kalerkantho


শতরং

পরের প্রজন্মের বঙ্গবন্ধু পাঠ

মোস্তফা মামুন

১৬ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



পরের প্রজন্মের বঙ্গবন্ধু পাঠ

মাঝেমধ্যে এই ভেবে অবাক লাগে যে শেখ হাসিনা কিংবা শেখ রেহানা এর পরও কী করে সুস্থ থাকলেন!  অল্পবিস্তর পারিবারিক দুর্ঘটনা আমাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এক-আধটা আছে। দগদগে ঘা হয়ে সেটা জ্বালিয়ে যায় আমরণ। সেখানে একজন মানুষ তাঁর মা-বাবা, ভাইসহ পুরো পরিবারকে হারিয়েছে এবং শেষ দেখাটাও দেখতে পায়নি; আবার সেই খুনিরা উল্লাসনৃত্য করে চলেছে প্রকাশ্যে—ভাবা যায়! তাঁর জায়গায় নিজেকে নিয়ে একবার চিন্তা করুন। আচ্ছা অত কষ্ট না করে ধরা যাক আপনি একটা সিনেমা দেখছেন। তাতে একটা পরিবারের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, আপনার চোখ ভিজে উঠবে না! যদি না ভেজে তাহলে আপনার সঙ্গে আলাপ নেই।

আমাদের যাদের বোধের বিকাশ আশির দশকে তাঁরা বড় হয়েছি অদ্ভুত একটা আবদ্ধ সময়ে। সেই সময়ে পথে-ঘাটে সবচেয়ে বেশি যে স্লোগানটা শোনা যেত সেটা হলো ‘রুশ-ভারতের দালালরা হুঁশিয়ার-সাবধান।’ এই স্লোগানটা এতই প্রচারিত এবং প্রচলিত ছিল যে মনে হতো এটাই বোধ হয় আমাদের জাতীয় স্লোগান। ক্ষীণ কণ্ঠে মাঝেমধ্যে ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ শোনা যেত বটে, কিন্তু সেই স্লোগানদাতাদের চেহারার মধ্যে এমন একটা ভাব ফুটে থাকত যেন বিরাট কোনো অপরাধ করা হচ্ছে। আর বঙ্গবন্ধু! পরের প্রজন্মের কাছ থেকে তাঁকে লুকিয়ে রাখার সব আয়োজন এমন সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়েছিল যে মনে হতো এই নামে কেউ বোধ হয় কোনো দিন ছিলই না। মানুষের চরিত্রের সবচেয়ে লজ্জার দিকটি হলো এরা খুব সহজেই অমানুষ হয়ে যায়। আমরা অমানুষ হয়ে নির্লজ্জ অকৃতজ্ঞতায় তাঁকে ডুবিয়ে রেখেছিলাম অন্ধকারে। কিন্তু অন্যায্য চেষ্টা যত গভীরই হোক না কেন ইতিহাসের কাছে ঠিকই মার খায়। যে পরের প্রজন্মের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে দূরে সরানোর চেষ্টা হয়েছিল অবাক হয়ে খেয়াল করি, সেই পরের প্রজন্মই বরং তাঁকে বেশি করে ধারণ করেছে। দলমত-নির্বিশেষে তরুণদের আজকের যেকোনো মিছিল বা স্লোগানে বঙ্গবন্ধু আছেন। থাকেন এবং সম্ভবত চিরদিনই থাকবেন।

জাভেদ ভাই এই সময়ই ঘরে ঢুকে বলল, ‘লেখার বিষয় কী?’

‘পরের প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু।’

সে একটু ভাবে। তারপর বলে, ‘একটা ব্যাপার কি জানো, নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে শুরু করল রেডিও-টিভিতে বঙ্গবন্ধুর ব্যাপক প্রচার। একটু বাড়াবাড়িও ছিল। আর তার বিরুদ্ধে এমন একটা হায় হায় রব উঠল যে মনে হয়েছিল দুই দশকের টানা অপপ্রচারটাই মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে গেছে। সেটাকে মুছে ফেলে বঙ্গবন্ধুকে মানুষের মনে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।’

‘তাহলে এখন পরিস্থিতিটা বদলাল কী করে?’

‘সেই ১৯৯৬ সালে সমাজকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল অপপ্রচারের সময়ে বেড়ে ওঠা মানুষেরাই। এরা স্বভাবতই ইতিহাসের ভুল বয়ান শুনে শুনে বঙ্গবন্ধুবিরোধী। কিন্তু ২০০৮ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর দেখা গেল এই বঙ্গবন্ধুবিরোধিতা আর নেই। ওই যে ১৯৯৬-২০০১ আমলে ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত ভুল বয়ানের বিরুদ্ধে পাল্টা বয়ান আওয়ামী লীগ দাঁড় করিয়েছিল পরের প্রজন্মের কাছে সেটা তত দিনে পৌঁছেছে। কাজ করেছে ইন্টারনেট-অনলাইনও। নতুন সময়ের তরুণরা পরস্পরবিরোধী ইতিহাস শুনে নিজেদের মতো করে যাচাই-বিশ্লেষণ করার সুযোগ পেয়েছে। তাতে বঙ্গবন্ধু তাঁর জায়গা ফিরে পেয়েছেন এই প্রজন্মের কাছে। একসময় বিরোধী দলগুলো বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করে আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলতে চাইত, কিন্তু এখন দেখবে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করতে গিয়ে ওরাও বলে, এই দল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।’

‘হুঁ। একমাত্র তারেক রহমানই বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করেন।’

