়া প্যাসিফিক, আফ্রিকা ও আমেরিকায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার জীবাণু এডিস অ্যাজাপিট  (Aedes Aegypti) নামের মশা দ্বারা বাহিত হয়। মশাটি সাধারণত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থির এবং স্বল্প গভীর জলাধারে বংশবিস্তার করে। জমে থাকা পরিষ্কার পানি, যেমন ফুলের টব, এয়ারকুলার বা ফ্রিজের নিচে জমে থাকা পানি, ফেলে দেওয়া ডাব বা নারিকেলের খোসা, টিনের কনটেইনার, গাড়ির টায়ার  ইত্যাদির মধ্যে জমে থাকা পানি, যা বৃষ্টির সিজনেই বেশি সম্ভাবনা, তাই এই সময়টাতেই (মে-জুন থেকে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত) রোগের সংক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। মশাটি শুধু দিনের বেলায় গোধূলিলগ্নেই কামড়ে থাকে। এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। একমাত্র ইনফেকটেড মশা কামড়ালেই রোগটি হয়। চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস প্রজাতি (Serotype)  আছে। এক প্রজাতি দিয়ে রোগ হলে, সেরে যাওয়ার পর ওই নির্দিষ্ট Serotype-এর বিপরীতে আজীবন প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হবে; কিন্তু আরো বাকি তিন প্রজাতি  (Serotype) দ্বারা আক্রান্ত  হতে পারে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের উপসর্গ ও লক্ষণাদি দুটিতেই দু-এক দিনের উচ্চমাত্রার জ্বর (High fever) থাকবে, সঙ্গে প্রচণ্ড কোমর ব্যথা, জিহ্বা শুকানো  ইত্যাদি (ডেঙ্গু) এবং যদি জয়েন্টের ব্যথা, বিশেষ করে পায়ের ও হাতের ছোট জয়েন্টগুলো ফুলে যায়, তখন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে বলে সন্দেহ করতে হবে। সুতরাং এই সিজনে অল্প সময়ের উচ্চমাত্রার জ্বর, সঙ্গে উপরোক্ত উপসর্গগুলো থাকলেই নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রিপোর্ট করতে হবে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার আগেই প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ, যেমন—এসপিরিন, ডিসপিরিন, ক্লোফেনাক, ইন্ডোম্যাথাসিন ইত্যাদি সেবন করা যাবে না। কারণ তাতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। এমনকি যাঁরা হার্ট বা ব্রেনের অসুখের জন্য তথাকথিত Blood thinner ব্যবহার করেন, তাঁরাও সাময়িকভাবে  Aspirin/clopidogrel সেবনে বিরত থাকবেন। মনে রাখতে হবে, এটি অত্যন্ত সাময়িক একটি রোগ, যা সাধারণত পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়।

রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি প্রধানত ক্লিনিক্যাল। ল্যাবরেটরির সাহায্য নেওয়া যায়, তবে প্রথমেই Dengue NS-1 Antigen করতে হবে। কারণ  Dengue Antibody তৈরি হতে পাঁচ-সাত দিন সময় লাগে। এখানে আরো একটি তথ্য সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে জানানো দরকার যে রক্তক্ষরণের ভয়টি জ্বর সম্পূর্ণ সেরে গেলেও তার থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাধারণত হয়ে থাকে। পাশাপাশি কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ সেবন করার কোনো প্রয়োজন নেই। এ রোগে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি ও লবণ বের হয়ে যায় বিধায় প্রচুর পরিমাণে ORS এবং ডাবের পানি পান করতে হবে। জ্বর কমানোর জন্য শুধু প্যারাসিটামল  (Oral অথবা suppository) ব্যবহার করতে হবে। এ রোগে যেমন  Antibiotic ব্যবহার করা যায় না, তেমনি Antiviral Agent-ও নেই। তবে সুখবর এই যে,  A Recently licenced veccine is available| এডিস মশার বিস্তার রোধকল্পে বিস্তারের মাধ্যমগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ এবং  Insecticide দিয়ে  Adult মশা ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে এ রোগের দ্রুত বিস্তার কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি একেবারেই কম  (<1%), তবে দুর্বলতা, অস্থি এবং মাংসপেশির ব্যথা বেশ কিছুদিন থেকে যেতে পারে।

 

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মেডিসিন বিভাগ

মার্কস মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল এবং চিফ মেডিসিন কনসালট্যান্ট, ল্যাবএইড, গুলশান

 



মন্তব্য