‘এটাও একটা ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট। বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করে তারেক রহমান যেভাবে ধিকৃত হয়েছেন তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় বঙ্গবন্ধুর বিকৃত সমালোচনার আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।’

জাভেদ ভাই একটু গম্ভীর হয়ে যায় হঠাৎ। তারপর স্বগতোক্তির মতো করে বলে, ‘কিন্তু সমস্যা হলো বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সত্যিকারের বিশ্লেষণ হলো না। হয় তাঁর নামে আবেগী জিকির, না হলে বিদ্বেষমূলক সমালোচনা।’

‘তোমার মতে তাঁর চরিত্রের কোন ব্যাপারটা ঠিক আমরা, বাঙালিরা ধরতে পারিনি।’

‘সত্যি বললে, পাকিস্তান তৈরির মাত্র ২৪ বছরের মধ্যে পাকিস্তান ভাঙা, তাও সেটা একটা ইসলামনির্ভর রাষ্ট্র, ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশের মানুষকে তাঁর জন্য তৈরি করা সহজ কাজ ছিল না।’

সত্যি কথা। এখন সমাজে ধর্ম আর ধর্মচর্চার প্রভাব দেখলে সেটাকে অলৌকিক ব্যাপারই মনে হয়।

জাভেদ ভাই বলল, ‘এই সব কিছুকে ঢাকা দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব। তিনি এমন প্রতীক হয়ে গিয়েছিলেন যে তাঁর মুখ থেকে বেরোনো কথা হয়ে গেছে দৈববাণীর মতো। মানতেই হবে। আর এই কাল্টটা তৈরি করেছিল আসলে ছাত্রলীগ। তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক—এরা বোধ হয় বুঝেছিলেন এই মানুষকে প্রস্তুত করার জন্য দরকার সামনে একটা কাল্ট ফিগার।’

‘এটা তো ছাত্রলীগের কৃতিত্ব।’

‘কিন্তু সেই ছাত্রলীগকে অতটুকু জায়গা আবার দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের অনেকেই ছয় দফারও পক্ষে ছিলেন না। ছাত্রলীগকে দিয়ে বঙ্গবন্ধু ওদের বাধ্য করান বা ওরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। তার পর থেকে আসলে বঙ্গবন্ধু আর ছাত্রলীগ এবং সঙ্গে তাজউদ্দীনের সাংগঠনিক ক্ষমতা-দূরদর্শিতা। আর এই ছাত্রলীগে দেখবে একদিকে বামপন্থীরা ছিল, যারা উগ্র আন্দোলনে বিশ্বাসী। মধ্যপন্থীরা তো ছিলই এবং এমনকি ডানপন্থীরাও ছিল।’

‘সেটা তো মূল আওয়ামী লীগেও ছিল। সমাজতন্ত্রী তাজউদ্দীন ছিলেন। ছিলেন ডানপন্থী খন্দকার মোশতাকরাও।’

‘হুঁ। এই পুরো ব্যাপারটার মধ্যেই তার মাহাত্ম্য। তিনি সবাইকে ধারণ করেছেন। এমন পরস্পরবিরোধীদেরও দিব্যি এক ছাতার তলে রেখেছেন এবং ঠিকঠাক ব্যবহারও করেছেন। এভাবে তিনি সব রকম মতের মানুষের মনটা জানতে পেরেছেন বলে হতে পেরেছেন সবার নেতা। দ্বিতীয়ত, তখন প্রগতিশীল দলগুলোই ছিল বাংলাদেশ তৈরির আন্দোলনে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ। কিন্তু উগ্রতা এবং ধর্ম বিষয়ে তাদের বাড়াবাড়িতে মানুষ ওদের ওপর ঠিক ভরসা করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু এই দাবিটার পথে মানুষকে শামিল করলেন ধরনটা মানুষের উপযোগী করে। উগ্রতাজনিত তাড়াহুড়ার বদলে নিয়মতান্ত্রিক পথে দৃঢ়তা। বাঙালিত্ব উঁচিয়ে ধরলেন, মুসলমানিত্ব অক্ষুণ্ন রাখলেন, আলোচনায় গেলেন, নির্বাচন করলেন, আবার সময়মতো আগ্রাসী হলেন। এই সামগ্রিকতা দিয়ে আদায় করে নিয়েছিলেন পুরো জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস।’

‘তাহলে তুমি বলতে চাইছ বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিত্বের মূল জায়গা হলো সামগ্রিকতা। সবাইকে, সব মতকে ধারণ করা।’

‘এটা একটা। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপারটা তরুণ প্রজন্মকে ঠিকঠাক কাজে লাগানো। ছাত্রদের শক্তি তাঁর মতো করে কেউ বোঝেনি। তারুণ্যের ঝড় তখনই কার্যকর যখন সঠিক দিশারি তাদের ঠিক পথটা দেখায়।’

শুনতে শুনতে মনে হলো, এখনকার বাংলাদেশে এই দুটি জিনিসেরই অভাব।

সব মতকে ধারণ করা দূরে থাক, সহ্যই করে না কেউ।

তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনকেও সঠিক দিক দিতে পারেন না কোনো দূরদর্শী অভিভাবক। বরং উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহার আর নেতৃত্বহীনতায় এই আন্দোলনগুলো পায় না চূড়ান্ত পরিণতি।

৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে পরের প্রজন্মের বঙ্গবন্ধু পাঠে তাই আফসোসও থাকছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর হারানো আসনে ফিরেছেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ সম্ভবত এই দেশের রাজনীতিতে আর ফিরছে না।

 

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

 



মন্তব্য